সর্বকালের সেরা ১০ ফুটবলার সিরিজ – পর্ব ২
ফুটবলের ইতিহাসে এমন খুব কম মানুষ আছেন, যাদের জীবন শুধু খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ ছিল না। কেউ ছিলেন তারকা, কেউ কিংবদন্তি, কিন্তু দিয়েগো ম্যারাডোনা ছিলেন একাই একটি যুগ। তিনি ছিলেন দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা এক বিদ্রোহী, কোটি মানুষের আশা, এক দেশের জাতীয় আবেগ এবং একই সঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
তার পায়ের স্পর্শে বল যেন আলাদা জীবন পেত। কেউ তাকে “ফুটবলের মোজেস” বলেছেন, কেউ “ফুটবলের রাজপুত্র”, আবার কেউ তাকে “ঈশ্বরের হাত” বলেই চিরকাল মনে রেখেছেন।
ব্যক্তিগত পরিচিতি
পূর্ণ নাম: দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা
জন্ম: ৩০ অক্টোবর ১৯৬০
জন্মস্থান: Lanús, আর্জেন্টিনা
মৃত্যু: ২৫ নভেম্বর ২০২০
বয়স: ৬০ বছর
উচ্চতা: ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি (১.৬৫ মিটার)
জাতীয়তা: আর্জেন্টাইন
পিতা: ডিয়েগো মারাডোনা সিনিয়র
মাতা: ডালমা সালভাদোরা ফ্রাঙ্কো (“ডোনা টোটা”)
স্ত্রী: ক্লডিয়া ভিয়াফানে (বিবাহবিচ্ছেদ)
সন্তান: ডালমা, জিয়ান্নিনা, দিয়েগো জুনিয়রসহ একাধিক সন্তান
শৈশব: কাদামাটি থেকে উঠে আসা স্বপ্ন
ম্যারাডোনার জন্ম হয়েছিল বুয়েনোস আইরেসের দরিদ্র এলাকা ভিলা ফিওরিতোতে। পরিবারের আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম।
তাদের বাড়িতে অনেক সময় খাবারও যথেষ্ট থাকত না। ছোট্ট দিয়েগো পরে বলেছিলেন:
“আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল মা–বাবাকে একটা ভালো বাড়ি দেওয়া।”
তিন বছর বয়সে তিনি প্রথম ফুটবল পান—এক আত্মীয়ের উপহার। তারপর থেকেই বল যেন তার জীবনের অংশ হয়ে যায়।
লোকজন বলতেন, ছোট্ট ছেলেটি ঘন্টার পর ঘন্টা বল মাটিতে পড়তে না দিয়ে জাগলিং করতে পারত।
প্রথম ক্লাব জীবন
মাত্র ৮ বছর বয়সে যোগ দেন জুনিয়র দল লস সেবোলিতাসে।
পরে ১৫ বছর বয়সে অভিষেক হয় Argentinos Juniors-এ।
প্রথম ম্যাচ:
২০ অক্টোবর ১৯৭৬
বনাম টালেরেস
ম্যারাডোনার বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর ৩৫৫ দিন।
প্রথম ম্যাচেই তিনি প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের পায়ের মাঝ দিয়ে বল পাঠিয়ে সবাইকে অবাক করে দেন।
ক্লাব ক্যারিয়ার
আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স
(১৯৭৬–১৯৮১)
ম্যাচ: ১৬৭
গোল: ১১৫
Boca Juniors
(১৯৮১–১৯৮২)
ম্যাচ: ৪০
গোল: ২৮
প্রথম মৌসুমেই লিগ শিরোপা।
FC Barcelona
(১৯৮২–১৯৮৪)
ম্যাচ: ৫৮
গোল: ৩৮
সমস্যা:
- গুরুতর ইনজুরি
- হেপাটাইটিস
- ক্লাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব
তবুও জিতেছিলেন:
- কোপা দেল রে
- স্প্যানিশ সুপার কাপ
SSC Napoli
(১৯৮৪–১৯৯১)
ম্যাচ: ২৫৯
গোল: ১১৫
এখানেই ম্যারাডোনা কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।
তখন ইতালিতে নাপোলি ছিল উত্তর ইতালির বড় ক্লাবগুলোর ছায়ায় থাকা দল।
ম্যারাডোনা এসে বদলে দেন সবকিছু।
জিতিয়েছেন:
- সিরি আ: ২ বার
- ইউয়েফা কাপ
- ইতালিয়ান কাপ
আজও নাপোলিতে তাকে দেবতার মতো সম্মান দেওয়া হয়।
জাতীয় দলের শুরু
প্রথম ম্যাচ:
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭
আর্জেন্টিনা বনাম হাঙ্গেরি
প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন ১৯৭৯ সালে।
১৯৭৮ বিশ্বকাপ: প্রথম বড় আঘাত
নিজ দেশে বিশ্বকাপ হলেও কোচ César Luis Menotti তরুণ ম্যারাডোনাকে বাদ দেন।
ম্যারাডোনা কেঁদে ফেলেছিলেন।
পরে তিনি বলেন—
“এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্তগুলোর একটি।”
১৯৮২ বিশ্বকাপ: প্রথম বিশ্বকাপ, প্রথম হতাশা

1982 FIFA World Cup
ম্যাচ: ৫
গোল: ২
স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ওপর প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী।
কিন্তু প্রতিপক্ষরা তাকে কঠোর ট্যাকলে আটকে দেয়।
ব্রাজিলের বিপক্ষে হতাশাজনক ম্যাচে লাল কার্ড দেখেন।
ফলাফল:
আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিদায়।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ: এক মানুষের বিশ্বকাপ
1986 FIFA World Cup
ম্যাচ: ৭
গোল: ৫
অ্যাসিস্ট: ৫
এই বিশ্বকাপকে অনেকে বলেন:
“ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ”
ইংল্যান্ড ম্যাচ: “ঈশ্বরের হাত”
কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি করেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোল।
হাত দিয়ে বল স্পর্শ করেও গোল পান।

পরে বলেন:
“কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা, কিছুটা ঈশ্বরের হাত।”
শতাব্দীর সেরা গোল
একই ম্যাচে মাঝমাঠ থেকে পাঁচজনকে কাটিয়ে গোল করেন।
ফিফা পরে এটিকে ঘোষণা করে:
“Goal of the Century”
ফাইনাল
আর্জেন্টিনা ৩–২ পশ্চিম জার্মানি
ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ হাতে তোলেন।
১৯৯০ বিশ্বকাপ: আহত অধিনায়কের যুদ্ধ
1990 FIFA World Cup
ম্যাচ: ৭
গোল: ০
গোড়ালির চোট নিয়েও খেলেন।
সেমিফাইনালে ইতালিকে হারিয়ে ফাইনালে যান।
ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে ১–০ ব্যবধানে হার।
ম্যারাডোনাকে মাঠেই কাঁদতে দেখা যায়।
১৯৯৪ বিশ্বকাপ: পতনের শুরু
1994 FIFA World Cup
ম্যাচ: ২
গোল: ১
গ্রিসের বিপক্ষে গোল করে ক্যামেরার দিকে তার উন্মত্ত উদযাপন বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত হয়ে যায়।
কিন্তু এরপর ডোপ টেস্টে নিষিদ্ধ উপাদান পাওয়া যায়।
ফিফা তাকে বহিষ্কার করে।
তার বিখ্যাত বক্তব্য:
“ওরা আমার পা কেটে ফেলেছে।”
এটাই ছিল তার শেষ বিশ্বকাপ।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান
মোট ম্যাচ: ৯১
মোট গোল: ৩৪
বিশ্বকাপ:
ম্যাচ: ২১
গোল: ৮
ক্যারিয়ার মোট
ক্লাব + জাতীয় দল:
মোট ম্যাচ: প্রায় ৬৮০+
মোট গোল: প্রায় ৩৪৫+
কোচিং ক্যারিয়ার
কোচ ছিলেন:
- Argentina national football team (২০০৮–২০১০)
- আল ওয়াসল
- ফুজাইরাহ
- ডোরাডোস
- জিমনাসিয়া
২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুললেও জার্মানির কাছে ৪–০ হারে বিদায়।
বিতর্ক ও ব্যক্তিগত জীবন
ম্যারাডোনার জীবন শুধু সাফল্যের ছিল না।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল:
- মাদকাসক্তি
- কোকেন ব্যবহার
- কর ফাঁকি
- সম্পর্ক ও পারিবারিক বিতর্ক
- সাংবাদিকদের সঙ্গে সংঘাত
তবে সমর্থকরা বলতেন:
“ম্যারাডোনা নিখুঁত ছিলেন না, কিন্তু তিনি বাস্তব ছিলেন।”
মৃত্যু
২৫ নভেম্বর ২০২০।
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
তার মৃত্যুতে আর্জেন্টিনায় তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়।
লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল।
ট্রফি তালিকা
জাতীয় দল
🏆 বিশ্বকাপ: ১৯৮৬
🏆 ফিফা যুব বিশ্বকাপ: ১৯৭৯
ক্লাব
🏆 সিরি আ: ২
🏆 ইউয়েফা কাপ: ১
🏆 কোপা দেল রে: ১
🏆 ইতালিয়ান কাপ: ১
শেষ বাঁশি
ম্যারাডোনা ছিলেন না শুধু একজন ফুটবলার। তিনি ছিলেন বৈপরীত্যের এক জীবন্ত প্রতীক—একদিকে ঈশ্বরের হাত, অন্যদিকে মানুষের দুর্বলতা। তিনি শিখিয়েছেন, মহান মানুষরাও ভুল করেন; কিন্তু প্রতিভা, সাহস আর স্বপ্ন মানুষকে অমর করে দিতে পারে। মৃত্যুর পরও তিনি ফুটবল থেকে হারিয়ে যাননি। কারণ ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় নন।
তিনি এক অনুভূতি।
আর যখনই “ঈশ্বরের হাত” কথাটি উচ্চারিত হবে, ফুটবল পৃথিবী মনে করবে—একজন ডিয়েগো মারাদোনাকে।
পরবর্তী পর্ব: Lionel Messi — রোজারিওর ক্ষুদে ছেলেটি থেকে ফুটবল-গ্রহের রাজা



