বিটিভির নতুন মহাপরিচালক কাজী জেসিন: অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির নতুন প্রত্যাশা
স্টাফ রিপোর্টার | TODAY TV BD
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) নতুন নেতৃত্ব পেল। সাংবাদিক, লেখক, কবি ও টেলিভিশন উপস্থাপক কাজী জেসিনকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মহাপরিচালক (গ্রেড-১) পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
বুধবার (৬ আগস্ট) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। উপসচিব মো. গোলাম রাব্বানী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০১-এর ধারা ১১(২) অনুযায়ী অন্য কোনো পেশা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে কাজী জেসিনকে এক বছরের জন্য বিটিভির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, নিয়োগের অন্যান্য শর্ত পৃথক চুক্তিপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
এছাড়া পৃথক আরেকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলমের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়েছে।
গণমাধ্যমের পরিচিত এক মুখ
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও টেলিভিশন জগতের পরিচিত নাম কাজী জেসিন। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে তিনি সংবাদ, সমসাময়িক রাজনীতি, টেলিভিশন উপস্থাপনা, মতামতধর্মী অনুষ্ঠান এবং সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত।
তিনি শুধু একজন সাংবাদিক নন; একজন লেখক, কবি, টেলিভিশন উপস্থাপক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবেও সুপরিচিত।
রাজনৈতিক সাংবাদিকতায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, নির্বাচন, সংসদীয় রাজনীতি ও জাতীয় ইস্যুগুলোকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে।
গাইবান্ধা থেকে জাতীয় গণমাধ্যমে
গাইবান্ধা জেলায় জন্মগ্রহণ করা কাজী জেসিনের শৈশব কেটেছে উত্তর বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং University of Cumbria থেকে Sustainable Development and Leadership বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
দেশে ফিরে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
লেখালেখির সূচনা
কাজী জেসিনের সাহিত্যচর্চার শুরু ১৯৯৭ সালে।
লিটল ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা হয়।
পরবর্তীতে কবিতার মাধ্যমে তিনি সাহিত্যাঙ্গনেও নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলেন।
তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- জোৎস্নামত্ত যাত্রা (১৯৯৭)
- তানানুম তানানুম (২০১০)
বর্তমানেও তিনি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও অনলাইন মাধ্যমে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নিয়মিত কলাম ও মতামত লিখে থাকেন।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা ক্যারিয়ার
পেশাগত জীবনে তিনি দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এর মধ্যে রয়েছে—
- দৈনিক আমার দেশ
- এনটিভি
- চ্যানেল ওয়ান
- একুশে টেলিভিশন
- বাংলাভিশন
- যমুনা টেলিভিশন
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে তিনি সংবাদ সংগ্রহ, রাজনৈতিক রিপোর্টিং, টকশো পরিচালনা এবং সম্পাদকীয় দায়িত্বে কাজ করেছেন।
‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ দিয়ে আলোচনায়
টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে কাজী জেসিনের সবচেয়ে পরিচিত অনুষ্ঠান ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’।
এই অনুষ্ঠানটি দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী টকশোগুলোর মধ্যে অন্যতম আলোচিত ছিল।
সরকার, বিরোধী দল, নীতি-নির্ধারক, বিশ্লেষক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি সমসাময়িক রাজনৈতিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছিল।
বিটিভির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নিয়োগ?
বাংলাদেশ টেলিভিশন দেশের সবচেয়ে পুরোনো এবং ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম।
কিন্তু বেসরকারি টেলিভিশন, ওটিটি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিটিভিকে দর্শকসংখ্যা, কনটেন্ট বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় সংবাদ, অনুষ্ঠান নির্মাণ, টেলিভিশন উপস্থাপনা এবং সম্পাদকীয় ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের নেতৃত্ব বিটিভির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন নেতৃত্বে কী প্রত্যাশা?
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, কাজী জেসিনের নেতৃত্বে বিটিভিতে কয়েকটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে—
- আধুনিক ও দর্শককেন্দ্রিক অনুষ্ঠান নির্মাণ
- সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্ব আরও জোরদার করা
- ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিটিভির উপস্থিতি বৃদ্ধি
- তরুণ দর্শকদের উপযোগী নতুন কনটেন্ট তৈরি
- তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান বৃদ্ধি
- সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক উচ্চমানের অনুষ্ঠান নির্মাণ
- আন্তর্জাতিক মানের প্রোডাকশন ও গ্রাফিক্সে গুরুত্ব দেওয়া
- দক্ষ ও সৃজনশীল নির্মাতাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি
ডিজিটাল যুগে বিটিভির নতুন সম্ভাবনা
বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমগুলো এখন শুধু টেলিভিশনে সীমাবদ্ধ নয়।
OTT, YouTube, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্মার্ট টিভি এবং মোবাইল প্ল্যাটফর্মে দর্শকের উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে।
সেই বাস্তবতায় বিটিভিকেও ডিজিটাল-ফার্স্ট কনটেন্ট, অন-ডিমান্ড ভিডিও, আন্তর্জাতিক সম্প্রচার এবং বহুমাত্রিক সংবাদ পরিবেশনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
গণমাধ্যমে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং সমসাময়িক যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে কাজী জেসিনের ধারণা এই রূপান্তরকে আরও গতিশীল করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন যাত্রার সামনে বড় দায়িত্ব
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম হিসেবে বিটিভির দায়িত্ব শুধু সংবাদ প্রচার নয়; বরং জাতীয় সংস্কৃতি, শিক্ষা, ইতিহাস, জনসচেতনতা এবং ইতিবাচক মূল্যবোধকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
কাজী জেসিনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিটিভিকে প্রযুক্তিগতভাবে আরও আধুনিক, কনটেন্টে আরও বৈচিত্র্যময়, সংবাদে আরও পেশাদার এবং দর্শকের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য একটি গণমাধ্যমে রূপান্তর করা।
গণমাধ্যম অঙ্গনের অনেকের প্রত্যাশা, তাঁর সাংবাদিকতা, উপস্থাপনা, সাহিত্যচর্চা এবং দীর্ঘ সম্পাদকীয় অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম হিসেবে আস্থা, মান ও দর্শকপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।




