Homeটুডে বাংলাখুলনায় ৫ দিনে তিনটি গুলির ঘটনা: আতঙ্কের ছক, আইনশৃঙ্খলার চাপ ও অজানা...

খুলনায় ৫ দিনে তিনটি গুলির ঘটনা: আতঙ্কের ছক, আইনশৃঙ্খলার চাপ ও অজানা হামলাকারীদের ছায়া

রূপসার কিশোরী থেকে শ্রমজীবী তরুণ—একই শহরে বারবার গুলির ঘটনা, কিন্তু থামছে না আতঙ্ক

খুলনা | বিশেষ প্রতিবেদন

খুলনায় একের পর এক গুলিবর্ষণের ঘটনা এখন শুধু অপরাধ নয়, একটি ক্রমবর্ধমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। রূপসা বেড়িবাঁধ এলাকায় কিশোরী ইতি, লবণচরায় যুবক রাতুল শেখ এবং গল্লামারীতে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম মানিক—মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে এই তিনটি গুলির ঘটনা খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

শুক্রবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে রূপসা বেড়িবাঁধ রোডের নিজ বাড়ির সামনে গুলিবিদ্ধ হন ১০ম শ্রেণির ছাত্রী ইতি। পুলিশ বলছে, মোটরসাইকেলে আসা তিনজন দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলিটি তার বাঁ পায়ে লাগে। পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। গুলির কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

এটি একা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত ২ জুলাই সকালে লবণচরার আশিবিঘা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন রাতুল শেখ (২২)। এর আগে ২৮ জুন রাতে নগরীর গল্লামারী এলাকায় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম মানিককে গুলি করা হয়। পরিবারের দাবি, চাঁদা না দেওয়ায় তাঁকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। এই দুটি ঘটনায়ও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

একই শহরে একই ছায়া

খুলনার ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি অস্বস্তিকর মিল চোখে পড়ে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই—

  • হামলাকারীরা অজ্ঞাত
  • চলন্ত মোটরসাইকেল বা দ্রুত পলায়নের উপায় ব্যবহার করা হয়েছে
  • ভুক্তভোগীরা সাধারণ নাগরিক
  • ঘটনার পরপরই তদন্ত শুরু হলেও অগ্রগতি জনসমক্ষে আসেনি

এ ধরনের পুনরাবৃত্তি শুধু অপরাধের প্রকৃতি নয়, অপরাধীদের আত্মবিশ্বাসও প্রকাশ করে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, বারবার একই কায়দায় হামলা হওয়া মানে হয় অপরাধীরা সংগঠিত, নয়তো শহরের ভেতরে এমন দুর্বলতা তৈরি হয়েছে যেখানে হামলাকারীরা দ্রুত পিছু হটার সুযোগ পাচ্ছে।

ইতি, রাতুল, মানিক—তিন ভিন্ন পরিচয়, এক অভিন্ন আতঙ্ক

ইতি একজন স্কুলছাত্রী। রাতুল একজন তরুণ। মানিক একজন ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী। সামাজিক অবস্থান, বয়স, পেশা—সব আলাদা হলেও তারা একই শহরে সহিংসতার শিকার।

এই ঘটনাগুলো আলাদা হয়ে দেখা কঠিন, কারণ খুলনায় গুলি এখন আর কেবল “টার্গেট কিলিং” নয়; এটি সন্ত্রাসের উপস্থিতি, চাঁদাবাজির সংস্কৃতি এবং প্রকাশ্য ভয়ের রাজনীতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীর পরিবার, আশপাশের বাসিন্দা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সবাই একই প্রশ্ন করছেন—পরবর্তী লক্ষ্য কে?

