আফগানিস্তানের প্রথম ও একমাত্র মহাকাশচারী আহাদ ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে ৬৭ বছর বয়সে জার্মানিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন
ঢাকা | ৩০ জুন ২০২৬
পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ আর সীমানার প্রাচীর পেরিয়ে যিনি একদিন মহাশূন্যের অসীমতায় বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন পবিত্র কুরআনের আলো, সেই কিংবদন্তি আব্দুল আহাদ মোমান্দ আর নেই। দীর্ঘকাল মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে ২০২৬ সালের ২১ জুন, রোববার জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আফগানিস্তানের এই বীর সন্তান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তাঁর এই চলে যাওয়া যেন মহাবিশ্বের বুক থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের খসে পড়া, যার শূন্যতা কখনো পূরণ হবার নয়।
গজনী থেকে মস্কো: স্বপ্নের উড়ান
১৯৫৯ সালের ১লা জানুয়ারি আফগানিস্তানের গজনী প্রদেশের আন্দার জেলার সারদেহ অঞ্চলের এক প্রত্যন্ত পরিবারে জন্ম নেন আব্দুল আহাদ মোমান্দ। সাধারণ এক আবহ থেকে উঠে এসে তাঁর মেধা ও স্বপ্নের সীমানা ছিল আকাশচুম্বী।
- শিক্ষার হাতেখড়ি: কাবুলের বিখ্যাত হাবিবিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি তাঁর মাধ্যমিক শিক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
- উচ্চশিক্ষা: পরবর্তীতে মেধার স্বাক্ষর রেখে ভর্তি হন কাবুল পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে।
- মস্কোর দিনগুলি: আকাশ ছোঁয়ার অদম্য ইচ্ছা তাঁকে নিয়ে যায় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে, যেখানে তিনি মস্কোর ইউরি গাগারিন সামরিক বিমান একাডেমিতে উচ্চতর সামরিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।
সামরিক জীবন ও মহাকাশের ডাক
শিক্ষাজীবন শেষে আব্দুল আহাদ আফগান সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে কঠোর বিমান চালনা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তিনি আফগান বিমান বাহিনীর একজন দক্ষ যুদ্ধবিমান চালক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং পরবর্তীতে কর্নেল পদে উন্নীত হন।
তাঁর এই অসামান্য পেশাগত যোগ্যতাই তাঁকে ইতিহাসের দুয়ারে দাঁড় করিয়ে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক ‘ইন্টারকসমস’ মহাকাশ কর্মসূচির জন্য যখন ৪০০ জন দক্ষ আবেদনকারী অংশ নেন, তখন তাঁদের মধ্য থেকে কঠোর বাছাই প্রক্রিয়া শেষে যে ৮ জন চূড়ান্ত প্রার্থী নির্বাচিত হন—তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই তরুণ আফগান কর্নেল।
মহাকাশ অভিযান: ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে নাম
১৯৮৮ সালের ২৯শে আগস্ট—এই দিনটি কেবল আব্দুল আহাদের জীবনেই নয়, বরং গোটা মুসলিম উম্মাহ ও আফগানিস্তানের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। সেদিন তিনি সোভিয়েত মহাকাশচারী ভ্লাদিমির লিয়াখভ ও ভ্যালেরি পলিয়াকভের সাথে ‘সয়ুজ টিএম-৬’ মহাকাশযানে চেপে মহাশূন্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। তাঁদের গন্তব্য ছিল বিখ্যাত ‘মির’ মহাকাশ স্টেশন।
তিনি ছিলেন সুলতান বিন সালমান আল সৌদ, মুহাম্মাদ ফারিস ও মুসা মানারভের পর মহাকাশের অসীমতায় পা রাখা চতুর্থ মুসলিম। ‘মির’ স্টেশনে তিনি প্রায় ৯ দিন (৮ দিন ২০ ঘণ্টা ২৬ মিনিট) অবস্থান করেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্পন্ন করেন।
মহাকাশের বুকে অনন্য কীর্তিগাথা:
- প্রথম কুরআন বাহক: ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তিনি মহাকাশে পবিত্র কুরআন সাথে নিয়ে যান এবং সেখানে পবিত্র ঐশী বাণী তেলাওয়াত করেন।
- মাতৃভাষার গৌরব: প্রথম নভোচারী হিসেবে মহাকাশের অসীম দূরত্ব থেকে স্বদেশে ফোন করে পশতু ভাষায় কথা বলেন।
- ভাষার মর্যাদা: তাঁর এই কথোপকথনের মাধ্যমে ‘পশতু’ ভাষা মহাকাশে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা চতুর্থ ভাষা হিসেবে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়।
মহাকাশে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ: এক অসীম সাহসিকতার গল্প
আব্দুল আহাদের মহাকাশযাত্রা কেবল গৌরবময়ই ছিল না, তা ছিল চরম বিপজ্জনক ও রোমাঞ্চকর। পৃথিবীতে ফিরে আসার পথে এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয় তাঁদের বহনকারী ‘সয়ুজ টিএম-৫’ মহাকাশযানটি। অবতরণ প্রক্রিয়ার সময় তীব্র সূর্যালোকের কারণে যানের ইনফ্রারেড সেন্সরটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে পরপর দুইবার তাঁদের অবতরণ চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ঠিক সেই চরম মুহূর্তে, যখন মৃত্যু কড়া নাড়ছিল, তখন আব্দুল আহাদ অত্যন্ত সতর্ক চোখে লক্ষ্য করেন যে, কম্পিউটার ভুলক্রমে প্রথম অবতরণ প্রক্রিয়ায় রকেট ইঞ্জিন ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এই রকেট ইঞ্জিনটিই ছিল তাঁদের পৃথিবীতে ফিরে আসার একমাত্র অবলম্বন। তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সময়মতো পাইলট লিয়াখভকে এই মারাত্মক ভুলের কথা জানিয়ে সতর্ক করেন। তাঁর এই তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও অসীম সাহসিকতার কারণেই সেদিন পুরো ক্রু নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।
পরবাস জীবন এবং শান্তির অমিয় বাণী
সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আব্দুল আহাদ জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ২০০৩ সালে তিনি জার্মান নাগরিকত্ব লাভ করেন। স্বদেশের মাটি থেকে দূরে থাকলেও হৃদয়ে সারাক্ষণ বয়ে বেড়িয়েছেন আফগানিস্তানের ধূলিকণা।
২০১৩ সালে তাঁর ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযানের ২৫তম বার্ষিকীতে তিনি পরম মমতায় ফিরে এসেছিলেন প্রিয় মাতৃভূমিতে। সাক্ষাৎ করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সাথে। যুদ্ধবিক্ষুব্ধ স্বদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি সমস্ত আফগানদের উদ্দেশ্যে এক কালজয়ী শান্তির আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন—
“আমি সব আফগান ভাই ও সহনাগরিকদের বলছি, একত্রে দাঁড়ান, অস্ত্র নামিয়ে রাখুন, সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন এবং একে অপরকে सहনশীলতা দেখান।”
মহাপ্রস্থান ও বিনম্র শ্রদ্ধা
দীর্ঘদিন ধরে মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে লড়াই করা এই বীর যোদ্ধা অবশেষে ২০২৬ সালের ২১ জুন জার্মানির স্টুটগার্টে চিরদিনের জন্য চোখ বুঁজলেন। তাঁর প্রস্থানে আফগানিস্তানের বিজ্ঞান, ইতিহাস ও জাতীয় ঐতিহ্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছেন:
“আব্দুল আহাদ মোমান্দ ছিলেন প্রথম আফগান যিনি মহাকাশে ভ্রমণ করেছেন এবং আফগানিস্তানের জন্য এক অসাধারণ ও অবিস্মরণীয় উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। আমি তার পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনের প্রতি সমবেদনা জানাই। আমি প্রার্থনা করি, আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করুন এবং তার পরিবারকে ধৈর্য দিন।”
তিনি মহাকাশের সীমানায় আফগানিস্তানের নামকে চিরদিনের জন্য খোদাই করে দিয়ে গেছেন। আজ হয়তো তিনি সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু মহাকাশের নীলিমায় কুরআন বুকে তাঁর সেই ঐতিহাসিক যাত্রার গল্প পৃথিবীর বুকে, বিশেষ করে আফগানিস্তানের জাতীয় স্মৃতিতে রূপকথা হয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল। একুশ শতকের এই মহানায়কের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।



