Homeটুডে নেশনগণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর: ‘অপেক্ষা ও হতাশার’ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ, মৃতপ্রায় দলীয় সংস্কারের...

গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর: ‘অপেক্ষা ও হতাশার’ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ, মৃতপ্রায় দলীয় সংস্কারের আলোচনা

শেখ হাসিনার অনড় অবস্থানে থমকে গেছে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ গঠনের প্রক্রিয়া; নিষ্ক্রিয় অধিকাংশ নেতাকর্মী; ভারতের বর্তমান সমীকরণে আশ্রয় বদলাচ্ছেন বিদেশে থাকা পলাতক নেতারা

ঢাকা | ২৬ মে ২০২৬
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ দেড় বছর (১৮ মাস) পার হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো কার্যকর পথ খুঁজে পাচ্ছে না আওয়ামী লীগ। দলটির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা এবং বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানের মুখে মাঠের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা এই রাজনৈতিক দলটি।

দলের একটি বড় অংশ এবং বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর শুভাকাঙ্ক্ষীরা বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ‘রিফাইন্ড’ বা পরিশুদ্ধ দল গঠনের যে তাগিদ দিয়েছিলেন, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার অনড় অবস্থানের কারণে তা এখন মৃতপ্রায়। ফলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলটির বিশাল কর্মী বহর এখন এক গভীর হতাশা এবং অনিশ্চিত ‘অপেক্ষার রাজনীতিতে’ দিন পার করছে।

🕒 সংস্কারের সম্ভাবনা ভেস্তে যাওয়ার মূল কারণ

আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল এবং নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত দেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই দলটিকে পুনর্গঠন ও সংস্কারের তীব্র চাপ ছিল। তবে তা বাস্তবে রূপ না পাওয়ার প্রধান কারণসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:

  • নেতৃত্ব ছাড়তে শেখ হাসিনার অস্বীকৃতি: সংস্কারপন্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা দলের বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ নেতাদের সরিয়ে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্যদের হাতে শীর্ষ নেতৃত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু দলের সভাপতি শেখ হাসিনা নিজের পদ ছাড়তে সম্পূর্ণ নারাজ।
  • বিকল্প মুখের অভাব: বড়জোর বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের বিকল্প হিসেবে নিজের পছন্দের এবং বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত কিছু কনিষ্ঠ নেতাকে দলের মুখপত্র বা কো-অর্ডিনেটর করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা, যা দলের ভেতরে ও বাইরে থাকা সংস্কারপন্থীদের আশ্বস্ত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

মাঠের চিত্র: নিষ্ক্রিয়তা, জামিন আতঙ্ক ও ঝটিকা মিছিল

বাস্তবতা হলো, গত এপ্রিলে চট্টগ্রামে এবং দেশের দু-একটি স্থানে আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে বড় কোনো সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ব্যবসায়ী স্বার্থ জড়িত থাকা সাবেক সংসদ সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতারা এখন রাজনীতি থেকে চিরতরে ইস্তফা দেওয়ার পথ খুঁজছেন। অনেক নেতা জামিনের আইনি নিশ্চয়তা পেলে দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের কথা ভাবলেও, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার বা আদালত তাদের কোনো প্রকার ছাড় দেবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

🌐 বিদেশে পলাতক নেতাদের বর্তমান অবস্থা ও ভৌগোলিক অবস্থান

বর্তমান আশ্রয়স্থলঅর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিপরবর্তী পদক্ষেপ ও সম্ভাব্য মুভমেন্ট
ভারতদিল্লির সঙ্গে ঢাকার বর্তমান সুসম্পর্ক ও কৌশলগত সমীকরণের কারণে আইনি জটিলতার আশঙ্কায় আছেন অনেকেই।ভারত ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মালয়েশিয়া বা সাইপ্রাসের মতো দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
ইউরোপ ও মালয়েশিয়াব্যাংকিং চ্যানেল ও ব্যবসা বন্ধ থাকায় তীব্র আর্থিক সংকটে দিন পার করছেন অধিকাংশ সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতা।পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ট্রাভেল ডকুমেন্ট ও স্থায়ী আশ্রয়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

কট্টরপন্থীদের সক্রিয়তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সতর্কতা

বর্তমানে দলের অভ্যন্তরে এখনো সাবেক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশে ও আত্মগোপনে থাকা নেতাদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। কলকাতার একটি লিয়াজোঁ পক্ষ সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির সাথে ব্যাকচ্যানেল যোগাযোগের চেষ্টা করছে এবং একটি অংশ অনলাইনে শেখ হাসিনার সাথে নিয়মিত বৈঠক করছে। কট্টরপন্থীদের ধারণা, বর্তমান সরকার কোনো বড় ভুল বা অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিলে তারা আবার রাজনীতিতে গায়ের জোরে ফেরার সুযোগ পাবে। তারা কোনো ধরনের ভুল স্বীকার বা অনুশোচনার পক্ষে নন।

তবে এই চিন্তাধারাকে আত্মঘাতী উল্লেখ করে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন:

“আওয়ামী লীগের উচিত ছিল গত ১৫ বছরের শাসন, নিপীড়ন ও অপরাধের জন্য জনগণের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া এবং জবাবদিহি করা। তারা যদি এখনো গায়ের জোরে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করে, তবে দেশের বর্তমান বড় রাজনৈতিক শক্তি—বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি (ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি) যৌথভাবে তাদের রাজপথে মোকাবিলা করবে। এতে দেশের জন্য আরও ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি তৈরি হবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, দলটিকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করার চেয়ে রাজনৈতিকভাবে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করালে বেশি কার্যকর হতো। কারণ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি এখন আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ‘ভিকটিম’ বা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে প্রচার করার একটি কৃত্রিম সুযোগ পাচ্ছে। তবে জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় থাকা তরুণ ও ছাত্রসমাজ কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন মেনে নেবে না বলে মাঠপর্যায়ে এখনো চরম সোচ্চার রয়েছে।

📌 তথ্যসূত্র:

  • আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও নীতি-নির্ধারণী উইং (অভ্যন্তরীণ সূত্র)
  • রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ-এর বিশেষ কলাম ও রাজনৈতিক পর্যালোচনা (মে ২০২৬)
  • দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি ও কনস্যুলার স্ট্যাটাস রিপোর্ট (কলকাতা ও কুয়ালালামপুর ব্যুরো)
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular