Homeটুডে নেশনঢাকার গাড়ির মালিকদের জন্য নতুন বাস্তবতা: কী এই ‘যানজট শুল্ক’, কীভাবে কাজ...

ঢাকার গাড়ির মালিকদের জন্য নতুন বাস্তবতা: কী এই ‘যানজট শুল্ক’, কীভাবে কাজ করবে?

রাজধানীর যানজট কমাতে কনজেশন চার্জ চালুর প্রস্তাব; অতিরিক্ত কর নাকি নগর ব্যবস্থাপনার কার্যকর অস্ত্র—উঠছে নানা প্রশ্ন

ঢাকা | বিশেষ প্রতিবেদন

ঢাকার দীর্ঘস্থায়ী যানজট সমস্যা কমাতে নতুন একটি ধারণা সামনে এসেছে—‘কনজেশন চার্জ’ বা ‘যানজট শুল্ক’। সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (RSTP/URSTP) ২০২৫–২০৪৫–এর খসড়ায় রাজধানীর নির্দিষ্ট সড়ক ও করিডোরে চলাচলকারী কিছু যানবাহনের ওপর কিলোমিটারপ্রতি ৬ দশমিক ২৭ টাকা হারে শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।

খবর প্রকাশের পর অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি নতুন কোনো কর? গাড়ি বের করলেই কি টাকা কাটা হবে? এতে কি সত্যিই ঢাকার যানজট কমবে, নাকি সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি শুধু অর্থ আদায়ের নয়; বরং নগরের সড়ক ব্যবহারের ধরন বদলানোর একটি নীতি।

🔎 যানজট শুল্ক আসলে কী?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কোনো শহরের অতিরিক্ত ব্যস্ত বা যানজটপ্রবণ এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করলে অতিরিক্ত ফি দিতে হয়। এই ফিকেই বলা হয় Congestion Charge বা যানজট শুল্ক।

ধরা যাক—

একটি রাস্তা দিনে ২০ হাজার গাড়ি বহনের উপযোগী। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ৪০ হাজার গাড়ি চলছে। ফলে রাস্তাটি অতিরিক্ত চাপে পড়ে এবং যানজট সৃষ্টি হয়।

যানজট শুল্কের উদ্দেশ্য হলো—

যারা একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন, তাদের একটি অংশকে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া।

অর্থাৎ এটি মূলত “রাস্তার অতিরিক্ত ব্যবহার কমানোর মূল্য”।

⚙️ কীভাবে আদায় হবে?

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকায় এটি RFID (Radio Frequency Identification) প্রযুক্তির মাধ্যমে আদায় করা হতে পারে।

সম্ভাব্য প্রক্রিয়া:

✓ গাড়িতে একটি ডিজিটাল ট্যাগ থাকবে

✓ নির্দিষ্ট করিডোরে RFID রিডার বসানো হবে

✓ গাড়ি প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেম গাড়ি শনাক্ত করবে

✓ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত অর্থ কেটে নেওয়া হবে

✓ কোনো টোল বুথ বা আলাদা থামার প্রয়োজন হবে না

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এটি ডিজিটাল ওয়ালেট, মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে।

📊 কেন এমন প্রস্তাব?

ঢাকার যানজট পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনক।

বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী—

• ২০০৭ সালে ঢাকার যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার

• ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪.৮ কিলোমিটার

• প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে

• নগরের ৭৩টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নিয়মিত তীব্র যানজট তৈরি হয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কের পরিমাণ বাড়লেও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

একটি বাসে যেখানে ৪০–৫০ জন যাত্রী বহন করা যায়, সেখানে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে অনেক সময় মাত্র ১–২ জন যাত্রী থাকেন।

ফলে সড়ক দখলের তুলনায় যাত্রী পরিবহনের দক্ষতা কমে যাচ্ছে।

🌍 বিশ্বের কোথায় কোথায় এই পদ্ধতি চালু আছে?

