Homeটুডে বাংলাআব্দুল হাই: মুক্তিযোদ্ধা থেকে পাঁচবারের সংসদ সদস্য, মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে পাঁচ দশকের পথচলা

আব্দুল হাই: মুক্তিযোদ্ধা থেকে পাঁচবারের সংসদ সদস্য, মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে পাঁচ দশকের পথচলা

উপমন্ত্রী ও সংসদের প্যানেল স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন; বিএনপির জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে দীর্ঘদিন, নির্বাচনী সংঘাতের মুখেও সক্রিয় ছিলেন এই প্রবীণ রাজনীতিক

মুন্সীগঞ্জ | TODAY TV BD | বিশেষ প্রতিবেদন

মুন্সীগঞ্জের প্রবীণ রাজনীতিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. আব্দুল হাই মারা গেছেন। ১৪ অক্টোবর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। পাঁচবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই রাজনীতিক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের প্যানেল স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিস্তৃত ছিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে জাতীয় পর্যায়ের দলীয় নেতৃত্ব পর্যন্ত।

হোসেন্দী গ্রামে জন্ম, হরগঙ্গা কলেজে পড়াশোনা

আব্দুল হাই ১৯৪৯ সালের ৫ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মনির উদ্দিন ছিলেন ব্যবসায়ী। মুন্সীগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে আগ্রহী ছিলেন আব্দুল হাই। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনে যুক্ত হয় মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়। স্বাধীনতার পর স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। ১৯৭৩ সালে পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর পথচলা শুরু হয়। স্থানীয় পর্যায়ে এই দায়িত্ব পালনের পাঁচ বছর পর ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন তিনি।

১৯৭৯ সালে প্রথম সংসদ সদস্য

বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পরের বছর, ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আব্দুল হাই। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, একই বছরের ১২ জুন এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জয়ী হন। সব মিলিয়ে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পরবর্তী নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণের আগে ও পরে মুন্সীগঞ্জের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এই রাজনীতিক। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। ফলে ওই দুই নির্বাচনে আব্দুল হাইও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। ১৯৯১ সালে সংসদে ফিরে আসার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বিএনপির সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান শক্ত হয় এবং দলীয় নেতৃত্বে তাঁর দায়িত্ব বাড়তে থাকে।

উপমন্ত্রী ও প্যানেল স্পিকারের দায়িত্ব

১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে আব্দুল হাই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী নিযুক্ত হন। স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, গ্রামীণ উন্নয়ন ও সমবায় খাতের দায়িত্বে থাকা এই মন্ত্রণালয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে প্যানেল স্পিকার নির্বাচিত হন তিনি। দলীয় রাজনীতিতে আব্দুল হাই দীর্ঘদিন মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ, সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টাও ছিলেন তিনি। ২০২১ সালে তাঁকে মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়। পরবর্তী সময়ে নতুন জেলা কমিটি গঠিত হলে তাঁর আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক দায়িত্বের অবসান ঘটে।

নির্বাচনী বিরোধ, হামলার অভিযোগ ও আন্দোলন

আব্দুল হাইয়ের রাজনৈতিক পথচলায় নির্বাচনী বিরোধ ও সংঘাতও ছিল। ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় ভোটগ্রহণ চলাকালে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেওয়া, জাল ভোট ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে আব্দুল হাই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। অনিয়মের প্রতিবাদে সদর উপজেলায় হরতালের ঘোষণাও আসে তাঁর পক্ষ থেকে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মুন্সীগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণার সময় হামলার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় আব্দুল হাইসহ দলটির অন্তত ১০ জন আহত হয়েছিলেন বলে সে সময় সংবাদ প্রকাশিত হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলেও হামলাকারীদের পরিচয় নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে ভিন্নতা ছিল। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার সময়ও মুন্সীগঞ্জে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। আব্দুল হাই এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দায়ী করেছিলেন। পুলিশ ঘটনাটিতে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছিল। এসব ঘটনার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক সংঘাত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে ওঠে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কারাবাস বা নির্দিষ্ট কোনো নির্যাতনের ঘটনার বিষয়ে যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই তাঁকে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা হয়েছিল বা নির্দিষ্ট কোনো ঘটনায় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন—এমন দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উল্লেখ করার সুযোগ নেই।

