কড়া আইনি কড়াকড়ি ও নজরদারিতে ক্রেতাশূন্য কলকাতার ধুলীগড় হাট; বন্ধ হচ্ছে শহরের বিখ্যাত ‘বিফ বার্গার’ ও মাংসের দোকান; নামাজ ও কোরবানির রীতিনীতি নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ
কলকাতা | ২৬ মে ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ) ঘিরে রাজ্যজুড়ে এক নজিরবিহীন থমথমে পরিস্থিতি ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। চলতি মে মাসেই রাজ্যের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কট্টর ডানপন্থী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) ক্ষমতায় আসার পর চিরাচরিত মুসলিম উৎসবের অর্থনীতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে বড় ধরণের ধাক্কা লেগেছে।
আগামী বুধ ও বৃহস্পতিবার দেশটিতে ঈদুল আজহা উদযাপিত হওয়ার কথা থাকলেও, কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম ‘ধুলীগড় গবাদিপশুর হাট’ (Dhulagarh cattle market) এখন সম্পূর্ণ জনমানবহীন, ক্রেতাশূন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে এই হাটের ৯০ শতাংশের বেশি গরু ও মহিষের বিক্রেতা সনাতন ধর্মাবলম্বী (হিন্দু) এবং ক্রেতারা মুসলিম। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আইনি হয়রানি ও কট্টরপন্থী গো-রক্ষকদের হামলার ভয়ে মুসলিম ক্রেতারা হাট থেকে সম্পূর্ণ দূরে অবস্থান করছেন, যার ফলে সবচেয়ে বেশি পুঁজি হারিয়ে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন দরিদ্র হিন্দু খামারি ও বিক্রেতারা।
🕒 পশ্চিমবঙ্গে গো-মাংসের রাজনীতি ও আইনি কড়াকড়ি (Policy & Context Shift)
পশ্চিমবঙ্গে প্রায় আড়াই কোটি (২৫ মিলিয়ন) মুসলিমের বসবাস, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বামপন্থী (মার্ক্সবাদী) এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মতো ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো রাজ্য শাসন করায় ১৯৫০ সালের ‘পশু জবাই প্রতিরোধ আইন’ কঠোরভাবে কার্যকর ছিল না। ফলে কলকাতা হয়ে উঠেছিল এশিয়ার অন্যতম বিখ্যাত ‘বিফ ফুড হাব’।
তবে গত ৬ মে ২০২৬ নির্বাচনে বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর পুরো দৃশ্যপট বদলে যায়।
- ১৪ মে ২০২৬: নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের ১৯৫০ সালের আইনটি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।
- আইনের মূল শর্ত: সরকারি পশু চিকিৎসকের বৈধ ‘ফিট ফর স্লটার’ সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো গবাদিপশু জবাই করা যাবে না। জবাই করতে হবে কেবল সরকার নির্ধারিত মিউনিসিপ্যাল স্লটারহাউসে।
- বয়সের বাধ্যবাধকতা: জবাইযোগ্য পশুর বয়স বাধ্যতামূলকভাবে ১৪ বছরের ওপরে হতে হবে, যা কার্যত সাধারণ কোরবানির পশুর ক্ষেত্রে অসম্ভব।
📊 কারেন্ট স্ট্যাটাস প্যানেল: ধুলীগড় হাট ও মাংসের বাজারের বর্তমান চিত্র
| সূচক / ক্যাটাগরি | 📉 বর্তমান অর্থনৈতিক ও বাজার পরিস্থিতি (মে ২০২৬) |
| মাংসের দাম ধস | লাইভ গরুর মাংসের দাম কেজি প্রতি ৪০০ রুপি ($৫) থেকে নেমে একলাফে ১৫০ রুপিতে ($১.৭০) ঠেকেছে। |
| ব্যবসায়িক ক্ষতি (Sundor-এর কেস) | মুসলিম খামারি সুন্দর মায়ের গয়না বন্ধক রেখে ১০ লাখ রুপি লোন নিয়ে ২৫টি গরু এনেছিলেন; গত বছর ১০০টি বিক্রি করলেও এবার একটিও বিক্রি হয়নি। |
| ক্ষুদ্র খামারিদের লোকসান | পূর্ব মেদিনীপুর থেকে আসা হিন্দু বিক্রেতারা জানান, অবিক্রিত প্রতিটি গরুর পেছনে তাদের ৫,০০০ রুপি পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। |
