Homeটুডে নেশনতনু হত্যা মামলায় দুই সাবেক সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ

তনু হত্যা মামলায় দুই সাবেক সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ

কুমিল্লার আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলমকে গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে তদন্ত সংস্থা; পলাতক থাকায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে

কুমিল্লার আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনাসদস্য মো. জাহিদুজ্জামান ও মো. শাহীন আলমের বিরুদ্ধে পৃথক রেড নোটিশ জারি করেছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। মঙ্গলবার তাঁদের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করা হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পুলিশ বলছে, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দুজনকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁরা পলাতক রয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র রেড নোটিশ জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, তনু হত্যাকাণ্ডের তদন্তের একপর্যায়ে জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলমের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁদের আর পাওয়া যায়নি। তাঁদের অবস্থান শনাক্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি), ঢাকা ইন্টারপোলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথিপত্র আন্তর্জাতিক সংস্থাটির কাছে পাঠায়।

ইন্টারপোলের নোটিশের পেছনে যে তদন্ত

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্তের বিভিন্ন ধাপে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মামলাটির পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলমের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের পর তাঁদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তনু হত্যাকাণ্ডের পর ফরেনসিক ও অন্যান্য আলামত পর্যালোচনার সময় দুই সাবেক সেনাসদস্যের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দেয়। তাঁদের নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাঁরা পরবর্তীতে আর তদন্তকারীদের নাগালের মধ্যে ছিলেন না। এরপরই তাঁদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদ্যোগ নেয় পিবিআই।

মামলায় এরই মধ্যে আরেক সাবেক সেনাসদস্য গ্রেপ্তার

তনু হত্যা মামলায় এরই মধ্যে সাবেক সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার এবং হত্যাকাণ্ডের সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।

পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, আদালতের নির্দেশের পর গত ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে তিনি ৪ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পান। ৬ আগস্ট আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত সেই জামিন স্থগিত করে তাঁকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। নির্ধারিত সময়ে আত্মসমর্পণ না করায় ৮ আগস্ট তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়।

দশ বছর পরও তনু হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয়নি

২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে যান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। পরে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছে একটি ঝোপের মধ্যে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়।

পরদিন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটির তদন্তে একাধিক সংস্থা যুক্ত হওয়ার পর বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

মামলার প্রথম দুই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দেওয়া হয়। এসব প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি তদন্তের নানা ধাপ অতিক্রম করলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

রেড নোটিশ মানেই আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়

ইন্টারপোলের রেড নোটিশকে অনেক সময় আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হিসেবে মনে করা হলেও বিষয়টি তা নয়। রেড নোটিশের মাধ্যমে সদস্যদেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করতে এবং নিজ নিজ আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানানো হয়।

কোনো দেশে তাঁদের অবস্থান শনাক্ত হলে সেখানে তাঁদের আটক বা গ্রেপ্তার করা হবে কি না, এবং এরপর বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ বা অন্য কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—তা সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব আইন ও প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভর করবে।

তদন্ত এখন কোন পর্যায়ে

পিবিআইয়ের তদন্তের পাশাপাশি ডিএনএসহ ফরেনসিক আলামত যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তদন্তকারীরা যেসব তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলমকে গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নই এখন মামলার পরবর্তী আইনি অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায়ে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তদন্তের তথ্যকে অভিযোগ ও তদন্তের অংশ হিসেবেই উপস্থাপন করতে হবে।

🔎 মামলার বর্তমান চিত্র

✅ দুই সাবেক সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে পৃথক রেড নোটিশ জারি হয়েছে।
✅ পিবিআই তাঁদের মামলার গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
✅ তাঁরা বর্তমানে পলাতক বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
✅ আরেক সাবেক সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
⚠️ রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়।
❓ মামলার চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

🧭 সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ

এখন নজর থাকবে দুই রেড নোটিশপ্রাপ্ত ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করা, তাঁদের আইনগতভাবে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করা এবং তদন্তে সংগ্রহ করা ফরেনসিক ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মামলাটিকে পরবর্তী আইনি ধাপে নিয়ে যাওয়ার দিকে।

দশ বছর আগে ঘটে যাওয়া তনু হত্যাকাণ্ডে নতুন করে আন্তর্জাতিক পুলিশি সহযোগিতা যুক্ত হওয়ায় মামলাটি আবারও জাতীয় আলোচনায় এসেছে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পুলিশ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ইন্টারপোল, The Business Standard, bdnews24.com।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments