বাজেট আলোচনায় বসুন্ধরার বিরুদ্ধে বক্তব্যের পর সমন্বিত নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধান
ঢাকা | জুলাই ২০২৬
জাতীয় সংসদে বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলার পর এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন পাঁচটি সংবাদমাধ্যমে চার দিনের মধ্যে ৯৯টি কনটেন্ট প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করেছে অনলাইন অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্ম দ্য ডিসেন্ট।
দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৮ জুন সকাল ৭টা ৪ মিনিট থেকে ১ জুলাই দুপুর ৩টা পর্যন্ত বসুন্ধরা গ্রুপের কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, নিউজ ২৪, ডেইলি সান এবং বাংলানিউজ২৪ ডটকমে এই কনটেন্টগুলো প্রকাশিত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই একই প্রতিবেদন, ভিডিও বা ফটোকার্ড একাধিক প্ল্যাটফর্মে প্রায় একই সময়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
দ্য ডিসেন্ট বলছে, সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহ বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা, সম্ভাব্য “আন্ডারটেবিল সমঝোতা” এবং গ্রুপটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলার পরপরই এই সমন্বিত প্রচারণা শুরু হয়।
সংসদে কী বলেছিলেন হাসনাত
২৫ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার অগ্রগতি স্পষ্ট নয় এবং এ নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, “যারা বসুন্ধরার বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের বিরুদ্ধে মিডিয়া লেলিয়ে দেওয়া হয়।”
তার বক্তব্যের পর থেকেই বসুন্ধরা-সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোতে ধারাবাহিকভাবে হাসনাতকে নিয়ে নেতিবাচক খবর, ভিডিও ও ফটোকার্ড প্রকাশিত হতে থাকে বলে দ্য ডিসেন্টের দাবি।
৯৯ কনটেন্টে কী ছিল
দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মোট ৯৯টি কনটেন্টের মধ্যে কালের কণ্ঠেই প্রকাশিত হয়েছে ৭৬টি। এর মধ্যে ছিল ৩৫টি ভিডিও, ১১টি সংবাদ প্রতিবেদন এবং ৩০টি ফটোকার্ড। ডেইলি সানে ছিল ৯টি, বাংলাদেশ প্রতিদিনে ৫টি, বাংলানিউজ২৪-এ ৫টি এবং নিউজ২৪-এ ৪টি কনটেন্ট।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ জুন একদিনেই প্রকাশিত হয় ৩৭টি কনটেন্ট। পরদিন ১৮টি, ৩০ জুন ২৭টি এবং ১ জুলাই দুপুর পর্যন্ত আরও ১৭টি কনটেন্ট প্রকাশিত হয়।
দ্য ডিসেন্টের ভাষ্য, এসব কনটেন্টের বড় অংশই স্বতন্ত্র নয়; বরং একই অভিযোগকে ভেঙে নানা শিরোনাম, ফরম্যাট ও প্ল্যাটফর্মে পুনঃপ্রচার করা হয়েছে।
ঘুরেফিরে একই অভিযোগ
দ্য ডিসেন্ট অন্তত নয়টি মূল কনটেন্ট চিহ্নিত করেছে, যেগুলো ভেঙে বাকি প্রচারণা গড়ে তোলা হয়েছে বলে তারা বলছে। এর মধ্যে রয়েছে হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ, ত্রাণের হিসাব, মসজিদ প্রকল্প, দুদকে চাঁদাবাজির অভিযোগ, মব রাজনীতি, এবং সহিংসতার সঙ্গে তাকে জড়িয়ে উপস্থাপন করা বক্তব্য।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব কনটেন্টে হাসনাতকে ঘিরে ঘুরেফিরে কয়েকটি একই ধরনের অভিযোগই তুলে ধরা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে একই বক্তব্যকে ইউটিউব, ফেসবুক, ওয়েবসাইট এবং ফটোকার্ডে আলাদা আলাদা কনটেন্ট হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।
দ্য ডিসেন্ট বলছে, এই প্রচারণায় বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়েছে রাশেদ খান, মো. তারেক রহমান এবং বিএনপি নেতা এম এ আউয়াল খানের বক্তব্য। শুধু এই তিন রাজনীতিবিদের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে মোট ৩৩টি কনটেন্ট প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
“শিকারি সাংবাদিকতা” বলছেন গবেষক
প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের সাময়িকী নিরীক্ষায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য ডিসেন্ট বলেছে, গণমাধ্যম গবেষক অধ্যাপক আ-আল মামুন এ ধরনের ধারাবাহিক, লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট কনটেন্টকে “শিকারি সাংবাদিকতা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
দ্য ডিসেন্টের সঙ্গে কথা বলে আ-আল মামুন বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে কোনো এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে এতগুলো কনটেন্ট প্রকাশ করা শিকারি সাংবাদিকতার মধ্যে পড়ে। তাঁর মতে, এ ধরনের সাংবাদিকতা প্রায়ই ক্ষমতাকেন্দ্র ও স্বার্থগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশে চালানো হয় এবং এতে সাংবাদিকতার নৈতিক মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রকল্প, ত্রাণ ও মব বিতর্ক
দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাসনাতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত কিছু কনটেন্টে উন্নয়ন প্রকল্প, ত্রাণ ব্যবস্থাপনা, মসজিদ নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ, এবং মব রাজনীতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে দ্য ডিসেন্ট বলছে, এসব অভিযোগের অনেকগুলোর সঙ্গেই প্রাসঙ্গিক নথির ব্যাখ্যা বা প্রেক্ষাপট মিলছে না। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেছে, কুমিল্লা জেলা পরিষদের বরাদ্দ নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়, তা ব্যক্তিগত অর্থ নয় বরং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ ছিল। একইভাবে ২০২৪ সালের বন্যার ত্রাণ তহবিল নিয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগকেও তারা আগের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি করেছে।
দ্য ডিসেন্ট আরও বলছে, যুক্তরাজ্যে হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে যে “মব” বিতর্ক তৈরি হয়েছে, প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে সে ঘটনায় ব্রিটিশ পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
বড় প্রশ্ন: সংবাদ নাকি প্রচারণা?
এই সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—রাজনৈতিক বক্তব্যের পর গণমাধ্যমের এমন ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া কি কাকতালীয়, নাকি সমন্বিত প্রচারণা?
দ্য ডিসেন্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন পাঁচটি প্ল্যাটফর্মে একই ধরনের কনটেন্টের এত দ্রুত ও ঘন ঘন পুনঃপ্রচার সাংবাদিকতার স্বাভাবিক প্রবাহের চেয়ে ভিন্ন।
তবে বসুন্ধরা গ্রুপ বা সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষ থেকে এই বিশ্লেষণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
উপসংহার
হাসনাত আবদুল্লাহ বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে সংসদে বক্তব্য দেওয়ার পরপরই তার বিরুদ্ধে ৮০ ঘণ্টায় ৯৯টি কনটেন্ট প্রকাশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দ্য ডিসেন্টের দাবি, এটি সমন্বিত নেতিবাচক প্রচারণার উদাহরণ। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, এসব কনটেন্টে বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য ও অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এটি কি শুধু সংবাদপ্রকাশ, নাকি একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে সংগঠিত মিডিয়া অভিযান?
যে উত্তরই হোক, এই বিতর্ক বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম, মালিকানা কাঠামো এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।



