ইলিশের সংকটে ক্রেতার ভরসা বড় পাঙাশ; জেলেদের আয় বাড়লেও ছোট মাছ নিধনে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
TODAY TV BD | বিশেষ প্রতিনিধি | চাঁদপুর
একসময় যেখানে পদ্মা-মেঘনার রুপালি ইলিশের ঝলক দেখতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতা, পাইকার ও পর্যটকদের ভিড় জমত, সেই চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী বড় স্টেশন মাছঘাটে এখন ভিন্ন দৃশ্য। ইলিশের ঘাট হিসেবে পরিচিত এই বাজারে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে বিশাল আকৃতির নদীর পাঙাশ। ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এখন এই পাঙাশই অনেক ক্রেতার প্রধান পছন্দ হয়ে উঠেছে।
ঘাটসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক দিন ধরে পদ্মা-মেঘনা নদীতে জেলেদের জালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বড় আকারের পাঙাশ ধরা পড়ছে। প্রতিদিন একশ থেকে দেড়শটি বড় পাঙাশ মাছ এই ঘাটে কেনাবেচা হচ্ছে। ফলে ইলিশের বাজারে তৈরি হওয়া ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করছে নদীর এই পাঙাশ।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকেই মাছভর্তি ট্রলার ঘাটে ভিড়ছে। আড়তগুলোতে বরফের ওপর সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে ৮ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত ওজনের পাঙাশ। পাইকারদের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতারাও এসব মাছ কিনতে ভিড় করছেন। অনেকেই জানান, একটি বড় ইলিশের যে দাম, প্রায় একই দামে মিলছে একটি বড় নদীর পাঙাশ। ফলে পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে অনেকে ইলিশের পরিবর্তে পাঙাশ কিনছেন।
ঘাটের বড় আড়তদার মো. হাসান বলেন, “কয়েক দিন ধরেই ইলিশের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করছে নদীর পাঙাশ। কারণ, নদীতে জেলেদের জালে এখন বড় বড় পাঙাশ ধরা পড়ছে। প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাছ ঘাটে আসছে এবং দ্রুত বিক্রিও হচ্ছে।”
মাছ ব্যবসায়ী নবীর হোসেন বলেন, “ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় ব্যবসায়ীরা কিছুটা সংকটে ছিলেন। এখন নদীর পাঙাশই আমাদের ব্যবসাকে সচল রেখেছে। ক্রেতারাও আগ্রহ নিয়ে এসব মাছ কিনছেন।”
প্রবীণ মাছ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনের মতে, পদ্মা-মেঘনায় বর্তমানে বড় পাঙাশের উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক হলেও এর সঙ্গে একটি উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “শুধু বড় পাঙাশ নয়, জেলেদের জালে অনেক ছোট পাঙাশও ধরা পড়ছে। এভাবে ছোট মাছ ধরা চলতে থাকলে কয়েক বছর পর নদীতে বড় পাঙাশের সংকটও দেখা দিতে পারে। ইলিশের মতো পাঙাশের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাট দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম বৃহৎ ইলিশ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বাজারের চিত্র বদলে যেতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে প্রতিদিন যে পরিমাণ ইলিশ বাজারে আসছে, তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এর ফলে ইলিশের দামও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। (Dhaka Tribune)
মৎস্য খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নদীতে মাছের প্রজাতিগত ভারসাম্য রক্ষা এবং টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মাছ আহরণ নয়, ছোট মাছ সংরক্ষণও অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে পাঙাশের পোনা ও ছোট আকারের মাছ নির্বিচারে ধরা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই প্রজাতির উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আশা, মৌসুমি বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি এবং নদীর অনুকূল পরিবেশ ফিরে এলে ইলিশের সরবরাহ আবারও বাড়বে। তবে একই সঙ্গে তাঁরা নদীর অন্যান্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছ সংরক্ষণেও কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
TODAY TV BD বিশ্লেষণ: চাঁদপুরের বড় স্টেশন মাছঘাটের বর্তমান চিত্র শুধু একটি বাজারের পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি নদীর জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রাপ্যতা এবং বাজার অর্থনীতির পরিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি। ইলিশের ঘাটে আজ পাঙাশের আধিপত্য হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের, কিন্তু ছোট মাছ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই প্রাচুর্যও অতীত হয়ে যেতে পারে।
সূত্র: স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাট সরেজমিন তথ্য, ঢাকা ট্রিবিউন, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। (Dhaka Tribune)



