প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার শিঙাড়া বিক্রি, দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন ক্রেতা; টাঙ্গাইলের বকুলতলা মোড় এখন অনেকের কাছে ‘শিঙাড়ার মোড়’
টাঙ্গাইল | বিশেষ প্রতিবেদন
দুপুর গড়াতেই টাঙ্গাইল-আরিচা সড়কের বকুলতলা মোড়ে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। সড়কে চলতে থাকা একের পর এক যানবাহন থামে। যাত্রীরা নেমে ভিড় করেন একটি ছোট দোকানের সামনে। কারও হাতে পাঁচটি, কারও হাতে ১০টি শিঙাড়ার প্যাকেট। আবার কেউ দোকানের সামনেই দাঁড়িয়ে গরম গরম শিঙাড়া খাওয়া শুরু করেন। শিঙাড়ার এই চাহিদাই বদলে দিয়েছে জায়গাটির পরিচয়। স্থানীয়দের কাছে বকুলতলা মোড় এখন অনেকটাই পরিচিত ‘শিঙাড়ার মোড়’ নামে।
টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দক্ষিণে বকুলতলা মোড়ে মতিউর রহমানের এই দোকান। আকারে খুব বড় নয়, কিন্তু শিঙাড়ার স্বাদের কারণে প্রতিদিনই এখানে তৈরি হয় ক্রেতার ভিড়। আশপাশের এলাকা তো বটেই, দূরদূরান্ত থেকেও অনেকে এই দোকানের শিঙাড়া কিনতে আসেন। পথে যাওয়া-আসার সময় অনেকে পরিবারের জন্যও নিয়ে যান।
মনিহারি দোকান থেকে শিঙাড়ার ব্যবসা
মতিউর রহমানের দোকানের পেছনেই তাঁর বাড়ি। একসময় সেখানে ছোট একটি মনিহারি দোকান চালাতেন তাঁর বাবা। প্রায় ২৫ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর বাবার সেই দোকানের দায়িত্ব নেন মতিউর। কয়েক বছর পর মনিহারি ব্যবসার পাশাপাশি চা, শিঙাড়া, পুরি ও পেঁয়াজু বিক্রি শুরু করেন তিনি।
এভাবে পাঁচ থেকে সাত বছর নানা ধরনের খাবার বিক্রির পর ধীরে ধীরে তাঁর তৈরি শিঙাড়ার সুনাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে আশপাশের এলাকায়। বাড়তে থাকে ক্রেতার চাহিদা। একসময় দেখা গেল, অন্য সব পণ্যের চেয়ে শিঙাড়ার বিক্রিই বেশি। তখন চা, পুরি ও পেঁয়াজু বাদ দিয়ে কয়েক বছর ধরে তিনি শুধু শিঙাড়াই বিক্রি করছেন।
মতিউর জানান, প্রতিদিন তাঁর দোকানে ৮০০ থেকে ১ হাজার শিঙাড়া বিক্রি হয়। প্রতিটি শিঙাড়ার দাম ১০ টাকা। এই ছোট ব্যবসার আয় দিয়েই চলে তাঁর আট সদস্যের পরিবার।
দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চলে ব্যস্ততা
শিঙাড়া তৈরির কাজ শুরু হয় বাড়িতেই। সকালে আলু কেটে রান্না করেন মতিউর। এরপর ময়দা মাখানোসহ অন্যান্য প্রস্তুতি নেন। এসব কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন তাঁর স্ত্রী। দুপুরের পর দুই ছেলে নীরব হাসান ও রিফাত হাসানকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় দোকানের কাজ।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বড় কড়াইয়ে ডুবো তেলে শিঙাড়া ভাজছেন মতিউর রহমান। পাশে বসে তাঁর দুই ছেলে শিঙাড়া তৈরি করছেন। দোকানের সামনে তখন কয়েকজন ক্রেতা অপেক্ষা করছেন। একপর্যায়ে ভাজা শেষ হলে কড়াই থেকে একসঙ্গে ৩০ থেকে ৩৫টি শিঙাড়া তুলে নেওয়া হয়। কেউ পাঁচটি, কেউ ১০টি করে কিনে চলে যাচ্ছেন। কয়েকজন আবার দোকানের কাছেই দাঁড়িয়ে গরম শিঙাড়া খাওয়া শুরু করেন।
একদিকে পুরোনো শিঙাড়া শেষ হচ্ছে, অন্যদিকে আবার নতুন করে কড়াইতে দেওয়া হচ্ছে। এভাবেই নতুন ক্রেতারা এসে অপেক্ষা করছেন, আর দোকানের ব্যস্ততা চলতে থাকে দুপুর থেকে রাত ৮টা, কখনো ৯টা পর্যন্ত।
বাবার পাশে দুই ছেলে
মতিউরের দুই ছেলে নীরব হাসান ও রিফাত হাসানও এখন বাবার ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁরা বলেন, তাঁদের বাবার শিঙাড়ার সুনাম ছড়িয়ে পড়ার পর বিক্রি অনেক বেড়ে যায়। ফলে দোকানের কাজে বাবাকে সহযোগিতা করতে শুরু করেন তাঁরা। শিঙাড়া তৈরির কাজ এখন তাঁরাও ভালোভাবেই পারেন।
একটি ছোট দোকান থেকে শুরু হওয়া এই ব্যবসা তাই এখন এক পরিবারের যৌথ পরিশ্রমের গল্পও হয়ে উঠেছে। বাবা তৈরি করেন, ছেলেরা পাশে থাকেন, আর ক্রেতাদের চাহিদা সেই শ্রমকে প্রতিদিন নতুন করে এগিয়ে নেয়।
কেন এত জনপ্রিয় এই শিঙাড়া?
