মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য কর ছাড় বাড়ছে; তবে রেয়াত কমানো ও উৎসে কর ব্যবস্থার পরিবর্তনে প্রকৃত সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকা | ২৮ জুন ২০২৬
উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থাকা করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীদের একটি অংশ সরাসরি করের চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।
তবে অর্থনীতিবিদ ও কর বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, শুধু করমুক্ত সীমা বাড়ানোই কি প্রকৃত অর্থে মানুষের করের বোঝা কমাবে? কারণ একই সঙ্গে কর রেয়াত কমানো, সঞ্চয়পত্র ও আমানতের সুদের ওপর কর কাঠামোর পরিবর্তন এবং বিনিয়োগ সুবিধা সংকুচিত করার মতো সিদ্ধান্তও আসছে।
কী পরিবর্তন আসছে
জাতীয় সংসদে পাসের অপেক্ষায় থাকা অর্থবিলে ব্যক্তিশ্রেণির কর কাঠামোয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে—
• করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা
• ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া
• জমি ও ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শনের বিশেষ সুযোগ বাতিল
• শেয়ারবাজারে লভ্যাংশ করের বর্তমান হার বহাল রাখা
• সঞ্চয়পত্র ও এফডিআরের উৎসে করকে চূড়ান্ত করের বদলে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা
• বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সীমা ১৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা
সংখ্যায় কর পরিবর্তন
• বর্তমান করমুক্ত আয়: ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা
• প্রস্তাবিত সীমা: ৪ লাখ টাকা
• বৃদ্ধি: ৫০ হাজার টাকা
• কর রেয়াত: ১৫% থেকে ১০%
• ন্যূনতম করহার: ৫% থেকে ১০%
• বেতন আয়ের কার্যকর করমুক্ত সীমা: প্রায় ৬ লাখ টাকা
স্বস্তির পাশাপাশি নতুন প্রশ্ন
করমুক্ত সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে মূল্যস্ফীতিজনিত চাপ মোকাবিলার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ফলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।
এ অবস্থায় করমুক্ত সীমা বাড়ানো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে একই সঙ্গে অন্য পরিবর্তনগুলো কর ব্যবস্থাকে নতুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সঞ্চয়পত্র, সরকারি সিকিউরিটিজ এবং ব্যাংক আমানতের সুদে কাটা উৎসে কর এখন আর চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং তা অগ্রিম কর হিসেবে সমন্বয় হবে। ফলে বছর শেষে পূর্ণাঙ্গ আয়কর হিসাবের সময় কিছু করদাতার অতিরিক্ত কর দায় তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে বিনিয়োগভিত্তিক কর রেয়াত কমানোয় কর পরিকল্পনার সুযোগও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কর বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি এক ধরনের “নির্বাচিত কর-স্বস্তি ও করভিত্তি সম্প্রসারণ” কৌশল— যেখানে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হলেও অন্যদিকে রাজস্বের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ব্যবসা ও বিনিয়োগ খাতে কী প্রভাব
কর কাঠামোর পরিবর্তনের প্রভাব ব্যবসা ও বিনিয়োগ খাতেও পড়তে পারে।
ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যবাধকতা তুলে দিলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সহজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
তবে জমি ও ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শনের বিশেষ সুযোগ বাতিল হওয়ায় রিয়েল এস্টেট খাতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
এদিকে শেয়ারবাজারে লভ্যাংশ করের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের জন্য কী অর্থ বহন করে
সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব:
✓ নিম্ন আয়ের মানুষের করযোগ্য আয় কমবে
✓ হাতে কিছু অতিরিক্ত অর্থ থাকতে পারে
✓ সঞ্চয়ের সক্ষমতা কিছুটা বাড়তে পারে
তবে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জও রয়েছে—
✗ সঞ্চয়পত্র ও এফডিআরের বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত কর হিসাবের প্রয়োজন হতে পারে
✗ কর রেয়াত কমে যাওয়ায় কিছু করদাতার মোট কর দায় বাড়তে পারে
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
মূল্যস্ফীতির সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কর কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য কর ছাড় বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করছে। তবে উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিনিয়োগে কর প্রণোদনা তুলনামূলক বেশি থাকার কারণে করদাতারা দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত সুবিধা পেয়ে থাকেন।
রাজস্বের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোয় সরকারের রাজস্ব আদায়ে কিছু চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। ফলে করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসন শক্তিশালী করা এবং বিকল্প রাজস্ব উৎস তৈরির বিষয়গুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়ার ভাষায়,
“করমুক্ত সীমা বাড়ানোয় নিম্ন আয়ের মানুষ উপকৃত হবেন। তবে কর ব্যবস্থার অন্যান্য পরিবর্তন বাস্তবে কিছু মানুষের করের চাপ বাড়াতেও পারে।”
ঘটনাপঞ্জি
২০১৫–১৬ : করমুক্ত আয় ২.৫ লাখ টাকা
২০২০–২১ : ৩ লাখ টাকা
২০২৩–২৪ : ৩.৫ লাখ টাকা
২০২৫–২৬ : ৩.৭৫ লাখ টাকা
২০২৬–২৭ : ৪ লাখ টাকা (প্রস্তাবিত)
তথ্যসূত্র: অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), প্রস্তাবিত অর্থবিল ২০২৬–২৭, কর বিশেষজ্ঞদের মতামত, যুগান্তর



