Homeটুডে ওয়ার্ল্ডইরান যুদ্ধের মেগা উইনার ব্রাজিল! হরমুজ প্রণালী সংকটে লুলার তেলের দিকে ঝুঁকছে...

ইরান যুদ্ধের মেগা উইনার ব্রাজিল! হরমুজ প্রণালী সংকটে লুলার তেলের দিকে ঝুঁকছে চীন ও ভারত

পারস্য উপসাগরের নৌ-অবরোধে ব্রাজিলের ক্রুড অয়েলের রেকর্ড রপ্তানি; এপ্রিলে ভারতের ৪র্থ বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী ‘পেত্রোব্রাস’; মার্কিন বাজারে রপ্তানি নেমেছে শূন্যে

রিও ডি জেনিরো / নয়াদিল্লি | ২৬ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান প্রায় তিন মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) অবরুদ্ধ থাকার জেরে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে এক বিশাল ওলটপালট ঘটে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই চরম ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মাঝে বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির সবচেয়ে বড় ‘উইনার’ বা সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ হিসেবে নাটকীয়ভাবে উত্থান ঘটেছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল-এর।

বিশ্বখ্যাত ট্রেড ইন্টেলিজেন্স ফার্ম ‘কেপলার’ (Kpler)-এর দেওয়া সর্বশেষ এক্সক্লুসিভ ডেটা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এবং রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় এশিয়ার দুই প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন এবং ভারত তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেকর্ড পরিমাণে ব্রাজিলের ‘ক্রুড অয়েল’ বা অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়িয়েছে।

🕒 খারিজি উপসাগর বনাম ব্রাজিল: তেল আমদানির তুলনামূলক গ্রাফ

উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌ-ঝুঁকি এড়াতে এশীয় শোধনাগারগুলো (Refineries) কীভাবে ব্রাজিলের দিকে ঝুঁকেছে, তার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

  • এশিয়ায় সামগ্রিক রপ্তানি বৃদ্ধি: ২০১৫ সালে এশিয়ার দেশগুলো ব্রাজিল থেকে দৈনিক গড়ে ১২ লাখ (১.২ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল আমদানি করত। তবে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে তা একলাফে দৈনিক ১৮ লাখ (১.৮ মিলিয়ন) ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে।
  • চীনের মেগা পারচেজ: কেপলার-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে চীন ব্রাজিল থেকে দৈনিক ৭ লাখ ৪ হাজার ব্যারেল তেল কিনত। চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১৩ লাখ ১৬ হাজার (১.৩১৬ মিলিয়ন) ব্যারেলে ঠেকেছে। ব্রাজিল-চীন বিজনেস কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম কোয়ার্টারেই চীনের কাছে ব্রাজিলের তেল বিক্রির আর্থিক মূল্য ৯৫% বেড়ে ৭.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
  • ভারতের নতুন সমীকরণ: ২০২৫ সালে ভারত দৈনিক ১ লাখ ব্যারেল ব্রাজিলীয় তেল আমদানি করত, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ব্যারেলে। গত এপ্রিল মাসে ব্রাজিল প্রথমবারের মতো ভারতের ৪র্থ বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী দেশের মর্যাদা লাভ করেছে।

📊 কারেন্ট স্ট্যাটাস বক্স: ব্রাজিলের তেল উৎপাদন ও কৌশলগত ডাইভারশন

সূচক / প্যারামিটার🇧🇷 ব্রাজিলের জ্বালানি খাতের বর্তমান চিত্র (মে ২০২৬)
মোট তেল উৎপাদন২০২৫ সালের ৩.৭৭ মিলিয়ন বিপিডি থেকে বেড়ে মে ২০২৬-এ ৪.১১ মিলিয়ন ব্যারেলে (bpd) উন্নীত।
ইউএসএ-তে রপ্তানি ড্রপগত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দৈনিক ৬০,০০০ ব্যারেল তেল পাঠালেও, বর্তমানে তা শূণ্যের কোঠায় (Zero) নেমে এসেছে।
পেত্রোব্রাস-এর এশিয়ান ফোকাসব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘পেত্রোব্রাস’ তাদের মোট তেল রপ্তানির ৬০ শতাংশের বেশি এখন সরাসরি চীনের বাজারে ডাইভার্ট করছে।
অর্থনীতিতে প্রভাবআন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছানোয় ব্রাজিলের রাজস্ব আয় দেশের মূল জিডিপির (GDP) প্রায় ১% বৃদ্ধি পেয়েছে।

🛢️ ভেনিজুয়েলার তুলনায় কেন এগিয়ে ব্রাজিলের তেল?

