কয়েক দিন আগেও ছবিটা ছিল একটি সাধারণ পারিবারিক ছবি। হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন এক বাবা, পাশে স্ত্রী, সামনে দুই সন্তান। হয়তো কোনো ছুটির বিকেল ছিল, হয়তো কোনো বিশেষ দিনও নয়। এমন হাজারো ছবি প্রতিদিন তোলা হয় পৃথিবীর নানা প্রান্তে।
কিন্তু মানুষ জানে না—কোন ছবিটাই শেষ স্মৃতি হয়ে যাবে।
আজ সেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে অন্য কারণে। কারণ ছবির মানুষগুলোর মধ্যে এখন বেঁচে আছেন শুধু একজন—আর্জেন্টাইন ফুটবলার লুকাস ত্রেহো।
ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পে তিনি হারিয়েছেন তাঁর স্ত্রী ইয়ানিনা এবং দুই সন্তান—অ্যারন ও আইনহোয়াকে।
যখন পৃথিবী ভেঙে পড়ছিল, তখন লুকাস ত্রেহো ছিলেন মাঠে। ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব স্পোর্ট মারিতিমো লা গুয়াইরা-এর অনুশীলন ক্যাম্পে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। ফুটবলারদের জন্য এটি ছিল আরেকটি সাধারণ দিন—অনুশীলন, প্রস্তুতি, ম্যাচের ভাবনা।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই সাধারণ দিন বদলে যায় জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিনে।
স্থানীয় সময় বুধবার ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে ভেনেজুয়েলায়। মুহূর্তেই ধসে পড়ে শত শত ভবন। মানুষের জীবন আটকে যায় কংক্রিট আর ধ্বংসস্তূপের নিচে।
খবর পেয়েই কারাকাস থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার দূরের লা গুয়াইরার দিকে ছুটে যান ত্রেহো।
কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি যে দৃশ্য দেখেন, সেটি কোনো মানুষের জন্য প্রস্তুত থাকার মতো নয়।
যেখানে তাঁর বাড়ি ছিল, সেখানে আর বাড়ি নেই।
যেখানে শিশুদের হাসির শব্দ ছিল, সেখানে শুধু ধুলো আর ধ্বংসস্তূপ।
যেখানে একটি পরিবার ছিল, সেখানে শুধু নীরবতা।
ত্রেহোর শ্যালক রিকার্দো আরদিলেস পরে বলেন,
“তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। সেখানে গিয়ে দেখেছেন, আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।”
তবু মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশায় বাঁচে।
তিন দিন ধরে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খুঁজেছেন তিনি। হয়তো কোনো শব্দ শোনা যাবে, হয়তো কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটবে—এই বিশ্বাস নিয়েই।
সতীর্থরাও তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। ভিডিও বার্তায় আরও উদ্ধার সরঞ্জাম চেয়েছেন। অপেক্ষা করেছেন। প্রার্থনা করেছেন।
কিন্তু সব গল্পের শেষটা সুখের হয় না।
রোববার ক্লাব স্পোর্ট মারিতিমো লা গুয়াইরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করে—ত্রেহোর স্ত্রী ও দুই সন্তান আর নেই।
এরপর প্রকাশ করা হয় সেই ছবিটি।
এক হাতে মেয়ের কাঁধ জড়িয়ে, অন্য হাতে স্ত্রীকে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন লুকাস ত্রেহো।
একটি সাধারণ ছবি।
কিন্তু এখন সেটি আর শুধু ছবি নয়।
এটি একজন বাবার হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর শেষ স্মৃতি।
ফুটবল মানুষকে আনন্দ দেয়, উল্লাস দেয়, কখনো কান্নাও দেয়। কিন্তু জীবনের কিছু পরাজয় আছে, যেখানে কোনো শেষ মুহূর্তের গোল নেই, কোনো প্রত্যাবর্তন নেই, কোনো ট্রফি নেই।
সেখানে শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে একজন মানুষ।
আর হাতে থেকে যায় একটি ছবি।
তথ্যসূত্র: সিএনএন, প্রথম আলো



