ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিতর্কিত পোস্ট; সৌদি-কাতার-তুরস্কসহ মিত্রদের ওপর চাপ; বিশ্লেষকদের মতে ‘এক কাল্পনিক স্বপ্ন থেকে আরেক কাল্পনিক মোহে রূপান্তর’
ওয়াশিংটন | ২৬ মে ২০২৬ মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধের চলমান কূটনীতিতে এক সম্পূর্ণ নতুন, নজিরবিহীন এবং বিতর্কিত শর্ত জুড়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। গতকাল সোমবার (২৫ মে) ওয়াশিংটনে এক আকস্মিক ঘোষণায় ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে যেকোনো সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে তিনি সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর এবং জর্ডান—এই ছয়টি মুসলিম রাষ্ট্রকে একযোগে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ (Abraham Accords) চুক্তিতে স্বাক্ষর করার নির্দেশ দিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রস্তাব বা নির্দেশ পাওয়ার পরপরই তা সরাসরি এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান। তবে সৌদি আরব, কাতার বা তুরস্কের মতো অন্য কোনো দেশ এখনো প্রকাশ্য কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে পুরো মুসলিম বিশ্বে যখন তীব্র ইসরায়েল-বিরোধী জনমত তৈরি হয়েছে, তখন ট্রাম্পের এমন চাপ দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে বড় ধরণের জটিলতা তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
🕒 ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্ট ও শনিবারের মেগা কল (Event Chronology)
গত শনিবার (২৩ মে) ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে (Truth Social) একটি দীর্ঘ পোস্টে এই কূটনৈতিক রদবদলের বিষয়টি নিশ্চিত করে লিখেছেন:
“আমি বাধ্যতামূলকভাবে (Mandatorily) অনুরোধ করছি যে, সব দেশ যেন অবিলম্বে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করে। যদি ইরান আমার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটি আমার জন্য সম্মানের হবে যে, ইরানও এই অতুলনীয় বিশ্ব জোটের (World Coalition) অংশ হবে। এত জটিল একটি ধাঁধাকে একত্রিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে আপ্রাণ পরিশ্রম করেছে, আমি কেবল তা বাস্তবায়ন করছি।”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও জানান, এই বিষয়ে তিনি গত শনিবার উল্লেখিত ৬টি দেশের শীর্ষ নেতাসহ পূর্বে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে সই করা সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) এবং বাহরাইনের নেতাদের সঙ্গেও টেলিফোনে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন।
📊 ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ ও ট্রাম্পের নতুন শর্তের ভৌগোলিক সমীকরণ
| দেশের নাম | ইসরায়েলের সঙ্গে বর্তমান কূটনৈতিক সম্পর্ক | ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাবের ওপর অবস্থান / প্রতিক্রিয়া |
| পাকিস্তান | কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। | সরাসরি প্রত্যাখ্যান। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, ইরান চুক্তি ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস দুটি ভিন্ন বিষয় এবং পাকিস্তানের ওপর এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। |
| সৌদি আরব | কোনো অফিশিয়াল সম্পর্ক নেই। | নীরবতা। রিয়াদের দীর্ঘদিনের অবস্থান—ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া তারা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না। |
| মিশর, জর্ডান ও তুরস্ক | আগেই কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। | কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে গাজা যুদ্ধের পর থেকে এই তিন দেশের সাথেই ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চরম তলানিতে। |
| কাতার | কোনো অফিশিয়াল সম্পর্ক নেই। | কোনো মন্তব্য করেনি। দোহার ওপর হামাস-ইসরায়েল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মার্কিন চাপ রয়েছে। |
“এক ফ্যান্টাসি থেকে আরেক ফ্যান্টাসির রূপান্তর”: বিশ্লেষকদের কড়া সমালোচনা
ট্রাম্পের এই ইরান যুদ্ধবিরতি কূটনীতিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা এক প্রকার উচ্চাভিলাষী এবং অবাস্তব চাল হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের মিত্র সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম (Lindsey Graham) এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি’ গড়ে তোলার হাতিয়ার বললেও, তীব্র সমালোচনা করেছেন থিঙ্ক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ওয়ায়েজ (Ali Vaez)।
তিনি ট্রাম্পের এই পররাষ্ট্র নীতিকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে বলেন:
“ট্রাম্প মূলত ইরানের সাথে একটি শান্তি চুক্তিকে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সিক্যুয়েল’ হিসেবে বাজারজাত বা বিক্রি করার চেষ্টা করছেন; যাতে ওয়াশিংটনের কট্টরপন্থীদের বোঝানো যায় এটি ইসরায়েলের জন্য ভালো এবং ওয়াশিংটনের জন্য একটি শক্ত অবস্থান। কিন্তু বাস্তবে তিনি একটি ফ্যান্টাসি বা অলীক কল্পনাকে আরেকটি ফ্যান্টাসির সাথে বিনিময় করছেন—ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার ব্যর্থ চেষ্টা থেকে এখন তিনি ভান করছেন যে, একটি ভঙ্গুর চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করবে।”
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
২০২০ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ ২৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা ওTaboo ভেঙে প্রথম কোনো আরব রাষ্ট্র হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে মরক্কো এবং সুদানও এই চুক্তিতে যোগ দিয়েছিল। ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে এই চুক্তিকে আরও বিস্তৃত করতে চান, যার সর্বশেষ ধাপ হিসেবে তিনি এখন চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ও এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের এই বিতর্কিত পোস্ট নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
📌 তথ্যসূত্র:
- রয়টার্স (Reuters) আন্তর্জাতিক কূটনীতি ব্যুরো, ওয়াশিংটন ও জেরুজালেম
- ডোনাল্ড ট্রাম্পের অফিশিয়াল ভেরিফাইড ট্রুথ সোশ্যাল (Truth Social) স্টেটমেন্ট (২৫ মে ২০২৬)
- ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (International Crisis Group) ইরান পলিসি উইং কমেন্ট্রি
- পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কনভেইড সোর্স ডায়েরি (ইসলামাবাদ ব্যুরো)



