অগ্রহণযোগ্য ও অযৌক্তিক প্রস্তাবের লড়াইয়ে স্থবির কূটনৈতিক পথ; চীন সফরের আগে ট্রাম্পের কৌশলী অবস্থান নিয়ে বাড়ছে ধোঁয়াশা
ঢাকা | ১৩ মে ২০২৬
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সংকট এখন এক বিস্ফোরক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের প্রস্তাবকে সরাসরি নাকচ করে দেওয়ায় দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি এখন ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের সাম্প্রতিক প্রস্তাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং মার্কিন প্রস্তাবকে ইরান ‘অযৌক্তিক’ বলে আখ্যা দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তীব্রতর হচ্ছে। তিন দিন পর ট্রাম্পের সম্ভাব্য চীন সফরের প্রাক্কালে এই উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাবের দ্বৈরথ
ইরান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ দফা শর্তের বিপরীতে নিজস্ব প্রস্তাব পেশ করেছে। তবে ট্রাম্প এই প্রস্তাবকে ‘বোকামি’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন প্রস্তাবগুলোকে ‘অযৌক্তিক’ বলে দাবি করেছেন। ইরানের প্রস্তাবে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা করবে না এবং হরমুজ প্রণালি নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই রাখবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে হওয়া অর্থনৈতিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণও দাবি করেছে তেহরান।
সামরিক তৎপরতা ও কৌশলগত অবস্থান
রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরায়েল ইরাকে একটি গোপন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে বলে জানা গেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘাঁটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানকে খুব কাছ থেকে লক্ষ্যবস্তু করা। তবে সামরিক বিশ্লেষক লওরেন্সের মতে, ইরান সরাসরি ইসরায়েলে আঘাত করার সক্ষমতা রাখায় প্রতিবেশী দেশ ইরাকে হামলা চালানো তেহরানের জন্য বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নয়।
এদিকে মার্কিন পেন্টাগনের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ইরান বর্তমান অবরোধ ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা আরও কয়েক মাস অনায়াসেই সামলে নিতে পারবে। ট্রাম্প ইতিপূর্বে দাবি করেছিলেন ১০ দিনের মধ্যে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে, কিন্তু মাস পার হয়ে গেলেও ইরান শক্ত অবস্থানে টিকে আছে।
🔎 বিশ্লেষণ: ট্রাম্পের নীরবতা ও ‘চীন কার্ড’
সামরিক বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প কেন এখনই সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক গ্লেন ডাইসেনের মতে, ট্রাম্প সম্ভবত চীন সফরের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান খুঁজছেন। আগামী তিন দিন পর তাঁর চীন যাওয়ার কথা রয়েছে এবং এই সময়ে কোনো সামরিক হামলা হলে সফর বাতিল হতে পারে। এছাড়া সপ্তাহের কাজের দিনগুলোতে হামলা করলে বৈশ্বিক শেয়ার বাজারে ধস এবং জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা ট্রাম্প এড়াতে চাইছেন।
📊 তথ্যচিত্র: বর্তমান সংকটের মূল বিন্দুসমূহ
- ইরানের দাবি: পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা নয়, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি।
- যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: ইরানের প্রস্তাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে ১৪ দফা শর্তে অনড় থাকা।
- তৃতীয় পক্ষ: চীন ও রাশিয়ার সম্ভাব্য মধ্যস্থতা বা হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা।
- অর্থনৈতিক প্রভাব: হরমুজ প্রণালি অবরোধের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও দামের অনিশ্চয়তা।
💬 বিশেষজ্ঞ মন্তব্য
“আমরা আসলে একটি অর্থনৈতিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে আছি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল সামরিক, দ্বিতীয়টি ছিল বেসামরিক ধ্বংসযজ্ঞের, আর এই তৃতীয় যুদ্ধটি হচ্ছে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি শক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।”
— জিয়াং, ক্যানাডিয়ান গেম-থিয়োরিস্ট“ম্যানিয়াক ট্রাম্পকে ইরান এখন চিনে ফেলেছে। তাই তারা ছুটির দিন দেখে প্রস্তাব দিচ্ছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ নিতে না পারে।”
— জেফ্রি সাক্স, অর্থনীতিবিদ
সূত্র: Reuters, AP, CNN, Fox News, Sky News.



