ডিজেল ১৩৫, পেট্রোল ১৬০, অকটেন ১৬৫ ও কেরোসিন ১৫৫ টাকা; একদিনেই বাসভাড়ায় বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ
দেশে আবারও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন—প্রতিটি পণ্যের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দামে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের পরপরই গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, পরিবহন ও জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বড় লোকসানের কারণে এই সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের চাপের পাশাপাশি ভর্তুকির বোঝা কমানোও সিদ্ধান্তটির একটি কারণ। তার দেওয়া হিসাবে, ডিজেলে প্রতি লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছিল এবং শুধু ডিজেলেই দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা হতে পারে। নতুন মূল্য সমন্বয়ের ফলে বার্ষিক লোকসান প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।
পাম্পের পরেই পরিবহনে বাড়তি ভাড়া
দাম বাড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকার বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। দূরপাল্লার কিছু রুটেও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেওয়ার কথা উঠে এসেছে। তবে সোমবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকার নতুন ভাড়া অনুমোদন না দেওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া উচিত নয়।
এরই মধ্যে বিআরটিএ জ্বালানির বাড়তি দামের প্রভাব বিবেচনায় নতুন ভাড়া প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবে আন্তজেলা ও দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪৩ পয়সা করার কথা বলা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৭৩ পয়সা এবং ডিটিসিএ এলাকার মিনিবাসে ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫২ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ভাড়া সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর হবে না।
বাজারে এর প্রভাব কতটা পড়বে
জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ডিজেলনির্ভর ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনের ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল পরিবহনেও খরচ বাড়তে পারে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন দাম কৃষকের সেচ, কারখানার জেনারেটর, পণ্য পরিবহন এবং শিল্পের লজিস্টিক ব্যয়ে চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতও এই বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে পড়ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের মধ্যেই নতুন মূল্যবৃদ্ধি রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়াচ্ছে। অনেক কারখানা ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন কমিয়েছে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্যে মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপের কথা এসেছে। তাদের মতে, পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়লে চাল, সবজি, মাছ, ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে ধীরে ধীরে প্রভাব পড়তে পারে। তবে সরকারি পর্যায় থেকে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির পর এখন নজর কোথায়
নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সরকারি অনুমোদন ছাড়া বাড়তি বাসভাড়া আদায় বন্ধ করা, নিত্যপণ্যের বাজারে নজরদারি এবং জ্বালানি খাতে ভর্তুকির প্রকৃত আর্থিক চাপ সামলানো। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে এলে দেশের বাজারে সেই পরিবর্তন কীভাবে প্রতিফলিত হবে, সেটিও সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি বক্তব্য; রয়টার্স; বিডিনিউজ২৪; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড; প্রথম আলো; আজকের পত্রিকা।




