ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার ভেতর একজন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের অবস্থান, আর বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের তুলনামূলক পাঠ
ঢাকা | ২৯ জুন ২০২৬
যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, কে কীভাবে কথা বলছে। যুদ্ধ যখন কেবল কামান বা ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয় থাকে না, তখন তা হয়ে ওঠে নৈতিক অবস্থান, বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রের ভেতরের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার সাম্প্রতিক পর্বে সেটিই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ মোহাম্মদ মারান্ডি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রোফাইল অনুযায়ী তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক; Al Jazeera-র লেখক প্রোফাইলেও তাঁকে University of Tehran-এর professor হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৮ সালে Guernica-র এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি দুই দফা রাসায়নিক হামলা থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন।
এই পরিচয়টা শুধু জীবনী নয়; এটি অবস্থানেরও পরিচয়। কারণ, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকা একজন শিক্ষকের কথা আর স্টুডিওতে বসা রাজনৈতিক মন্তব্যকারীর কথা এক নয়। তিনি দেশকে ভালোবেসেও রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে পারেন, আর রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করেও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে থাকতে পারেন—এই সহজ কিন্তু দুর্লভ ব্যালান্সটাই আজকের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রেক্ষাপট: কেন মারান্ডি গুরুত্বপূর্ণ
সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা ও পাল্টা হামলার অভিযোগ এনেছে। Reuters ও AP-র রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ২৮ জুন ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, আর তার আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বিমান হামলা চালায়। একই সঙ্গে Tehran Strait of Hormuz-এর “reopening and continued operation” নিয়ন্ত্রণ করবে বলে অবস্থান নেয়; Reuters জানায়, U.S.-assisted commercial transits চললেও তা ঐতিহাসিক গড়ের নিচে ছিল।
এই পরিস্থিতিতে মারান্ডির মতো একজন শিক্ষক কেন প্রতীকী হয়ে ওঠেন, তার উত্তর হলো—তিনি ক্ষমতার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকলেও ক্ষমতার অনুচর নন। তাঁর কণ্ঠে জাতীয় আত্মরক্ষা আছে, কিন্তু অন্ধ আনুগত্য নেই। Guernica-র সাক্ষাৎকারে তিনি যুদ্ধের রাসায়নিক আঘাতের স্মৃতি টেনে বলেছিলেন, কীভাবে সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে আজও তাড়া করে। এমন মানুষ রাষ্ট্রকে অন্ধভাবে প্রশংসা করেন না; বরং রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার শর্তগুলো মনে করিয়ে দেন।
তথ্য ও উপাত্তের আলোকে
ইরান আজ যে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপের মধ্যে আছে, তা কেবল বন্দুকের লড়াই নয়। Reuters-এর তথ্য বলছে, Hormuz দিয়ে বাণিজ্যিক ট্রানজিট পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কিন্তু ঝুঁকি এতটাই বেড়েছে যে স্বাভাবিক প্রবাহ নড়বড়ে। AP জানাচ্ছে, ইরান আবারও Bahrain ও Kuwait-এ হামলা চালিয়ে বলছে, আলোচনায় যেতে হলে তাদের শর্ত মানতে হবে।
এখানেই মারান্ডির গুরুত্ব। তিনি যুদ্ধকে শুধু আবেগ দিয়ে বোঝেন না; তিনি বোঝেন রাষ্ট্রের কাঠামো, জনমতের ভূমিকা, এবং শত্রুপক্ষের মনস্তত্ত্ব। তিনি আলাদা করে বলতে শিখেছেন—নিজ দেশকে সমর্থন করা আর নিজের সরকারকে প্রশ্ন করা এক জিনিস নয়, কিন্তু দুটো একসঙ্গে চলতে পারে। এই সক্ষমতা একটি শিক্ষিত সমাজের পরিচয়।
ভিন্নমত ও বিতর্ক
এই জায়গায় স্বাভাবিকভাবেই একটি ভিন্নমত থাকতে পারে। কেউ বলতে পারেন, যুদ্ধের সময় অতিরিক্ত সমালোচনা জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে। কেউ আরও বলতে পারেন, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কথা বললেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে “গুরুত্বপূর্ণ” হয়ে যান না।
কিন্তু বিপরীত যুক্তিটা আরও শক্তিশালী: যুদ্ধের সময়ই সত্যিকারের বুদ্ধিজীবীকে চিনে নেওয়া যায়। কারণ, তখন সুবিধাবাদী নীরবতা আর নীতিগত অবস্থান—এই দুটির পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যিনি যুদ্ধের মধ্যেও চিন্তা, যুক্তি ও প্রশ্নকে বাঁচিয়ে রাখেন, তিনিই আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষা করেন।
বাংলাদেশি শিক্ষাঙ্গনের অস্বস্তিকর তুলনা
এখানেই বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা আসে—এটি কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রশ্ন। আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়-পরিবেশে শিক্ষকতা কি সত্যিই প্রশ্ন করার কাজ, নাকি ক্ষমতার সঙ্গে ছবি তোলার কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে? একজন শিক্ষক যদি প্রাইম মিনিস্টারের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থানকে “মূল্য” হিসেবে দেখান, তাহলে শিক্ষার মর্ম কোথায় থাকে?
