২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে অধিকতর বিনিয়োগ ও অর্থায়নের দাবি বিশেষজ্ঞদের
২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে নীতিনির্ধারক, গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের জলবায়ু-স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থায় জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, দেশে জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের মোট বাজেটের মধ্যে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের অংশ FY ২০২১–২২ অর্থবছরে ২.৭৪ শতাংশ থেকে কমে FY ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১.৯৭ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে জাতীয় জলবায়ু বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশও প্রায় ২.৫ শতাংশ থেকে ১.৫ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে।

এই আহ্বান জানানো হয় সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), HEKS/EPER এবং সুশীলনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত “বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়ন” শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের নীতিসংলাপে। ০৬ জুন ২০২৬ তারিখে ঢাকার ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ আয়োজিত এ সংলাপে জলবায়ু ও স্বাস্থ্য বিষয়ক সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সিপিআরডি পরিচালিত দুটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। গবেষণা দুটি হলো: “উপকূলীয় অঞ্চলের নারী ও কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন” এবং “বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু অর্থায়ন: নীতিগত অঙ্গীকার ও আর্থিক বাস্তবতা”।
প্রথম গবেষণাটি উপস্থাপন করেন সোহানুর রহমান ও মো. শাহাদাত হোসেন। গবেষণায় দেখা যায়, দারিদ্র্য, নিরাপদ পানির সংকট এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা গুরুতর প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী প্রায় অর্ধেক নারী বিভিন্ন ধরনের মাসিকজনিত সমস্যার কথা জানান, যার মধ্যে অনিয়মিত মাসিক, তীব্র ব্যথা, মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে গর্ভপাত, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, সংক্রমণ, প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথাসহ বিভিন্ন জটিলতার বিষয়ও উঠে আসে। অংশগ্রহণকারী ৮২.৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন যে নিরাপদ পানি ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসম্মত উপকরণের সীমিত প্রাপ্যতা এসব সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। এছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীর মধ্যে পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (PID)-এর লক্ষণ পাওয়া গেছে এবং পরীক্ষাগার বিশ্লেষণে অনেকের গাইনোকোলজিক্যাল সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত দ্বিতীয় গবেষণাটি তুলে ধরেন সিপিআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার সুমাইয়া বিনতে আনোয়ার। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের জলবায়ু নীতিমালায় স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও সেই নীতিগত অঙ্গীকার এখনো পর্যাপ্ত ও টেকসই অর্থায়নে প্রতিফলিত হয়নি। গবেষণাটি জলবায়ু নীতির প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব বাজেট বরাদ্দের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট বৈষম্য তুলে ধরে।
গবেষণায় বাংলাদেশের জলবায়ু-স্বাস্থ্য অর্থায়নের বর্তমান চিত্রও বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (BCCTF)-এর মোট অর্থায়নের এক শতাংশেরও কম স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত BCCTF-এর আওতায় অর্থায়নপ্রাপ্ত ৮৭৭টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র তিনটি স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে।
গবেষণায় জলবায়ু-স্বাস্থ্য অর্থায়নের কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতাও চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP) ২০২৩–২০৫০ স্বাস্থ্যকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন অগ্রাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং স্বাস্থ্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (HNAP) অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে, তবুও বিদ্যমান অর্থায়ন এখনো মূলত প্রকল্পনির্ভর।
গবেষণায় আরও দেখা যায় যে, জলবায়ু-স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশেরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্পে কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে রোগ নজরদারি, জরুরি প্রস্তুতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জলবায়ু-স্বাস্থ্য গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সহনশীলতা গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে জাতীয় জলবায়ু-স্বাস্থ্য অঙ্গীকার এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ব্যবস্থার মধ্যে একটি স্থায়ী ব্যবধান রয়ে গেছে।




