ত্রিশালে জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মজয়ন্তীর উদ্বোধন ও ৪৭ বছর পর বাবার খনন করা ‘ধরার খাল’ পুনঃখনন কাজের সূচনা; জুলাই থেকে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা পাবে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম ও স্কুলব্যাগ
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) | ২৩ মে ২০২৬ রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের হোতার সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হবে। আজ শনিবার (২৩ মে) বিকেলে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার নজরুল একাডেমি মাঠে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তীর তিন দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ঢাকার মিরপুরে একটি নিষ্পাপ মেয়ের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয় আমরা দেখেছি। এ ধরনের শিশু বা নারী নির্যাতন বর্তমান সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না। আগামী এক মাসের মধ্যে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তি এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।” তিনি একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গঠনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দেশের আবহমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পুনর্জীবনের ওপর জোর দেন।
🕒 ঘটনাপঞ্জি ও প্রধানমন্ত্রীর ত্রিশাল সফরসূচি
- বেলা ২:২১ মিনিট: গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ত্রিশালের বৈলর ইউনিয়নের কানহর এলাকায় পৌঁছান এবং ‘ধরার খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন।
- বিকেল ৪:০০: নজরুল একাডেমি মাঠে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চে আরোহণ ও উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান।
- জুলাই ২০২৬: আগামী জুলাই মাস থেকে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে নতুন স্কুল ইউনিফর্ম ও স্কুলব্যাগ বিতরণ কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা।
বাবার খনন করা ‘ধরার খাল’ ৪৭ বছর পর পুনঃখনন
নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে আজ দুপুরে প্রধানমন্ত্রী ত্রিশালের ঐতিহ্যবাহী ‘ধরার খাল’ পুনঃখনন কাজের ফলক উন্মোচন করেন। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তৎকালীন দেশব্যাপী স্বনির্ভর খালের আদলে এই খালটি প্রথম খনন করেছিলেন। দীর্ঘ ৪৭ বছর পর তাঁরই সুযোগ্য সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই খালটি পুনঃখননের উদ্যোগ নিলেন। উদ্বোধন শেষে খালের পাড়ে তিনি একটি তালগাছের চারা রোপণ করেন।
উদ্বোধন শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিশৃঙ্খলাকারীদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন:
“যেকোনো অন্যায়কারীকে শাস্তি দিতে হলে বিচার প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। কিন্তু আমরা দেখছি গত কয়েকদিন ধরে কিছুসংখ্যক মানুষ রাস্তাঘাট বন্ধ করে, যানবাহনে আগুন দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যারা এমন অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতেই এই জ্বালাতন ও অরাজকতা চালানো হচ্ছে।”
প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, অরাজকতা চললে দেশের কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী ভাতা ব্যাহত হবে। তিনি জানান, এই ধরার খাল পুনঃখনন সম্পন্ন হলে এলাকার প্রায় ৪,৩০০ কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন এবং সামগ্রিকভাবে ২০,০০০ মানুষ সেচের সুফল পাবেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সমগ্র ময়মনসিংহ জেলায় প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার অবরুদ্ধ খাল রয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে পুনঃখনন করা হবে।
ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ করার রূপরেখা
জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম ও বাংলাদেশ এক অবিভাজ্য সত্তা। তিনি আমাদের জাতীয় সত্তা ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক। কবির জীবনবোধ ও দর্শনকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে পৌঁছে দিতে এবং বিশ্বসাহিত্যে তাঁর কর্মকে ছড়িয়ে দিতে ত্রিশালকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণা করা যায় কি না, সে বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য আমি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও পর্যটন বিভাগকে নির্দেশ দিচ্ছি।”
💬 উদ্বোধনী মঞ্চের গুরুত্বপূর্ণ অতিথিবৃন্দ
নজরুল জন্মজয়ন্তীর এই রাষ্ট্রীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন:
- সভাপতি: নিতাই রায় চৌধুরী, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী।
- স্মারক বক্তা: অধ্যাপক তারিক মনজুর, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
- বিশেষ অতিথি: খিলখিল কাজী (কবির পৌত্রী ও নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান) এবং মো. লতিফুল ইসলাম (নির্বাহী পরিচালক, নজরুল ইনস্টিটিউট)।
- অন্যান্য বক্তা: জাহেদ উর রহমান (প্রধানমন্ত্রীর তথ্য, সম্প্রচার ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা), আসাদুল হাবিব দুলু (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী), মো. শরীফুল আলম (বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী), আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম (সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী), এবং মাহবুবুর রহমান (স্থানীয় সংসদ সদস্য)।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ত্রিশালের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যরাও এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
📊 উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার কুইক ফ্যাক্টস
- কৃষি ও সেচ সুবিধা: ধরার খাল পুনঃখননের ফলে ৪,৩০০ কৃষক ও ২০,০০০ স্থানীয় মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।
- শিক্ষার্থীদের সামাজিক সুরক্ষা: আগামী জুলাই মাস থেকে সারা দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে নতুন স্কুল ড্রেস এবং বই বহনের জন্য ব্যাগ বিতরণ শুরু হবে।
- আঞ্চলিক মহাপরিকল্পনা: ময়মনসিংহ জেলার ২,৫০০ কিলোমিটার অবরুদ্ধ খাল পুনঃখননের মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকার।
📌 তথ্যসূত্র:
- বাংলাদেশ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট প্রেস উইং
- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (PMO) প্রেস রিলিজ ও ময়মনসিংহের স্থানীয় জেলা প্রশাসন রেকর্ড