মতিউরের শিঙাড়ার বিশেষত্ব জানতে চাইলে তিনি খুব সহজভাবেই বলেন, তাঁর পরিবার যত্ন করে শিঙাড়া তৈরি করে। ভাজার তেলও দুই-এক দিন পরপর বদলানো হয়। তাঁর মতে, এসব কারণেই অন্য শিঙাড়ার তুলনায় তাঁর তৈরি শিঙাড়ার স্বাদ কিছুটা আলাদা।
তবে ব্যবসার সাফল্যের পেছনে শুধু নিজের চেষ্টা দেখেন না মতিউর। তাঁর বিশ্বাস, এর সঙ্গে আছে ওপরওয়ালার রহমতও।
মতিউর রহমান বলেন, “দুই-এক দিন পরপর ভাজার তেল পাল্টাই। পরিবারের সবাই মিলে যত্ন করে শিঙাড়া তৈরি করি। তাই অন্য শিঙাড়া থেকে এর স্বাদ একটু বেশি। আর এ ছাড়া ওপরওয়ালার একটা রহমত আছে আমাদের ওপর। তাই হয়তো আমার শিঙাড়া খেতে অনেক দূর থেকে মানুষ চলে আসেন।”
ক্রেতাদের মুখে আলাদা স্বাদের প্রশংসা
শিঙাড়ার টান কতটা, তা বোঝা যায় ক্রেতাদের কথাতেও। টাঙ্গাইল শহরের কচুয়াডাঙ্গা থেকে আসা আনোয়ার হোসেন বলেন, এই শিঙাড়ার স্বাদ অন্যরকম। তাই শুধু শিঙাড়া খাওয়ার জন্যও তিনি এখানে চলে আসেন।
নাগরপুরের ঘুনিসিংজোড়া গ্রামের সোহান হোসেন জানান, এই পথে যাতায়াতের সময় তিনি নিয়মিত শিঙাড়া নিয়ে যান। বাড়ির সবাই এই শিঙাড়া পছন্দ করেন বলেই তাঁর এমন অভ্যাস তৈরি হয়েছে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি শফিকুল ইসলামও বলেন, এই দোকানের শিঙাড়ার স্বাদ আলাদা। তাই এ পথে চলাচলের সময় তিনি এখানে থেমে শিঙাড়া খেয়ে যান।
‘বকুলতলার মোড়’ থেকে ‘শিঙাড়ার মোড়’
দোকানের এই জনপ্রিয়তা শুধু মতিউরের ব্যবসাই বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে পুরো এলাকার পরিচিতিও। বকুলতলা বাজারের ব্যবসায়ী জোসন আলী বলেন, মতিউরের শিঙাড়ার নাম এখন অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। শহর থেকেও মানুষ শিঙাড়া কিনতে এখানে আসেন। দূরপাল্লার বা স্থানীয় যানবাহনও অনেক সময় দোকানের সামনে থামে, যাত্রীরা নেমে শিঙাড়া কিনে আবার গন্তব্যের পথে রওনা হন।
এ কারণেই স্থানীয় মানুষের মুখে বকুলতলা মোড়ের আরেক নাম হয়ে গেছে ‘শিঙাড়ার মোড়’।
একটি দশ টাকার খাবার কীভাবে একটি জায়গার পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে, মতিউর রহমানের দোকান যেন তারই ছোট্ট উদাহরণ। এখানে কোনো বড় রেস্তোরাঁ নেই, নেই ঝলমলে সাজসজ্জা। আছে ময়দা, আলু, তেল, একটি কড়াই, পরিবারের কয়েকজন মানুষের পরিশ্রম এবং বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া ক্রেতার আস্থা।
স্বাদের সঙ্গে তৈরি হয়েছে জীবনের গল্প
মতিউরের গল্প শুধু শিঙাড়া বিক্রির গল্প নয়। বাবার ছোট মনিহারি দোকান থেকে শুরু করে আজকের ব্যস্ত শিঙাড়ার ব্যবসা—এই পথ পাড়ি দিতে লেগেছে প্রায় দুই যুগের বেশি সময়। একসময় যে দোকানে নানা পণ্য বিক্রি হতো, আজ সেখানে একমাত্র শিঙাড়াই প্রধান পণ্য। সেই শিঙাড়াই এখন তাঁর পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
প্রতিদিনের ৮০০ থেকে ১ হাজার শিঙাড়া বিক্রির হিসাব হয়তো বড় কোনো ব্যবসার কাছে খুব ছোট। কিন্তু একটি পরিবারের জীবনে সেই প্রতিটি শিঙাড়া একেকটি আয়, একেকটি দিনের খরচ এবং আগামী দিনের আশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আর বকুলতলার মানুষের কাছে এই গল্পের আরেকটি দিকও আছে। একটি সাধারণ খাবারও কখনো কখনো একটি জায়গাকে আলাদা পরিচয় দিতে পারে। একটি ছোট দোকানও হয়ে উঠতে পারে পথের মানুষের পরিচিত ঠিকানা। আর একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর দীর্ঘদিনের পরিশ্রমই তৈরি করতে পারে এমন এক জনপ্রিয়তা, যার কারণে মানুষ পথ থামিয়ে ফিরে তাকায়।
বকুলতলা মোড়ে তাই এখন শুধু যানবাহন থামে না; থামে মানুষের ক্ষুধা, কৌতূহল আর পরিচিত স্বাদের টানও। দশ টাকার একটি শিঙাড়া ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে একটি মোড়ের পরিচয়, একটি পরিবারের জীবিকার অবলম্বন এবং স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া এক স্বাদের গল্প।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো—টাঙ্গাইলের বকুলতলা মোড়ে মতিউর রহমানের শিঙাড়ার দোকান নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সরেজমিন তথ্য।




