Homeটুডে ওয়ার্ল্ডতাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত: ইরান যুদ্ধ ও বেইজিংয়ের ‘রেয়ার আর্থ’ কূটনীতিতে...

তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত: ইরান যুদ্ধ ও বেইজিংয়ের ‘রেয়ার আর্থ’ কূটনীতিতে ওয়াশিংটনের কৌশলগত পিছু হটার বিশ্লেষণ

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুতে টান পড়ায় তাইপে-কে অপেক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের; পরাশক্তি হিসেবে তেহরানের উত্থান এবং ওয়াশিংটনের ‘ইম্পেরিয়াল ওভারস্ট্রেচ’ নিয়ে তোলপাড়

ঢাকা | ২৪ মে ২০২৬ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের জেরে নিজেদের সামরিক উপাদানের বৈশ্বিক মজুত ধরে রাখতে তাইওয়ানের কাছে পূর্বনির্ধারিত অস্ত্র বিক্রি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ৩৯ দিন ধরে চলা ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় ওয়াশিংটনকে এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। তবে এই স্থগিতাদেশের নেপথ্যে কেবল ইরানের প্রতিরোধই নয়, বরং বেইজিংয়ের ‘রেয়ার আর্থ মিনারেল’ বা দুষ্প্রাপ্য খনিজ ভূ-রাজনীতি এবং ওয়াশিংটনের ‘ইম্পেরিয়াল ওভারস্ট্রেচ’ (সাম্রাজ্যের অতিরিক্ত বিস্তৃতিজনিত দুর্বলতা) বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে ইরানকে ‘বিধ্বস্ত রাষ্ট্র’ হিসেবে দাবি করলেও, চলমান উচ্চ-প্রযুক্তির ড্রোন ও মিসাইল যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি তেহরানের সামরিক সক্ষমতার নতুন সমীকরণ হাজির করেছে। এই পরিস্থিতিতে তাইওয়ানে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখলে চীনের পক্ষ থেকে সামরিক প্রযুক্তির কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধের প্রচ্ছন্ন হুমকির মুখেই ট্রাম্প প্রশাসন এই কৌশলগত পিছু হটার রাস্তা বেছে নিয়েছে।

বেইজিংয়ের ‘রেয়ার আর্থ’ কার্ড ও ট্রাম্পের পিছু হটা

মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘের সাবেক অস্ত্র পরিদর্শক স্কট রিটার এবং ‘স্কাই নিউজ’-এর সামরিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাইকেল ক্লার্কের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করার মূল চাবিকাঠি রয়েছে বেইজিংয়ের হাতে। আধুনিক ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল এবং যুদ্ধবিমান তৈরির অপরিহার্য উপাদান হলো রেয়ার আর্থ মিনারেল বা দুষ্প্রাপ্য খনিজ, যার সিংহভাগ বৈশ্বিক খনি ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে চীন।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন সফর থেকে ফিরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কঠোর মনোভাব ইঙ্গিত করে যে, বেইজিং ওয়াশিংটনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে—তাইওয়ানে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্রকে এই দুষ্প্রাপ্য খনিজ দেওয়া বন্ধ করবে চীন। অধ্যাপক মাইকেল ক্লার্কের ভাষায়, “এই মুহূর্তে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করার অর্থ হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বৈশ্বিক সামরিক আধিপত্য চিরতরে পুনরুদ্ধারের সুযোগ হাতছাড়া করা।” কাঁচামালের সরবরাহ বন্ধ হলে পেন্টাগন নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র বা সমরাস্ত্র তৈরিতে চরম হিমশিম খাবে, যা ওয়াশিংটনকে এই মুহূর্তে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে।

উপসাগরীয় যুদ্ধ ১৯৯১ বনাম ইরান যুদ্ধ ২০২৬: প্রযুক্তির পালাবদল

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক পেইপ এবং মধ্যপ্রাচ্য ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পার্সির মতে, ২০২৬ সালের এই সংঘাত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকে বদলে দিচ্ছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে (Gulf War) যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ৪০ দিনে ইরাককে পরাস্ত করে নিজেদের কাটিং-এজ (অত্যাধুনিক) প্রযুক্তির আধিপত্য দেখিয়েছিল, যেখানে মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি ছিল নামমাত্র। ওই যুদ্ধের পর একক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকান সেঞ্চুরি’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। গতকাল ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৩৯ দিনের এই সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার অহংকার হিসেবে পরিচিত অন্তত ৪৫টি আধুনিক যুদ্ধবিমান ও ড্রোন হারিয়েছে। ইরানের তৈরি ঝাঁকে ঝাঁকে কামিকাজে ড্রোন এবং হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত আঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও মিত্র রাষ্ট্রগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বেশ কিছু সামরিক ঘাঁটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধ্যাপক পেইপের মতে, “ইরান একটি বৈশ্বিক পরাশক্তির বিরুদ্ধে অত্যন্ত নির্ণায়ক এবং সুসংহত বিজয় (Decisive Victory) অর্জন করেছে, যা ১৯৯১ সালের মার্কিন আধিপত্যের ঠিক বিপরীত।”