আমি এই প্রশ্ন তুলছি কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার কাজ কেবল ডিগ্রি দেওয়া নয়; শিক্ষার কাজ প্রশ্ন করা, ভুল ধরিয়ে দেওয়া, ক্ষমতার ভাষা শোধরানো। যেদিন শিক্ষক ক্ষমতার নিকটতা নিয়ে গর্ব করবেন, সেদিনই শিক্ষাঙ্গনের সবচেয়ে বড় পরাজয় ঘটে যাবে।
নাগরিক জীবনে প্রভাব
এই আলোচনা সাধারণ মানুষের জন্যও জরুরি। কারণ, একটি রাষ্ট্রে শিক্ষকরা যদি নীরব থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের ভুলগুলো প্রশ্নহীন থেকে যায়। আর ভুল প্রশ্নহীন থাকলে তা নীতি, প্রশাসন এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুতেই ছায়া ফেলে।
ইরানের উদাহরণ দেখায়, একটি শিক্ষা-সংস্কৃতি দেশকে ভেতর থেকে শক্তি দিতে পারে। আবার বাংলাদেশের বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা যদি ক্ষমতার আনুকূল্যে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সমাজে আত্মসমালোচনার জায়গা ছোট হয়ে যায়। তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে গবেষণা, নীতি-চিন্তা, এবং নাগরিক সাহসের ওপর।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চিত্র
বর্তমান বাস্তবতা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এখনো হরমুজ, লেবানন ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
নিকট ভবিষ্যৎ
যদি কূটনীতি থমকে যায়, তাহলে যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিকও হবে। হরমুজের ট্রানজিট, তেল-গ্যাস বাজার, এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আরও চাপের মুখে পড়বে। Reuters বলছে, ট্রানজিট চললেও গতি স্বাভাবিক হয়নি।
দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন
এ রকম সময়ে কোন দেশ কেমন শিক্ষক তৈরি করে, সেটাই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে। মারান্ডির মতো শিক্ষক দেখান—দেশকে ভালোবাসা আর প্রশ্ন করা বিরোধী জিনিস নয়; বরং রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য দুটোই দরকার।
তথ্য বনাম মতামত
তথ্য:
মারান্ডি University of Tehran-এর অধ্যাপক; Guernica-তে তিনি যুদ্ধকালে রাসায়নিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার কথা বলেছেন; সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে Bahrain ও Kuwait-এ হামলা, Hormuz নিয়ে নতুন চাপ, এবং সীমিত বাণিজ্যিক চলাচল—সবই Reuters, AP ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে আছে।
মতামত:
কোনো দেশের শিক্ষক যদি প্রশ্ন করতে না পারেন, তাহলে সেই দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন দুর্বল হয়ে পড়ে—এটি লেখকের মূল্যায়ন।
বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় অংশ ক্ষমতার চেয়ে জনসমাজের প্রতি বেশি দায়বদ্ধ হতে পারত—এটিও লেখকের বিশ্লেষণ।
শেষ কথা
ইরানের অধ্যাপক মারান্ডি আমাকে যা শেখান, তা কেবল ভূ-রাজনীতি নয়; এটি শিক্ষার নৈতিকতা। একজন শিক্ষক নিজের রাষ্ট্রকে সমর্থন করতে পারেন, আবার তার ভুল ধরিয়েও দিতে পারেন। তিনি দেশকে নিয়ে গর্ব করতে পারেন, কিন্তু সরকারের কাছে বিকিয়ে যেতে পারেন না।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও যদি সেই সাহস থাকত—প্রশ্ন করার, ভুল ধরানোর, এবং ক্ষমতার সামনে সোজা দাঁড়ানোর—তাহলে হয়তো আমাদের শিক্ষাঙ্গনও আর “সার্টিফিকেট-কারখানা” থাকত না।
তথ্যসূত্র: University of Tehran profile, Al Jazeera author profile, Guernica interview, Reuters, AP, Al Jazeera.



