১৬ হাজার হেক্টর জমিতে ধান কাটার উৎসব; ৪৫ বছরের জরাজীর্ণ পাম্পই কৃষকের ভরসা
নিজস্ব প্রতিবেদক | চাঁদপুর | ১১ মে, ২০২৬
যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা আর ৪৫ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ পাম্পের ‘জোড়াতালি’র ওপর ভর করেই চাঁদপুরের দুটি প্রধান সেচ প্রকল্পে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ‘চাঁদপুর সেচ প্রকল্প’ ও ‘মেঘনা ধনাগোদা সেচ প্রকল্প’ এলাকার ১৬ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে এখন সোনালি ধান ঘরে তোলার উৎসবে মেতেছেন কৃষকেরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং সঠিক সময়ে পানি পাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
ফলনের চিত্র ও ধান কাটার অগ্রগতি
চাঁদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দুটি প্রকল্পে ইতিমধ্যে গড়ে ২৫ থেকে ৫৫ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে:
- চাঁদপুর সেচ প্রকল্প (সদর, ফরিদগঞ্জ ও হাইমচর): এই প্রকল্পের ১০ হাজার ৮৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। আজ ১০ মে পর্যন্ত প্রায় ৫৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এখানে ৪৪ হাজার ১৫৮ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
- মেঘনা ধনাগোদা সেচ প্রকল্প (মতলব উত্তর): এখানে ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে।
কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক
মাঠে মাঠে এখন ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। ফলন নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা মিশ্র হলেও সন্তোষজনক:
- ফরিদগঞ্জের দেইচর গ্রামের কৃষক আবু তাহের জানান, তিনি মাত্র ১০ শতাংশ জমি থেকেই ৮ মণ ধান পেয়েছেন। নিয়মিত সেচ ও সারের কারণে ফলন ভালো হয়েছে।
- একই এলাকার কৃষক মাসুদ আহমেদ বলেন, “সঠিক সময়ে পানি পাওয়ায় সময়মতো চারা রোপণ করতে পেরেছি। এবার লাভ ভালো থাকবে।”
- মতলব উত্তরের কৃষক আলী আজম ও জয়নাল মিয়ার মতে, শেষ সময়ে শিলাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় কিছু ক্ষতি হলেও সার্বিকভাবে পানির অভাব না থাকায় ফলন বাম্পার হয়েছে। তবে বৃষ্টির কারণে অনেক স্থানে অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ করতে হচ্ছে।
🔎 বিশ্লেষণ: ৪৫ বছরের পুরোনো পাম্প ও সীমাবদ্ধতা
চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের যান্ত্রিক বিভাগ জানিয়েছে, এই দুটি সেচ প্রকল্পের মূল চালিকাশক্তি হলো পাম্প হাউজগুলো। কিন্তু এগুলো প্রায় ৪৫ বছরের পুরোনো হওয়ায় বর্তমানে বেশ জরাজীর্ণ।
যান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ:
১. পাম্পগুলো মেরামত ও জোড়াতালি দিয়ে সচল রাখা হয়েছে।
২. মৌসুমের শুরুতে মাঝেমধ্যে সেচ সংকট দেখা দিলেও পরবর্তীতে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে।
৩. পাম্পগুলোর সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় সার্বক্ষণিক রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মো. রুহুল আমিন বলেন, “পাম্পগুলো পুরোনো হলেও আমাদের নিরলস চেষ্টার কারণে কৃষকেরা সঠিক সময়ে পানি পেয়েছেন। যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা কৃষকের পানির চাহিদা মেটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
📊 এক নজরে চাঁদপুরের দুই সেচ প্রকল্প (২০২৬)
| প্রকল্পের নাম | আবাদের পরিমাণ (হেক্টর) | ধান কাটার অগ্রগতি | প্রধান উপজেলাসমূহ |
| চাঁদপুর সেচ প্রকল্প | ১০,৮৬২ | ৫৫% | সদর, ফরিদগঞ্জ, হাইমচর |
| মেঘনা ধনাগোদা | ৫,২০০ | ২৫% | মতলব উত্তর |
উপসংহার
চাঁদপুরের কৃষি অর্থনীতিতে এই দুটি সেচ প্রকল্প লাইফলাইন হিসেবে কাজ করে। পাম্পগুলো আধুনিকায়ন এবং স্থায়ী সংস্কার করা গেলে এ অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদন আরও কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা। প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও কৃষকের এই সাফল্য স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তথ্যসূত্র: বাসস, স্থানীয় কৃষি অফিস ও সরেজমিন প্রতিবেদন (১১ মে, ২০২৬)