🕒 ওয়ান-ইলেভেন থেকে ইরান সংঘাত: গুরুত্বপূর্ণ টাইমলাইন

  • ১৯৯১ (উপসাগরীয় যুদ্ধ): ইরাকের বিরুদ্ধে কাটিং-এজ প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাত্র ৪০ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অভাবনীয় সামরিক বিজয় ও একক পরাশক্তি হিসেবে উত্থান।
  • ২০২৪-২০২৫: ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন-তেহরান পারমাণবিক চুক্তির অচলাবস্থা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি।
  • ২০২৬ (চলমান যুদ্ধ): ৩৯ দিনব্যাপী প্রত্যক্ষ সংঘাত; মার্কিন বিমান ও ড্রোন ধ্বংস এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের সফল আঘাত।
  • মে ২০২৬ (বর্তমান স্থিতি): ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসায় তাইওয়ানে মার্কিন সমরাস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত।

ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ চাল ও ‘ইম্পেরিয়াল ওভারস্ট্রেচ’

মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-এর একটি ফাঁস হওয়া গোপন প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত হওয়া সত্ত্বেও ইরান ইতিমধ্যেই তার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন লাইন পুনরায় চালু করেছে এবং আগামী ৬ মাসের মধ্যে পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ফিরে পাবে। এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন—ইরান আগামী ২০-২৫ বছরেও সামরিকভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
একাধিক ভূ-রাজনীতি গবেষকদের মতে, ওয়াশিংটন এখন ইরানের এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সম্মানজনকভাবে বের হওয়ার একটি ‘অফ-র‍্যাম্প’ বা সুড়ঙ্গ খুঁজছে। ইরানে সামরিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে না পেরে ট্রাম্প প্রশাসন এখন তাদের মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করতে পারে। লাতিন আমেরিকার কিউবা কিংবা ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের আকস্মিক চাপ বা সামরিক আগ্রাসনের যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তাকে তাত্ত্বিক পরিভাষায় একটি ক্ষীয়মাণ সাম্রাজ্যের ‘মরণকামড়’ (The dying empire’s last gasp) হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদেরা। তাত্ত্বিক ভাষায় একেই ‘ইম্পেরিয়াল ওভারস্ট্রেচ’ বলা হয়, যেখানে একটি পরাশক্তি সামর্থ্যের অতিরিক্ত জায়গায় যুদ্ধ ও প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে ভেতর থেকে ক্ষয়ে পড়ে।

📊 ওয়ান-ইলেভেন ও বৈশ্বিক সামরিক খাতের কুইক ফ্যাক্টস

  • মার্কিন বিমান ও ড্রোন ক্ষয়ক্ষতি: ৩9 দিনের যুদ্ধে মার্কিন বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষার মুখে ৪৫টি আকাশযান হারিয়েছে (সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস)
  • ক্ষেপণাস্ত্র মজুত সংকট: ইরানের ড্রোন ও মিসাইল ইন্টারসেপ্ট করতে গিয়ে মার্কিন পেন্টাগনের প্যাট্রিয়ট ও অন্যান্য এয়ার ডিফেন্স মিসাইলের বৈশ্বিক মজুত প্রায় ৫০% হ্রাস পেয়েছে।
  • খনিজ একচেটিয়া আধিপত্য: সমরাস্ত্র ও সেমিকন্ডাক্টর তৈরির অপরিহার্য উপাদান ‘রেয়ার আর্থ মিনারেলস’-এর বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৭০%-এর বেশি নিয়ন্ত্রণ করে চীন।

​📌 তথ্যসূত্র:
​নিউ ইয়র্ক টাইমস (New York Times) বৈশ্বিক সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন
​স্কাই নিউজ (Sky News) আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ (অধ্যাপক মাইকেল ক্লার্ক স্টেটমেন্ট)
​সিআইএ (CIA) ফাঁসিয়া যাওয়া স্ট্র্যাটেজিক ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট (মে ২০২৬)
​শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগীয় সেমিনার পেপার (অধ্যাপক পেইপ জবানবন্দি)
​পেন্টাগন ও মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অফিশিয়াল সমরাস্ত্র সরবরাহ নোটিশ ও ডেটা ফাইল

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular