Homeটুডে ওয়ার্ল্ডযুক্তরাষ্ট্র-ইরান মেগা চুক্তি ঘিরে দোহায় চূড়ান্ত দরকষাকষি: হয় বড় চুক্তি, নাহলে কিছুই...

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মেগা চুক্তি ঘিরে দোহায় চূড়ান্ত দরকষাকষি: হয় বড় চুক্তি, নাহলে কিছুই নয়—হুংকার ট্রাম্পের

প্রায় তিন মাসের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কাতার সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্পিকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর; ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও পরমাণু জ্বালানি স্থানান্তর নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক; খোলেনি হরমুজ প্রণালী, বহাল মার্কিন অবরোধ

দোহা/তেহরান | ২৬ মে ২০২৬ মধ্যপ্রাচ্যের চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরণের আঘাত হানা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাথে দরকষাকষি করতে সোমবার (২৫ মে) রাতে আকস্মিকভাবে পৌঁছায় ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের মেগা ডেলিগেশন।

এই কূটনৈতিক মহাবৈঠকের আবহেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটন থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি হতে হবে অত্যন্ত ‘অর্থপূর্ণ এবং বড়’ (Great and Meaningful), অন্যথায় টেবিলে ‘কোনো চুক্তিই হবে না’ (No Deal)। মাত্র কয়েকদিন আগে ট্রাম্প চুক্তিটি ‘প্রায় চূড়ান্ত’ বলে দাবি করলেও, সোমবার তাঁর এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সুর ছিল বেশ কড়া ও অনমনীয়।

🕒 দোহা বৈঠকের মূল কুশীলব ও আলোচ্য বিষয়সূচি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থামানোর জন্য গত ৮ এপ্রিল থেকে উভয় পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) মেনে চলছে। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মূল মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে চুক্তির কিছু সুনির্দিষ্ট ‘স্টিকিং পয়েন্ট’ বা অমীমাংসিত শর্ত। দোহা বৈঠকে অংশ নেওয়া ইরানি প্রতিনিধি দলে রয়েছেন:

  • আব্বাস আরাঘচি (ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী)
  • মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ (পার্লামেন্ট স্পিকার)
  • আব্দুল নাসের হেম্মাতি (সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর—যার উপস্থিতি প্রমাণ করে ইরানের অবরুদ্ধ তহবিল বা ফ্রিজড অ্যাসেট মুক্ত করার বিষয়ে বড় আলোচনা চলছে)।

🧮 সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া ও ডেডলাইন (Proposed Timeline)

জাপানের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম নিক্কেই (Nikkei)-এর একটি অপ্রকাশিত কূটনৈতিক সূত্রের প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখাটি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ⚓ হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণ: বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ (১/৫ অংশ) সরবরাহ হয় এই রুট দিয়ে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৩০ দিনের একটি উইন্ডো বা সময়সীমা পাবে ইরান। এই সময়ের মধ্যে তেহরানকে হরমুজ প্রণালী থেকে সমস্ত মাইন (Mines) অপসারণ করতে হবে, সব দেশের জাহাজের জন্য ফ্রি নেভিগেশন নিশ্চিত করতে হবে এবং ট্রানজিট ফি নেওয়া বন্ধ করতে হবে।
  • 🚢 মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার: ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে নীতিগতভাবে রাজি হওয়ার বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগে অবরোধ বহাল থাকবে।
  • ⏳ ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও ইউরেনিয়াম নিষ্পত্তি: প্রাথমিক সফলতার পর যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিন বাড়ানো হবে। এই সময়ের মধ্যে ইরানকে তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের (Highly Enriched Uranium) মজুদ হস্তান্তর বা নিষ্ক্রিয় করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।

📊 যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান অবস্থান: কার হাতে কতটুকু লেভারেজ?

সূচক / পক্ষ🇺🇸 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প প্রশাসন🇮🇷 ইরান ও তেহরান প্রশাসন
মূল দাবি (Demands)হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া এবং উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্টক ধ্বংস করা।মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং বিশ্বজুড়ে আটকে থাকা ইরানি অর্থ বা তহবিল অবমুক্ত করা।
কূটনৈতিক অবস্থানআব্রাহাম অ্যাকর্ডসে সই করতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য মুসলিম দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি।পরমাণু ইস্যু এই যুদ্ধের অংশ নয় দাবি করে ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুমকিতে কান না দেওয়ার ঘোষণা।
লেভারেজ (Leverage)অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক জোটের মাধ্যমে ইরানের ওপর কঠোর অবরোধ ধরে রাখা।হরমুজ প্রণালী ব্লক করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিকে কার্যত জিম্মি করার ক্ষমতা।

💬 “হয় শক্তিশালী চুক্তি, নয় অন্য পথ”: মার্কো রুবিও

বর্তমানে চার দিনের ভারত সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নয়াদিল্লি থেকে সাংবাদিকদের বলেন:

“আমরা হয় ইরানের সাথে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিরেট চুক্তি নিশ্চিত করব, অথবা দেশটিকে অন্য উপায়ে (Another Way) মোকাবিলা করব। আমরা ভেবেছিলাম গত রাতে বা আজকেই হয়তো বড় কোনো খবর পাব, তবে এখনই এটি নিয়ে বেশি মাতামাতির প্রয়োজন নেই। হরমুজ প্রণালী খোলার বিষয়ে একটি বেশ শক্ত প্রস্তাব এখন টেবিলে রয়েছে।”

এদিকে তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, “আমরা আলোচনার একটি বড় অংশে একমত হতে পেরেছি, তবে তার মানে এই নয় যে চুক্তি স্বাক্ষর একদম দ্বারপ্রান্তে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে কিনা তার কোনো গ্যারান্টি নেই, আর আমরা কাউচ থ্রেটস বা ফাঁকা হুমকিতে পরোয়া করি না।”

🌐 মধ্যস্থতায় বৈশ্বিক পরাশক্তি: বেইজিংয়ে পাকিস্তান-চীন বৈঠক

দোহায় যখন এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠক চলছে, ঠিক তখন এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনির সোমবার চীনের বেইজিংয়ে শীর্ষ চীনা নেতৃত্বের সাথে জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। গত সপ্তাহেও পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল তেহরান সফর করেছিল। চীন ও পাকিস্তান যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে ইতিবাচক অবদান রাখছে।

তবে থিঙ্ক ট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর সিনিয়র ফেলো চার্লস কুপচান সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি এক দিন এক দিকে তো অন্য দিন অন্য দিকে মোড় নেয়। যতক্ষণ না ইরান নিঃশর্তভাবে তাদের ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করছে, ততক্ষণ স্থায়ী চুক্তিকে অনেক দূরের পথ বলেই মনে হচ্ছে।

📌 তথ্যসূত্র:

  • আল জাজিরা (Al Jazeera) তেহরান ও দোহা ব্যুরো লাইভ আপডেট (২৫ মে ২০২৬)
  • আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএফপি (AFP) এবং রয়টার্স (Reuters) ওয়াশিংটন ব্যুরো
  • জাপানের শীর্ষ দৈনিক নিক্কেই (Nikkei) এশিয়ান অপটিক্স ডিপ্লোম্যাসি রিপোর্ট
  • মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স (Middle East Council on Global Affairs) রিসার্চ পেপার
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular