হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ৫১ হাজার ছাড়িয়েছে; গত এক দশকে বিশ্বের মাত্র চারটি দেশের পর পঞ্চম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই অনাকাঙ্ক্ষিত তালিকায় নাম লেখালো।
ঢাকা | ১৪ মে ২০২৬
বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামের ‘সন্দেহজনক’ রোগীর সংখ্যা ৫১ হাজার ৫৬৭ জন ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ৭ হাজার ২৪ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। সব মিলিয়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৪২৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা গত দেড় দশকে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত আড়াই দশকে দেশে কখনো এক বছরে হামের সংক্রমণ ৫০ হাজার অতিক্রম করেনি। এর আগে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৯৩৪ জন রোগী পাওয়া গিয়েছিল। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালে এসে এই পরিস্থিতির অবনতি জনস্বাস্থ্য খাতকে গভীর সংকটে ফেলেছে।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশকে বিশ্বের মাত্র চারটি দেশে এক বছরে হামের রোগী ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। সেই দেশগুলো হলো:
- মাদাগাস্কার: ২০১৯ সালে ২ লাখ ১৩ হাজারের বেশি আক্রান্ত।
- কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র: ২০১৯ সালে ৩ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি আক্রান্ত (যুদ্ধ ও টিকা সংকটের কারণে)।
- ইউক্রেন: ২০১৮ ও ২০১৯ সালে।
- ভারত: ২০২৩ সালে ৬৫ হাজার ১৫০ জন আক্রান্ত।
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের পঞ্চম দেশ হিসেবে এই সংক্রমণের ভয়াবহ তালিকায় যুক্ত হলো।

সংক্রমণের কারণ ও সরকারি ব্যর্থতার অভিযোগ
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, এবারের ভয়াবহ সংক্রমণের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দায়ী:
- টিকা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সময়মতো টিকা কিনতে না পারা এবং মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রমের স্থবিরতা।
- পুষ্টির অভাব: শিশুদের মধ্যে তীব্র পুষ্টিহীনতা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।
- মহামারি ঘোষণায় অনীহা: জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদের মতে, সরকার এটাকে মহামারি বা ‘স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করতে দ্বিধা করছে, যা চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ ও ন্যাশনাল গাইডলাইন প্রণয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভ
হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সরকারের অবহেলার প্রতিবাদে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে বিক্ষোভ করেছে। সিপিবির অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার জনস্বাস্থ্যের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিল। ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা না কিনে ‘কমিশন’ পাওয়ার লোভে বেসরকারি খাতের দিকে ঝুঁকে পড়ার অভিযোগও উঠেছে রাজনৈতিক মহলে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও বর্তমান পদক্ষেপ
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আজ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান:
- অগ্রাধিকার: দোষী ব্যক্তি নির্ধারণের চেয়ে শিশুদের জীবন বাঁচানোকেই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
- তদন্ত: সংকট কাটার পর টিকা ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্ত করা হবে।
- সরবরাহ: চীন থেকে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ডোজ ভ্যাকসিন এসেছে এবং অ্যান্টি-র্যাবিসসহ অন্যান্য নিয়মিত টিকা কার্যক্রম চালু আছে।
- চিকিৎসা: আক্রান্ত শিশুদের জন্য আইসোলেশন, আইসিইউ এবং অতিরিক্ত ভেন্টিলেটর নিশ্চিত করা হয়েছে।
📊 এক নজরে পরিসংখ্যান (১৩ মে ২০২৬ পর্যন্ত)
- সন্দেহজনক রোগী: ৫১,৫৬৭ জন।
- নিশ্চিত হাম রোগী: ৭,০২৪ জন।
- মোট মৃত্যু: ৪২৫ জন।
- সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু: ৯ জন।
🔎 বিশেষজ্ঞ মতামত
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, হাম হওয়ার পর শিশুদের নিউমোনিয়া হওয়াটা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই মুহূর্তে প্রতিটি শিশুকে ইপিআই (EPI) কার্যক্রমের আওতায় আনা এবং দুর্গম অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল ও টিকা পৌঁছানো জরুরি।
তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)।