| দোকানপাট বন্ধের সময় | কলকাতার বিখ্যাত নিউ মার্কেটের মাংসের দোকানগুলো আগে রাত ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকলেও এখন ক্রেতাহীনতায় দুপুর ১.৩০টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। |
🍔 “বার্গারের কোনো ধর্ম নেই, কিন্তু রাজনীতির আছে”
বিজেপি সরকারের এই নতুন নীতি ও পুলিশি নজরদারির কারণে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ফুড চেইন এবং রেস্তোরাঁগুলো মেনু থেকে গো-মাংসের তৈরি খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ‘দ্য বার্গার শপ’ (The Burger Shop) তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্টে লিখেছে: “আমাদের বার্গারের কোনো ধর্ম নেই। কিন্তু রাজনীতির নিশ্চিতভাবেই আছে।” রেস্তোরাঁটির সহ-উদ্যোক্তা উৎসা আল জাজিরাকে বলেন, “গত১৪ মে আমরা জানতে পারি আমাদের বিফ ভেন্ডারকে স্থানীয় থানায় ডেকে নিয়ে ব্যবসা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। আকস্মিক এই ভয়ের সংস্কৃতির কারণে আমরা আমাদের বিখ্যাত বিফ বার্গার বিক্রি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছি, যা আমাদের ব্যবসার একটি বড় অংশ ছিল।”
💬 “নাগরিকদের বিরুদ্ধে এটি এক খোলা যুদ্ধ”: হর্ষ মন্দর
পশুর হাটে কড়াকড়ির পাশাপাশি কলকাতার মল্লিক বাজার ও পার্ক সার্কাসের মতো মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোতে ঈদের দিনে রাস্তায় ‘নামাজ’ (Open-street Namaz) আদায়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়করা। স্থান সংকুলানের অভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় রাস্তায় ঈদের নামাজ পড়ার দীর্ঘদিনের রীতি রয়েছে।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে বিজেপির মূল আদর্শিক উইং আরএসএস (RSS)-এর ১০০ বছরের এজেন্ডা উল্লেখ করে ভারতের বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও লেখক হর্ষ মন্দর আল জাজিরাকে বলেন:
“আরএসএস কখনোই এই দেশে মুসলিমদের সমান নাগরিক অধিকার মেনে নেয়নি। তাদের স্পষ্ট নীতি হলো—হয় মুসলিমদের এ দেশ ছাড়তে হবে, নয়তো দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার ছাড়া বেঁচে থাকতে হবে। বিজেপি সরকার এখন পশ্চিমবঙ্গে সেই এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করছে। এটি আসলে নিজের দেশেরই এক অংশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এক ধরণের খোলা যুদ্ধ (Open War)।”
তবে রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, “এখানে কোনো রাজনীতি নেই। অতীতে যেসব আইন অমান্য করে ভোটব্যাংকের রাজনীতি করা হয়েছিল, বর্তমান সরকার কেবল সেই আইনি শাসন কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠা করছে।” পশু কল্যাণ বোর্ডের সাবেক সদস্য ও আইনজীবী জয়াসিমহা নুগেহাল্লি অবশ্য মনে করেন, ভারতে পশু জবাইয়ের আইনগুলো পশুর কল্যাণের চেয়ে ধর্মীয় পরিচয়, গ্রামীণ অর্থনীতি ধ্বংস এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
📌 তথ্যসূত্র:
- আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা আল জাজিরা (Al Jazeera) বিশেষ অন-সাইট ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট (২৫ মে ২০২৬)
- পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র ও পশুপালন মন্ত্রণালয় পলিসি ডিরেক্টিভ (মে ২০২৬)
- ধুলীগড় গবাদিপশু বাজার সমিতি দৈনিক বিক্রয় রেজিস্টার ডাটা
- কলকাতার নিউ মার্কেট ও মল্লিক বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি কার্যবিবরণী ফাইল
- মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মন্দর ও আইনজীবী জয়াসিমহা নুগেহাল্লি (অন-রেকর্ড ইন্টারভিউ স্টেটমেন্ট)