আইনশৃঙ্খলার পরিসংখ্যান কী বলছে

স্থানীয় সূত্রে পুলিশি পরিসংখ্যান হিসেবে যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে খুলনায় ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ২৩ মাসে ৮৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ১৯ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যোগ থাকার কথাও পুলিশি তথ্যে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলো যদি সঠিক হয়, তাহলে খুলনা শুধু একটি শহর নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকটের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানের পূর্ণাঙ্গ সরকারি যাচাই ও প্রকাশ্য ব্যাখ্যা না থাকায় সেগুলোকে এখনো তদন্তসাপেক্ষ হিসেবেই দেখা উচিত।

পুলিশ কী বলছে

রূপসায় গুলির ঘটনায় খুলনা থানার এসআই আব্দুস সাত্তার জানিয়েছেন, ইতি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন মোটরসাইকেলে আসা তিন দুর্বৃত্ত তাকে গুলি করে। পুলিশ জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একই কায়দার ঘটনার পরও কেন গ্রেপ্তার বা মামলার অগ্রগতিতে দৃশ্যমান ফল আসছে না? কেন একের পর এক ভুক্তভোগী আহত হচ্ছেন, অথচ অপরাধের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা যাচ্ছে না?

খুলনার অপরাধ-চিত্রে কী বদল হলো

খুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুলি, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং প্রতিশোধমূলক সহিংসতা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে:

প্রথমত, শহরের নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে কারা প্রভাবশালী, তা চিহ্নিত করা।

দ্বিতীয়ত, হামলাগুলোর পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, নাকি অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের লড়াই রয়েছে, তা স্পষ্ট করা।

তৃতীয়ত, স্থানীয় পুলিশি নজরদারির ফাঁক কোথায়, সেটি নিরূপণ করা।

খুলনার এই তিন ঘটনার মধ্যে এখনও কোনো একটি ঘটনায়ও স্পষ্ট উদ্দেশ্য বা হামলাকারীকে প্রকাশ্যে শনাক্ত করা যায়নি। এটাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক।

সিরিয়াল মার্ডার নাকি সিরিয়াল আতঙ্ক?

“সিরিয়াল মার্ডার” শব্দটি ব্যবহার করতে হলে একাধিক হত্যার মধ্যে একটি সংগঠিত, ধারাবাহিক ও মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্র প্রমাণ করতে হয়। খুলনার বর্তমান ঘটনাগুলোতে সেই আইনি ও ফরেনসিক মানদণ্ড এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়।

তবে “সিরিয়াল আতঙ্ক” বললে পরিস্থিতিটা অনেক বেশি সঠিকভাবে ধরা পড়ে। কারণ শহরের ভেতরে বারবার গুলি, বারবার অনিশ্চয়তা, বারবার তদন্ত—এই চক্র সাধারণ মানুষের মনে স্থায়ী ভীতি তৈরি করছে।

রূপসার কিশোরী ইতি এখন হাসপাতালে। রাতুল শেখ এবং মানিকের ঘটনাতেও তদন্ত চলছে। কিন্তু খুলনার মানুষের প্রশ্ন একই রয়ে গেছে—এই শহরে গুলি কি কেবল দুর্বৃত্তদের হাতে, নাকি রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধের দুর্বলতার ওপরও?

এখন সবচেয়ে জরুরি কী

এই মুহূর্তে দরকার কেবল ঘটনাগুলোর বিবরণ নয়; দরকার—

  • হামলাকারীদের শনাক্ত করা
  • হামলার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করা
  • অস্ত্র ও মোটরসাইকেল-ভিত্তিক অপরাধচক্র ভাঙা
  • চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখা
  • ভুক্তভোগীদের পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়া

কারণ খুলনায় প্রতিটি নতুন গুলির ঘটনা কেবল একটি অপরাধ নয়, আগের অপরাধগুলোর ব্যর্থ জবাবও বটে।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব ঘটনাকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত “সিরিয়াল মার্ডার” বলা যাবে না। কিন্তু এগুলো যে খুলনায় এক ধরনের সিরিয়াল ক্রাইম-সিন তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ কম।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments