মিরপুরে ১ হাজারের বেশি বিদেশি প্রাণী উদ্ধারের পর প্রশ্ন উঠছে, শৌখিন পোষা প্রাণীর আড়ালে কীভাবে গড়ে উঠছে একটি অবৈধ সরবরাহচক্র
ঢাকা | ৫ জুলাই ২০২৬
ঢাকার মিরপুরের রূপনগর এলাকায় একটি আবাসিক ভবনের ছাদে গোপনে গড়ে তোলা অ্যাকুরিয়াম ও সংরক্ষণকক্ষ থেকে ১ হাজার ১০৪টি বিদেশি প্রাণী উদ্ধারের ঘটনা বাংলাদেশের পোষা প্রাণীর বাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। উদ্ধার করা প্রাণীর তালিকায় রয়েছে বিষাক্ত ট্যারান্টুলা মাকড়শা, ম্যাক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেক, কর্ন স্নেক, ডামফি ফ্রগ, লেপার্ড গ্যাকো, সাইডনেক কচ্ছপসহ নানা প্রজাতি।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাণীগুলোর অনেকগুলোই দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, আবার কিছু প্রজাতি মানবস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও স্থানীয় প্রাণিসম্পদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—কেন এসব প্রাণী বাংলাদেশে আসছে, কোথা থেকে আসছে, আর কীভাবেই বা বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে?
উদ্ধার, কিন্তু শুধু একটি ঠিকানা নয়
বাংলাদেশ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রূপনগরের ওই অভিযানে বিপুল সংখ্যক বিদেশি প্রাণী উদ্ধার হলেও সেখানে প্রায় ৬ হাজার প্রাণী ছিল বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ অভিযানের আগেই প্রায় ৫ হাজার প্রাণী বিক্রি হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এটি শুধু একটি একক ব্যবসায়ীর ঘটনা নয়, বরং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক অনিয়ন্ত্রিত বাজারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শৌখিন পোষা প্রাণীর চাহিদা, অনলাইন বেচাকেনা, বিমানবন্দর ও স্থলপথে নজরদারির দুর্বলতা—সব মিলিয়ে বিদেশি প্রাণীর একটি অবৈধ আমদানি-রপ্তানি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শৌখিনতার আড়ালে ঝুঁকির বাজার
বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আদনান আজাদের ভাষায়, বিষাক্ত ট্যারান্টুলা, ম্যাক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেক কিংবা আফ্রিকার ব্যাঙ এখন কিছু মানুষের কাছে শখের পোষা প্রাণী হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, অনুমতিপ্রাপ্ত কিছু প্রাণীর আড়ালে অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণী দেশে আনা হচ্ছে।
আদনান আজাদ আরও বলেন, বাংলাদেশকে শুধু গন্তব্য নয়, রুট হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। থাইল্যান্ড বা অন্য দেশ থেকে এসব প্রাণী এসে বাংলাদেশে ঢোকে, তারপর চোরাইপথে স্থলবন্দর হয়ে ভারতের দিকে চলে যায়।
এই বক্তব্যের পেছনে বড় প্রশ্ন হলো, কাদের মাধ্যমে এই সরবরাহচক্র চলছে, আর কীভাবে এত বিপুল সংখ্যক প্রাণী রাজধানীর আবাসিক এলাকার ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে গেল?
কেন এসব প্রাণী দেশে ঢুকছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি প্রাণী ঢোকার পেছনে অন্তত দুটি আলাদা প্রবণতা কাজ করছে। একটি হলো শৌখিন পালনের বাজার; অন্যটি ট্রানজিট রুট হিসেবে বাংলাদেশের ব্যবহার। শৌখিন পালকদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরল প্রজাতির প্রাণী দেখিয়ে আগ্রহ তৈরি করছে। এতে দামও বাড়ছে, চাহিদাও বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, বিদেশি প্রাণীর উপস্থিতিতে পরিবেশে কী প্রভাব পড়বে, বা সেসব প্রাণী থেকে কী রোগ ছড়াতে পারে, তা পর্যাপ্তভাবে যাচাই না হলে ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যায়।
তার মতে, অবৈধ ব্যবসা বিশ্বের সব দেশেই আছে, কিন্তু যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে গ্রেপ্তার করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইন আছে, কিন্তু ফাঁকও আছে
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, বন্যপ্রাণী অবৈধভাবে আমদানি, রপ্তানি, কেনাবেচা, সংরক্ষণ ও পরিবহন দণ্ডনীয় অপরাধ। বন্যপ্রাণী পরিদর্শক আব্দুল্লাহ-আস-সাদিক জানান, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
তবু কেন এই ব্যবসা থেমে নেই?
আদনান আজাদের অভিযোগ, বিমানবন্দরে স্বর্ণ বা অন্য পণ্যের মতো বিদেশি প্রাণীর ক্ষেত্রে নজরদারি যথেষ্ট শক্ত নয়। তাঁর মতে, ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটের আলাদা অফিস বা কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যেত।
অন্যদিকে বন বিভাগের দাবি, বিমানবন্দরসহ দেশের ভেতরে বিদেশি প্রাণীর অবৈধ লেনদেন ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখিয়েছে, নজরদারির ফাঁক এখনো রয়ে গেছে।
ফুড সাপ্লিমেন্ট নয়, জীববৈচিত্র্যের প্রশ্ন
ঢাকার রূপনগরের ঘটনাটি শুধু বাজার ও বাণিজ্যের নয়, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নও সামনে এনেছে। ট্যারান্টুলা, কিং স্নেক বা আফ্রিকান ব্যাঙের মতো প্রজাতি বাংলাদেশে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খায় কি না, তা যাচাই না করেই দেশে আনা হলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে, এসব প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও থাকে। কোয়ারেন্টাইন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং উৎস যাচাই ছাড়া কোনো প্রাণী আমদানি হলে তা শুধু বন্যপ্রাণী আইন ভাঙা নয়, জনস্বাস্থ্যের ওপরও অনিশ্চিত চাপ তৈরি করে।
অনলাইন বাজারের অদৃশ্য হাত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বাজার আর কেবল গোপন গুদাম বা পাচারকারীদের হাতে সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইন গ্রুপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, ব্যক্তিগত মেসেঞ্জার এবং হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে এখন বিদেশি প্রাণীর ক্রেতা-বিক্রেতার যোগাযোগ হয়। অনেক সময় প্রজাতির নাম, বয়স, রঙ, এমনকি আমদানি-নথির মতো ভুয়া কাগজও দেখানো হয়।
ফলে বৈধ ও অবৈধ প্রাণীর পার্থক্য সাধারণ ক্রেতার পক্ষে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগেই বাজার বড় হচ্ছে।
এখন কী করা দরকার
রূপনগরের এই উদ্ধার অভিযান দেখিয়েছে, শুধু অভিযান চালিয়ে থেমে থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। সীমান্ত, বিমানবন্দর, অনলাইন বেচাকেনা এবং স্থানীয় খুচরা বাজার—সব জায়গায় সমন্বিত নজরদারি না বাড়ালে একই ধরনের চক্র আবারও সক্রিয় হতে পারে।
এখানে সবচেয়ে জরুরি হলো আমদানি নথিপত্র যাচাই, কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করা, অনলাইন বিক্রেতাদের শনাক্ত করা এবং চোরাচালানের রুটগুলো চিহ্নিত করা। নইলে রূপনগরের ঘটনাটি আরেকটি অভিযানে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, কিন্তু বাজার থামবে না।
শেষ প্রশ্ন
ঢাকার একটি আবাসিক ভবনের ছাদে ১ হাজারের বেশি বিদেশি প্রাণী কীভাবে জমা হলো—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একজন ব্যবসায়ীর কাছে নয়, পুরো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কাছেও চাওয়া উচিত।
কারণ সমস্যাটি কেবল সাপ, মাকড়শা বা ব্যাঙের নয়; সমস্যাটি হলো, অবৈধ বাজারটি এতদিন ধরে কীভাবে নিরাপদে টিকে রইল।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ বন বিভাগ, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট, বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ।



