৩০টি কূপ খনন শেষ, আরও ৮৫ mmcfd গ্যাসের আশা; নতুন LNG টার্মিনাল, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনার কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, LNG অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা—এই পাঁচটি পথে এগোনোর কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি সরকারের জ্বালানি পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (mmcfd) গ্যাস যুক্ত হয়েছে। আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে অতিরিক্ত ৮৫ mmcfd গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে এবং বর্তমান সংকটের পেছনে এটিকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি—বাপেক্সকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং দুটি নতুন রিগ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি দেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বড় আকারের ভূকম্পন জরিপও করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু আমদানি নয়, মাটির নিচের গ্যাসেই ফের জোর
সরকার ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার এলাকায় 2D seismic survey এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় 3D seismic survey করার পরিকল্পনা করছে। লক্ষ্য হলো দেশে নতুন গ্যাসের মজুত কোথায় রয়েছে, সেটি দ্রুত শনাক্ত করা এবং উৎপাদনে আনা।
একই সঙ্গে offshore Model Production Sharing Contract বা PSC-2026 অনুমোদন করে সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য bidding round আহ্বান করা হয়েছে। onshore PSC-এর অনুমোদন প্রক্রিয়াও চলছে। সরকারের ধারণা, সমুদ্র ও স্থল—দুই জায়গাতেই অনুসন্ধান বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব।
কুতুবদিয়ায় নতুন LNG টার্মিনালের পরিকল্পনা
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি LNG আমদানির সক্ষমতাও বাড়াতে চায় সরকার। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি নতুন floating LNG terminal স্থাপনের বিষয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই টার্মিনাল থেকে regasified LNG ডিসেম্বর ২০২৮ নাগাদ সরবরাহ শুরু হতে পারে। আগামী দুই বছরে LNG আমদানি আরও ৬০০ mmcfd বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও সংসদে জানানো হয়েছে।
এর পাশাপাশি পায়রা, মোংলা বা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আরও এক বা দুটি floating storage and regasification unit বা FSRU স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
বিদ্যুতের জন্য গ্যাস, গ্যাসের জন্য শিল্প—দ্বৈত চাপ সামলানোর চেষ্টা
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে কঠিন দিক হলো, একই গ্যাসকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প—দুই খাতেই ব্যবহার করতে হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে এবং শিল্প কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হয়। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি গ্যাস ব্যবহার করলে শিল্পে গ্যাসের ঘাটতি বাড়ে।
এই পরিস্থিতিতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি LNG আমদানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তবে আমদানিনির্ভর সমাধানের খরচ বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক LNG দাম ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ কেনার নতুন প্রস্তাব
সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও নতুন প্রণোদনা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সরকার উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০.১৫ টাকা দরে কিনবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এ সুবিধা তিন বছর বহাল থাকবে এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগকারীরা প্রণোদনা পেতে পারেন।
সরকারের এই পরিকল্পনায় শুধু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বাসাবাড়ি, সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালকেও সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পেও শর্ত জুড়ে দিল সরকার
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের ওই এলাকার কয়লা মানসম্মত এবং তা উত্তোলন করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে। তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আগে স্থানীয় মানুষকে পুনর্বাসন এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এখানেই ফুলবাড়ী নিয়ে সরকারের অবস্থানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ কয়লা উত্তোলনের অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি কৃষিজমি, বসতবাড়ি, জীবিকা ও পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়ও বিবেচনায় রাখা হবে।
১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনার লক্ষ্য কোথায়
প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য ১০ বছরের একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে। কিছু গবেষণা ও মূল্যায়ন চলছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী শিগগিরই সংসদে পরিকল্পনাটি উপস্থাপন করবেন।
সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য হলো, জ্বালানি খাতকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা যাতে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ সম্ভব হয় এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যের সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
📊 পরিকল্পনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• সম্পন্ন কূপ: ৩০টি
• সম্পন্ন কূপ থেকে অতিরিক্ত গ্যাস: ১৪০ mmcfd
• আরও সাত কূপ থেকে সম্ভাব্য অতিরিক্ত গ্যাস: ৮৫ mmcfd
• 2D seismic survey: ৪,৫০০ কিমি
• 3D seismic survey: ৪,২০০ বর্গকিমি
• নতুন LNG আমদানির লক্ষ্য: ৬০০ mmcfd
• কুতুবজোম LNG টার্মিনাল সম্ভাব্য চালু: ডিসেম্বর ২০২৮
• ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রস্তাবিত ক্রয়মূল্য: ১০.১৫ টাকা/ইউনিট
🧭 ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বাস্তবায়ন
সরকারের পরিকল্পনায় একই সঙ্গে দেশীয় অনুসন্ধান, আমদানি অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য শক্তিকে রাখা হয়েছে। কিন্তু তিনটি ক্ষেত্রেই সময়, অর্থ এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষ করে শিল্পে গ্যাসের ঘাটতি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চ খরচ এবং আমদানিকৃত LNG-এর ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে নতুন কূপ থেকে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা এবং পরিকল্পিত অবকাঠামো সময়মতো বাস্তবায়ন করা জরুরি। এখন তাই ঘোষণার চেয়ে নজর থাকবে—এই পাঁচ দফা পরিকল্পনার কতটা কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়।
তথ্যসূত্র: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়/সংসদীয় বক্তব্য, BAPEX, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, The Daily Star, The Business Standard।




