Homeনাগরিক দর্পণজুলাই জাদুঘর নিয়ে ষড়যন্ত্রের গন্ধ, খুলবে কি আগস্টে?

জুলাই জাদুঘর নিয়ে ষড়যন্ত্রের গন্ধ, খুলবে কি আগস্টে?

সচিবের ষড়যন্ত্র ও প্রতিমন্ত্রীর মদদের অভিযোগ — প্রধানমন্ত্রীর শক্ত হস্তক্ষেপ ছাড়া ইতিহাসের দরজা খুলবে না

✍️ জুলকারনাইন সায়ের খান সামি | ২৯ জুন ২০২৬

⚠️ উদ্বোধন হবে না আগস্টেও?

জুলাই জাদুঘর ২০২৬ সালের আগস্টেও উদ্বোধন হবে না — যদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্রুত এ বিষয়ে শক্ত নির্দেশ প্রদান না করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যেই সংসদে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই জাদুঘর উদ্বোধন করবেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়েই জাদুঘর পরিদর্শন শেষে ভূয়সী প্রশংসা করে আগামী আগস্টের আগেই উদ্বোধনের কথা বলেছেন।

কিন্তু বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, জুলাই জাদুঘর সময়মতো উদ্বোধন না করার জন্য এবং উদ্বোধন করা হলেও বাজে ব্যবস্থাপনায় এর পরিচালনা বাধাগ্রস্ত করতে যাবতীয় ষড়যন্ত্র চালাচ্ছেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মাওলা, আর তাঁকে পেছন থেকে সমর্থন দিচ্ছেন সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী।

বিএনপি সরকার গঠনের পর, এমনকি জাতীয় সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার পরিদর্শনের পরও আজ পর্যন্ত জুলাই জাদুঘর বিষয়ক একটা ফাইলও এগোয়নি — একটাও না।

এখন আগামীকালও যদি প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেন, তবুও ৫ আগস্ট এই জাদুঘর উদ্বোধন করা কঠিন হবে।

🔍 সচিবের বৈঠক ও সংসদ অবজ্ঞার অভিযোগ

গতকাল কানিজ মাওলা একটি সভা করেছেন বলে জানতে পেরেছি। সেই সভায় তিনি বলেছেন, জাদুঘরের নিয়োগ বিধিতে পরিবর্তন আনার জন্য সুপারিশ করবেন।

প্রশ্ন হলো, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ যে জুলাই জাদুঘর আইন পাস করেছে, সেটায় পরিবর্তন আনার অনুমোদন তিনি কোথায় পেলেন? সংসদকে অবজ্ঞা করার ক্ষমতা কে তাঁকে দিয়েছে?

এর পেছনে তাঁর দুটি উদ্দেশ্য বলে অভিযোগ করা হচ্ছে:

১. নিয়োগ কমপক্ষে দুই মাস পেছানো।
২. অযোগ্য লোকজন নিয়োগ দেওয়া।

এই সচিবকে এসব কালক্ষেপণ বন্ধ করে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে অতি দ্রুত জুলাই জাদুঘরে নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে।

তিনি আরও বলেছেন, আপাতত বিভিন্ন দপ্তর থেকে লোক এনে মিউজিয়াম খুলে দেবেন। আমি নিশ্চিত, এই মিউজিয়াম সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই নেই — অধীনস্থ দপ্তরের জনবল সম্পর্কেও না।

🌍 বিশ্বমিডিয়ার ভূয়সী প্রশংসা

জুলাই জাদুঘরে আমার পরিচিত অনেকেই গেছেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনেকেও গেছেন। প্রত্যেকে বলেছেন এই জাদুঘর একেবারেই অনন্য।

বিশ্বখ্যাত পত্রিকা ফ্রান্সের লা মোঁদে, জার্মান শীর্ষ দৈনিক তাজ এবং ব্রিটিশ দ্য টাইমস এই জাদুঘরের ভূয়সী প্রশংসা করেছে।

এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি আয়োজন। এদিক-ওদিক থেকে সরকারি লোকবল জড়ো করে ঠেকা দিয়ে চালানোর মতো বিষয় এটা নয়।

এই জাদুঘর চালাতে যে বিশেষজ্ঞ জনবল প্রয়োজন, তাদের দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি এতদিন এই জাদুঘরের সব কাজ কেন বন্ধ করে রাখা হয়েছিল — এর কারণ জানতে মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাব চাওয়া দরকার।

ভুলে যাওয়া চলবে না — মন্ত্রণালয় জুলাই জাদুঘরের মালিক নয়, ম্যানেজার মাত্র। যা ইচ্ছা তা করার কোনো অধিকার তাদের কেউ দেয়নি।

💣 গ্রেনেড উদ্ধার: ফারুকীকে হত্যার চক্রান্ত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৪ সালে হাসিনার পতন ও পলায়নের পর পরই প্রথম গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তর করার কথা বলেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী একটি বিশাল দল নিয়ে মাত্র এক বছরের মধ্যে সেটা গুছিয়ে আনেন — যা প্রায় অবিশ্বাস্য।

কিন্তু জাদুঘরের কাজ চলার সময় ফারুকীকে ঘিরে কী ভয়াবহ পরিকল্পনা হয়েছিল, সেসব আজ জাতির জানা প্রয়োজন।

জাতীয় নির্বাচনের মাস তিনেক আগে জাদুঘরের অভ্যন্তর থেকে একটি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়। ফারুকী তখন তাঁর দাপ্তরিক অনেক কাজ এই জাদুঘরের অস্থায়ী কার্যালয় থেকে পরিচালনা করতেন।

গ্রেনেড উদ্ধারের পর পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে উদঘাটন হয় যে, জাদুঘরে শ্রমিকের ছদ্মবেশে কার্যক্রম-নিষিদ্ধ সংগঠনের কয়েকজন সদস্য প্রবেশ করেছিল। তাদের মধ্যে জুলাইয়ে ছাত্র হত্যার মামলার আসামিও ছিল — এবং তারা অতর্কিতে হামলা চালিয়ে ফারুকীকে হত্যার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে।

যাঁরা সেসময় জাদুঘরের কাজের সাথে জড়িত ছিলেন বা কোনো প্রয়োজনে সেখানে গিয়েছিলেন, একটু স্মরণ করলেই সেসময়কার কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণ এখন বুঝতে পারবেন।

✊ ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট

এই জাদুঘরের উদ্বোধন নিয়ে যাঁরা কালক্ষেপণ করছেন, তাঁদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য কী, সেটা বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না।

একটি রুথলেস স্বৈরশাসক ও তার কর্তৃত্ববাদী সরকারের নিপীড়ন ও নির্যাতনের জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে ওই স্বৈরশাসকের বাসভবনকেই জাদুঘরে রূপান্তর করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে — পতিত শাসকগোষ্ঠীর কুৎসিত চেহারা আরও প্রকটভাবে ফুটে উঠবে।

সম্ভবত সেটাই কিছু বিশেষ ব্যক্তির সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


লেখক পরিচিতি: জুলকারনাইন খান সায়ের সামি, আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments