দেড় দশকের ক্ষমতা হারিয়ে মমতার পরাজয় — পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার বিজেপি সরকার
বিশেষ প্রতিবেদন | টুডে টিভি বিডি ডেস্ক ৪ মে, ২০২৬
কলকাতা: ৪ মে ২০২৬। ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে এক মহাপ্রলয়ের দিন। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের আকাশ-বাতাস এখন ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনিতে মুখরিত। ২৯৩টি আসনের চূড়ান্ত ফলাফলে ১৯৯টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮৮টি আসনে থমকে গিয়ে এক বড়সড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
📊 এক নজরে ভোটের ফলাফল
| দল/জোট | প্রাপ্ত আসন | অবস্থা |
|---|---|---|
| বিজেপি (BJP) | ১৯৯ | নিরঙ্কুশ জয় |
| তৃণমূল (TMC) | ৮৮ | বড় পরাজয় |
| বামফ্রন্ট (LF) | ০২ | অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই |
| কংগ্রেস ও অন্যান্য | ০৪ | অপ্রাসঙ্গিক |
🌪️ কেন এই ধস? মমতার হারের ৫ নেপথ্য কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, দিদির অপরাজেয় দুর্গে ফাটল ধরিয়েছে নিচের পাঁচটি প্রধান ইস্যু:
১. নারী ভোটের মোড় পরিবর্তন: তৃণমূলকে “নারী-বিরোধী” প্রমাণের জোরালো প্রচার এবং কেন্দ্রীয় নারী সংরক্ষণ বিলের প্রভাব সাধারণ নারীদের মনে দাগ কেটেছে। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত ৫% নারী ভোট এবার ঘাসফুল ছেড়ে পদ্ম শিবিরে ভিড়েছে।
২. সরকারি কর্মচারীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ: ২০ থেকে ৫০ লাখ সরকারি কর্মচারী ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের ভোট এবার বিজেপির পকেটে গেছে। সপ্তম বেতন কমিশন এবং বকেয়া ডিএ-র প্রতিশ্রুতি এখানে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করেছে।
৩. আরজি কর কাণ্ডের প্রভাব: ২০২৪ সালের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং তার পরবর্তী বিশাল গণআন্দোলন তৃণমূলের শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৫ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার ইভিএমে আছড়ে পড়েছে।
৪. কেন্দ্রীয় উন্নয়নের ‘গ্যারান্টি’: নরেন্দ্র মোদির উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের আশ্বাস বাংলার মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের প্রথমবার বড় পরিসরে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে।
৫. ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ (SIR): প্রায় ২৭ লাখ “বহিরাগত” ও ভুয়া ভোটার বাদ পড়ায় এবার প্রকৃত ভোটাররা নির্ভয়ে নিজেদের রায় দিতে পেরেছেন, যা বিজেপির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
💬 ‘উইনার’ ও ‘লুজার’: কার কপালে কী জুটল?
সাফল্যের তুঙ্গে যারা:
- শুভেন্দু অধিকারী: নন্দীগ্রামে ১০ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হয়ে তিনি এখন বিজেপির প্রধান মুখ।
- দিলীপ ঘোষ: খড়্গপুরে ২৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে জিতে নিজের দাপট বজায় রেখেছেন।
- বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব: মোদি-শাহ জুটির দীর্ঘদিনের শ্রম ও পরিকল্পনা অবশেষে সফল হলো।
বিপর্যস্ত যারা: - মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে।
- বামফ্রন্ট: পাঁচ বছর শূন্য থাকার পর মাত্র ২টি আসন (ডোমকল ও আরেকটি) পেয়ে কোনোমতে মুখরক্ষা করেছে। তাদের হেভিওয়েট প্রার্থীরা প্রায় সব কেন্দ্রেই তৃতীয় স্থানে।
🔥 ভবানীপুরের সেই স্নায়ুযুদ্ধ: মোবাইল বাজেয়াপ্ত ও উত্তজনা
সবচেয়ে নাটকীয় দৃশ্য দেখা গেছে ভবানীপুরে। সকাল থেকে ব্যবধান বদলেছে বারবার। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে, নির্বাচন কমিশন প্রার্থী মমতা এবং শুভেন্দু—উভয়েরই মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করে। এমনকি তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও গণনাকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যায় শুভেন্দু ২,৯৫৬ ভোটে এগিয়ে যাওয়ার পর মমতা গণনাকেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে যান।
🗣️ শীর্ষ নেতাদের প্রতিক্রিয়া
“বাংলায় পদ্ম ফুটেছে। জনগণের শক্তির জয় হয়েছে। ২০২৬ সালের এই নির্বাচন ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।” > — নরেন্দ্র মোদি (প্রধানমন্ত্রী, ভারত)
“বাংলার মানুষ অনুপ্রবেশকারী ও তাদের স্বার্থরক্ষাকারীদের এমন শিক্ষা দিয়েছে, যা তোষণের রাজনীতি করা দলগুলো কোনোদিন ভুলতে পারবে না।” > — অমিত শাহ (কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)
“আমরা বাঘের বাচ্চার মতো লড়াই করে যাব। ওয়েট অ্যান্ড সি।” > — মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ভিডিও বার্তায়)
🔎 পরবর্তী ধাপ: কী ঘটবে বাংলার রাজনীতিতে?
কে হচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী? বিজেপি বারবার বলেছে মুখ্যমন্ত্রী হবেন একজন বাঙালি। বর্তমানে শুভেন্দু অধিকারী, শমীক ভট্টাচার্য, দিলীপ ঘোষ এবং স্বপন দাশগুপ্তের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
তৃণমূলের অস্তিত্ব ও বামেদের সংকট: ৮৮ আসন নিয়ে তৃণমূল প্রধান বিরোধী দল হিসেবে লড়াই করবে ঠিকই, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। অন্যদিকে, বামেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এখন আরও কঠিন হয়ে পড়ল।
🌍 আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
একই দিনে ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। তামিলনাড়ুতে অভিনেতা বিজয়ের দল TVK ১০৭ আসন পেয়ে ইতিহাস গড়েছে। কেরালায় কংগ্রেস এবং আসামে বিজেপি জোট পুনরায় জয়ী হয়েছে। তবে বাংলার এই পটপরিবর্তন ভারতের সামগ্রিক রাজনীতিতে বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় অক্সিজেন।
উপসংহার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দের এই ভূমিতে বিজেপি এখন ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায়। শাসনের এই অগ্নিপরীক্ষায় তারা কতটুকু সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার ডট কম, এএনআই, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও ভারতের নির্বাচন কমিশন।