জ্বালানি বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া আল জাজিরাকে জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ববাজারে বিকল্প হিসেবে ভেনিজুয়েলার তেলের প্রচার চালালেও এশিয়ার রিফাইনারিগুলোর কাছে ব্রাজিলের তেলের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি।

“জানুয়ারি মাসে মার্কিন বাহিনী কর্তৃক কারাকাস থেকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর ওয়াশিংটন ভেনিজুয়েলার তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তবে ভেনিজুয়েলার তেল অত্যন্ত ভারী এবং ‘সাওয়ার’ (Sour – উচ্চ সালফারযুক্ত), যা এশিয়ার অধিকাংশ রিফাইনারি প্রসেস করতে পারে না। বিপরীতে ব্রাজিলের দুই প্রধান গ্রেড—‘টুপি’ (Tupi) এবং ‘বুজিওস’ (Buzios) হলো ‘মিডিয়াম-সুইট’ ক্রুড, যাতে সালফারের পরিমাণ কম এবং তা থেকে খুব সহজেই জেট ফুয়েল ও ডিজেল উৎপাদন করা যায়।”

🌐 এশিয়ার অন্যান্য দেশে লুলার কূটনৈতিক জাল

কেবল চীন বা ভারত নয়, হরমুজ প্রণালীর বিকল্প হিসেবে ব্রাজিলকে পাশে পেতে পুরো এশিয়া জুড়েই এখন কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে। ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েইরা গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, পেত্রোব্রাস জাপানের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের তেল রপ্তানি বাড়াতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এছাড়া, ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া সফর করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে “কৌশলগত অংশীদারিত্বে” রূপান্তর করেছেন, যার মূল ভিত্তিই হলো তেল ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা।

⚠️ ব্রাজিলের তেল কি মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী বিকল্প?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিল বর্তমান সংকটে সাময়িক সুবিধা পেলেও তারা দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী বিকল্প হতে পারবে না। এর পেছনে প্রধান ৩টি কারণ হলো:

  1. দীর্ঘ পরিবহন সময় (Freight Distance): মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় তেল আসতে যেখানে সামান্য কয়েকদিন লাগে, সেখানে ব্রাজিল থেকে চীনের বন্দরে একটি তেলের ট্যাংকার পৌঁছাতে প্রায় ৫০ দিন সময় লাগে। এর ফলে ফ্রেইট চার্জ বা জাহাজের ভাড়া অনেক বেড়ে যায়।
  2. উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা: গত মার্চের পর থেকে ব্রাজিলের তেল উৎপাদন মাত্র ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ ব্যারেল বেড়েছে। স্বল্প সময়ে হুট করে উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানোর মতো প্রযুক্তিগত নমনীয়তা ব্রাজিলের নেই।
  3. রুশ আর্ক্টিক রুটের প্রতিযোগিতা: আগামী মাসগুলোতে গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া আসায় রাশিয়ার আর্ক্টিক সমুদ্র রুট খুলে যাবে। রুশ টার্মিনাল থেকে চীনে তেল পৌঁছাতে ব্রাজিলের চেয়ে অর্ধেক সময় লাগে। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি সমুদ্রে ভাসমান রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও ৩০ দিন শিথিল করায় এশিয়ার বায়াররা আবার রাশিয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে।

📌 তথ্যসূত্র:

  • কেপলার (Kpler) গ্লোবাল এনার্জি অ্যান্ড ট্রেড ইন্টেলিজেন্স লাইভ ডাটাবেজ (মে ২০২৬)
  • আল জাজিরা (Al Jazeera) বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্স উইং, সিঙ্গাপুর ব্যুরো
  • OECD (অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা) মার্চ ২০২৬ ইকোনমিক আউটলুক
  • ব্রাজিল-চীন বিজনেস কাউন্সিল (CEBC) ফার্স্ট কোয়ার্টার ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্ট
  • সুমিত রিতোলিয়া, রিফাইনারি অ্যান্ড অয়েল মার্কেট স্পেশালিস্ট, Kpler (অন-রেকর্ড জবানবন্দি)
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular