নিজস্ব প্রতিবেদক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ ব্যবহারের পর পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, তাঁর মন্তব্য সরকারের অবস্থান নয়। একই সময়ে নতুন আইজিপি নিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত নথি চেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, আইজিপির বক্তব্য সরকারের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং হেফাজতে মৃত্যুর বিরোধী। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, আর সেই নীতির প্রতি সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে। সোমবার, ২৬ অক্টোবর ঢাকার চকবাজারে একটি অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, যেখানে ক্রসফায়ার প্রয়োজন হবে এবং সরকার অনুমতি দেবে, সেখানে পুলিশ তা করবে। বক্তব্যটি প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন পক্ষ সমালোচনা করে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যা
বিতর্কের পর পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, আইজিপি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেছেন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের কথা বোঝাতেই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যায় জানানো হয়। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনও আইজিপির পক্ষে বক্তব্য দিয়েছে। সংগঠনটির মতে, প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সময় শব্দচয়নে ভুল হতে পারে; তবে সেটিকে বিচারবহির্ভূত হত্যার সমর্থন হিসেবে দেখা উচিত নয়। পুলিশকে সংবিধান ও আইনের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে বলেও সংগঠনটি উল্লেখ করেছে।
নতুন আইজিপি নিয়োগ নিয়ে আলোচনা
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন আইজিপি নিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনায় তিনজন অতিরিক্ত আইজিপির ব্যক্তিগত ও পেশাগত নথি চেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তাঁরা হলেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের প্রধান হাসিব আজিজ, অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবিব পলাশ। তবে তিন কর্মকর্তার নথি চাওয়া মানেই নতুন আইজিপি নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন নয়। এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বর্তমান আইজিপির পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে বলা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, জাপান সফর শেষে দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রশ্নে জবাবদিহি কেন জরুরি
‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত। অপরাধ দমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও কোনো সন্দেহভাজনকে আদালতে বিচার ছাড়াই হত্যা করার সুযোগ আইনসম্মত নয়। পুলিশি অভিযানে বলপ্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দিলে তা আইন, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার সীমার মধ্যে থাকতে হয়। এই বিতর্কের নিষ্পত্তিতে শুধু ব্যাখ্যা নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমা নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। আইজিপির ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে আইনের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতিও কার্যকরভাবে বজায় রাখতে হবে। তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিডিনিউজ২৪, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর।