‘আল্লাহ, তোমার কাছে বিচার দিলাম’—আলোচিত বক্তব্য

২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচন বর্জনের সময় আব্দুল হাইয়ের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম ও এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি নির্বাচনের ফল ও ঘটনার বিচার আল্লাহর কাছে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। বক্তব্যের শেষাংশে তাঁর ‘আল্লাহ, তোমার কাছে বিচার দিলাম’ কথাটি রাজনৈতিক আলোচনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন আলোচিত হয়। বিএনপির সমর্থকেরা বক্তব্যটিকে নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেটি নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপও চলে। ঘটনাটি তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতির পাশাপাশি তাঁকে ঘিরে জনপরিসরের বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।

মুন্সীগঞ্জে তাঁর রাজনৈতিক ও উন্নয়ন ভূমিকা

মুন্সীগঞ্জে আব্দুল হাইয়ের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের ভিত্তি ছিল স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্ব ও দলীয় সংগঠন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে যাত্রা শুরু করে পাঁচবার সংসদ সদস্য হওয়া এবং দীর্ঘদিন জেলা বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়া—এই ধারাবাহিকতায় জেলার রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান গড়ে ওঠে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের দলীয় কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয়তা তাঁকে মুন্সীগঞ্জের পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। তবে তাঁর উদ্যোগে বাস্তবায়িত সড়ক, সেতু, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা অন্য উন্নয়ন প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ ও যাচাইযোগ্য তালিকা প্রকাশ্যে নেই। উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকার প্রমাণ হলেও নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের কৃতিত্ব তাঁর নামে তুলে ধরতে হলে সরকারি বরাদ্দ, প্রকল্পের নথি ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন। এ কারণে তাঁর উন্নয়ন-অবদানের মূল্যায়নে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক তথ্য যাচাই জরুরি।

পরিবার ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

আব্দুল হাইয়ের স্ত্রী জামিলা খাতুন। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে ইফতেখারুল আলম রিপন স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর পক্ষে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়েছিল। ছোট ছেলে ইকরামুল আলম মাসুম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। দুই মেয়ের পেশাগত পরিচয় সম্পর্কে প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। আব্দুল হাইয়ের ছোট ভাই মহিউদ্দিন আহমেদও মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালে ঘোষিত জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিতে তিনি সদস্যসচিব হন। ফলে পরিবারটির রাজনৈতিক উপস্থিতি আব্দুল হাইয়ের নিজস্ব কর্মকাণ্ডের বাইরেও জেলার রাজনীতিতে ছিল।

অসুস্থতা ও রাজনীতি থেকে সরে যাওয়া

২০২২ সালের ৯ জুলাই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর আব্দুল হাই বাইপাস সার্জারির জন্য থাইল্যান্ডে যান। সেখানে তাঁর ব্রেইন স্ট্রোক হয়। এরপর স্ট্রোকজনিত জটিলতা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগতে থাকেন তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর অংশগ্রহণ কমে যায় এবং জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি সক্রিয় রাজনীতির বাইরে ছিলেন। ২০২৫ সালে মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণার পর দলীয় নেতৃত্বে তাঁর আনুষ্ঠানিক ভূমিকা আর ছিল না। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর দিবাগত রাতে ঢাকার ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। ১৫ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এবং মুন্সীগঞ্জ শহরে জানাজা হয়। শেষ জানাজার পর তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। আব্দুল হাইয়ের রাজনৈতিক জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্ব থেকে জাতীয় সংসদে পৌঁছানো, বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় থাকা এবং মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে তাঁর স্থায়ী উপস্থিতি। নির্বাচনী সংঘাত ও বিতর্ক তাঁর রাজনৈতিক পথচলার অংশ হলেও তাঁর দীর্ঘ জনজীবনের মূল্যায়নে সংসদীয় ভূমিকা, দলীয় নেতৃত্ব এবং এলাকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কই থাকবে প্রধান বিবেচ্য।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, এনটিভি, প্রথম আলো, আজকের পত্রিকা, যমুনা টিভি, ঢাকা টাইমস, যুগান্তর, জাগো নিউজ২৪।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments