৩০ আসনে পরাজয়ের নেপথ্যে ভোটার কর্তনের দাবি তৃণমূলের; অভিযোগ খতিয়ে দেখবে শীর্ষ আদালত
ঢাকা | ১৩ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এক বড় ধরনের আইনি লড়াই শুরু করেছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেস। পরিকল্পিতভাবে ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লাখেরও বেশি নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা এক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের নতুন করে অন্তর্বর্তীকালীন আবেদন করার অনুমতি দিয়েছেন।
মূল প্রেক্ষাপট
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে হারার পর তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তুলেছে যে, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। দলটির দাবি, অন্তত ৩১টি আসনের নির্বাচনী ফলাফল এই ভোটার কর্তনের কারণে সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে। সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও তৃণমূলের যুক্তি
শুনানি চলাকালীন আদালত জানান, যেসব ভোটারের নাম কর্তন সংক্রান্ত আপিল বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন এবং যে কারণে কোনো আসনের জয়ের ব্যবধান প্রভাবিত হয়েছে, সেই প্রার্থীরা সুপ্রিম কোর্টে নতুন করে ‘ইন্টারলোকিউটরি অ্যাপ্লিকেশন’ (আইএ) জমা দিতে পারবেন।
তৃণমূলের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরেন:
- গত নির্বাচনে জিতেছিল কিন্তু এবার হেরেছে—এমন ৩১টি আসনের প্রতিটিতেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বিজেপির জয়ের মার্জিনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
- একটি নির্দিষ্ট আসনে তৃণমূল প্রার্থী মাত্র ৮৬২ ভোটে হারলেও সেখানে ৫ হাজার ৪৩২ জন ভোটারের নাম কেটে দেওয়া হয়েছিল।
- রাজ্যজুড়ে ৩৫ লাখ ভোটার তালিকাভুক্তির আপিল এখনো বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে ঝুলে রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
ভারতের নির্বাচন কমিশন তৃণমূলের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে। কমিশনের আইনজীবী ডি এস নাইডু যুক্তি দেন যে, ভোটার তালিকা সংশোধন একটি নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়া। তিনি দাবি করেন:
- যেসব কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি নাম কাটা গেছে (যেমন: মালদহ ও মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের সুজাপুরে ১.৫ লাখ নাম), সেখানে তৃণমূল প্রার্থীরাই বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
- নির্বাচনী ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে হলে সংবিধান অনুযায়ী ‘ইলেকশন পিটিশন’ দাখিল করতে হবে, সরাসরি রিট আবেদন করা যায় না।
🔎 বিশ্লেষণ
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জিতে বিজেপি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসেছে। দীর্ঘ ১৫ বছর পর ক্ষমতা হারিয়ে ৮০টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপির পক্ষ থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু তুলে ভোটার তালিকা সংশোধনের চাপ ছিল, যা মমতার মতে মূলত সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি ‘নীল নকশা’। এই আইনি লড়াইয়ের নিষ্পত্তি কেবল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নয়, বরং ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলবে।
📊 তথ্যচিত্র: নাম বাদ পড়ার শীর্ষ ৫ কেন্দ্র
| আসনের নাম | বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা | নির্বাচনী ফলাফল (২০২৬) |
|---|---|---|
| সুজাপুর | ১,৫০,০০০ | তৃণমূল জয়ী |
| রঘুনাথগঞ্জ | ১,৩০,০০০ | তৃণমূল জয়ী |
| শমসেরগঞ্জ | ১,২৫,০০০ | তৃণমূল জয়ী |
| রতুয়া | ১,২৩,০০০ | তৃণমূল জয়ী |
| সূতি | ১,২০,০০০ | তৃণমূল জয়ী |
💬 মন্তব্য
শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আশ্বাস দিয়েছেন যে, ট্রাইব্যুনালগুলোতে ঝুলে থাকা ৩৫ লাখ আপিল যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা যায়, সেটি আদালতের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে। তবে তৃণমূলের আইনজীবীদের আশঙ্কা, বর্তমান গতিতে এই আপিল নিষ্পত্তি করতে অন্তত চার বছর সময় লেগে যেতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি, আজকের পত্রিকা