যানজট শুল্ক কোনো নতুন ধারণা নয়। বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় শহরে এটি বহু বছর ধরে চালু রয়েছে।

🇬🇧 লন্ডন

২০০৩ সালে চালু হয়।

ফলাফল:

✓ শহরের কেন্দ্র এলাকায় যানবাহন কমেছে

✓ বাস ব্যবহারের হার বেড়েছে

✓ বায়ুদূষণ কমেছে

🇸🇬 সিঙ্গাপুর

বিশ্বে প্রথম দিকের শহরগুলোর একটি।

ফলাফল:

✓ যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয়েছে

✓ যানবাহনের গতি বেড়েছে

✓ রিয়েল-টাইম ডিজিটাল চার্জিং ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে

🇸🇪 স্টকহোম

শুরুতে জনগণের বিরোধিতা ছিল।

পরবর্তীতে—

✓ যানজট প্রায় ২০ শতাংশ কমে

✓ দূষণ কমে

✓ পরে গণভোটে জনগণ এটি সমর্থন দেয়

🇮🇹 মিলান

মূল লক্ষ্য ছিল দূষণ কমানো।

ফলাফল:

✓ ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমেছে

✓ পরিবেশগত উন্নতি হয়েছে

📈 তাহলে কি সত্যিই যানজট কমে?

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু শুল্ক আরোপ করলেই সমাধান আসে না।

এটি সফল হতে হলে কয়েকটি শর্ত প্রয়োজন:

১. ভালো গণপরিবহন

মেট্রোরেল, বিআরটি ও নির্ভরযোগ্য বাসব্যবস্থা থাকতে হবে।

২. বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থা

পার্কিং ব্যবস্থা, হাঁটার পথ ও সাইকেল অবকাঠামো প্রয়োজন।

৩. প্রযুক্তিগত সক্ষমতা

স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ অর্থ আদায় ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৪. জনসচেতনতা

মানুষকে বোঝাতে হবে এটি রাজস্ব বাড়ানোর প্রকল্প নয়।

🇧🇩 বাংলাদেশে কী হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়ন।

বর্তমানে—

✗ পর্যাপ্ত বাসসেবা নেই

✗ অনেক এলাকায় মেট্রোরেল পৌঁছায়নি

✗ ফুটপাত ও হাঁটার পরিবেশ দুর্বল

✗ ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প ব্যবস্থা সীমিত

এই অবস্থায় সরাসরি যানজট শুল্ক চালু করলে অনেকের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ পড়তে পারে।

💬 বিশেষজ্ঞদের মত

পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে—

“গণপরিবহন উন্নত না করে কেবল শুল্ক আরোপ করলে মানুষ সেটিকে নতুন কর হিসেবে দেখবে। কিন্তু কার্যকর গণপরিবহন নিশ্চিত করা গেলে এটি নগর ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে।”

⚖️ সুবিধা বনাম উদ্বেগ

সম্ভাব্য সুবিধা

✓ ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমতে পারে

✓ সড়কে যানবাহনের চাপ কমতে পারে

✓ গণপরিবহন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে

✓ বায়ুদূষণ ও জ্বালানি অপচয় কমতে পারে

✓ কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া কমতে পারে

সম্ভাব্য উদ্বেগ

✗ অতিরিক্ত ব্যয় বাড়তে পারে

✗ মধ্যবিত্ত গাড়ি ব্যবহারকারীরা বেশি চাপে পড়তে পারেন

✗ পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকলে জনঅসন্তোষ তৈরি হতে পারে

✗ প্রযুক্তিগত দুর্বলতায় বাস্তবায়ন জটিল হতে পারে

🔎 শেষ কথা

বিশ্বের বিভিন্ন শহরের অভিজ্ঞতা বলছে, যানজট শুল্ক নিজে কোনো জাদুকরি সমাধান নয়। এটি কার্যকর হয় তখনই, যখন উন্নত গণপরিবহন, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করা যায়।

ঢাকার ক্ষেত্রেও মূল প্রশ্ন এখন একটাই—মানুষের সামনে কি যথেষ্ট বিকল্প তৈরি হয়েছে, নাকি বিকল্পের আগেই শুল্কের আলোচনা শুরু হয়েছে?

তথ্যসূত্র: সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (URSTP/RSTP), বিশ্বব্যাংক, বুয়েট সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট, আন্তর্জাতিক নগর পরিবহন গবেষণা প্রতিবেদন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments