লিভার ফেইলিউর ও ফুসফুসের জটিলতায় ৩০ বছর বয়সে মারা গেলেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর, অভিনেত্রী ও জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় মুখ কারিনা কায়সার। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে বিনোদন অঙ্গন, রাজনৈতিক নেতা, সহকর্মী ও আন্দোলনের সংগঠকেরা।
ঢাকা | ১৭ মে ২০২৬
বাংলাদেশের ডিজিটাল কনটেন্ট জগতের পরিচিত মুখ, সম্ভাবনাময় অভিনেত্রী ও চিত্রনাট্যকার কারিনা কায়সার আর নেই। লিভার ও ফুসফুসের তীব্র জটিলতায় ভুগেই ভারতের চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শুক্রবার (১৫ মে) দিনগত রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে এই প্রতিভাবান তরুণীর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩০ বছর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনঘনিষ্ঠ অনলাইন কনটেন্ট, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সাবলীল অভিনয় এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজপথে সক্রিয় ও নির্ভীক অংশগ্রহণের কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক চিরচেনা মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তাঁর এই আকস্মিক ও অকালপ্রয়াণে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গন ও রাজনৈতিক মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সাধারণ জ্বর থেকে আকস্মিক লিভার ফেইলিউর
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কিছুদিন আগে প্রথমে সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন কারিনা। পরবর্তীতে তার শরীরে গুরুতর সংক্রমণ (ইনফেকশন) ধরা পড়ে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, ‘হেপাটাইটিস এ এবং ই’–জনিত তীব্র জটিলতার কারণে তার লিভার ফেইলিউর হয়েছে। অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।
উন্নত ও উন্নততর চিকিৎসার লক্ষ্যে গত সোমবার রাতে বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ভারতের ভেলোরের খ্রিষ্টান মেডিকেল কলেজ (সিএমসি) হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁর ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বা যকৃৎ প্রতিস্থাপনের চূড়ান্ত প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। তবে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফুসফুসে অ্যান্টিবাইোটিক প্রয়োগের সময় হঠাৎ তার রক্তচাপ (ব্লাড প্রেসার) আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যায়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
“আমার প্রাণপ্রিয় মেয়েটা ওপারে চলে গেছে”
গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারিনার মৃত্যুর খবরটি প্রথম নিশ্চিত করেন তার বাবা ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক কায়সার হামিদ। ফেসবুকে বাবা-মেয়ের একটি হাসোজ্জ্বল ছবি পোস্ট করে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে তিনি লেখেন:
“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমার প্রাণপ্রিয় আদরের মেয়ে কারিনা কায়সার একটু আগে চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমাদের ছেড়ে ওপারে চলে গেছে। আমার মেয়ের কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে কিংবা কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে আপনারা তাকে ক্ষমা করে দেবেন।”

কারিনা কায়সার বিখ্যাত ক্রীড়া পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। তার পিতা দেশের তারকা ফুটবলার কায়সার হামিদ এবং তার দাদি হলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বরেণ্য দাবাড়ু রানী হামিদ।
অভিনয়, কন্টেন্ট ও জুলাইয়ের অবিনাশী কণ্ঠস্বর
ডিজিটাল মাধ্যমে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা ও সূক্ষ্ম রসবোধের মিশেলে জীবনঘনিষ্ঠ ও ব্যঙ্গধর্মী কনটেন্ট তৈরি করে তরুণ দর্শকদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয়তা পান কারিনা। পরবর্তীতে তিনি শুধু কন্টেন্ট ক্রিয়েশনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, ওটিটি ও নাটকের জগতেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে প্রশংসিত ওয়েব সিরিজ ‘ইন্টার্নশিপ’ এবং বহুল আলোচিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র/নাটক ‘৩৬-২৪-৩৬’।
তবে তাঁর প্রয়াণের পর দেশের মানুষ তাকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করছে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একজন সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি রাজপথে ব্যানার হাতে দাঁড়িয়েছিলেন। ৩ আগস্ট ২০২৪-এ দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তার সাহসিকতার ছবিগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এপিটাফ হয়ে উঠেছে।
💬 সংস্কৃতি, সমাজ ও রাজনৈতিক মহলের শোকগাথা
কারিনা কায়সারের অকালমৃত্যুতে বিনোদন জগৎ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ গভীর শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন:
- মোস্তফা সরয়ার ফারুকী (নির্মাতা): “বাংলাদেশ তোমাকে মনে রাখবে। আর আমি মনে রাখবো তোমার উইটের কারণে, তোমার ডিলাইটফুল প্রেজেন্সের কারণে। তোমার সঙ্গে করা কাজ ৩৬-২৪-৩৬–এর কারণে। মানুষ মরে গেলে নাকি সব সত্য দেখতে পায়। এখন নিশ্চয়ই তুমি বিশ্বাস করছো, আমরা তোমার অনেক বড় ফ্যান ছিলাম।”
- অধ্যাপক আসিফ নজরুল (সাবেক উপদেষ্টা): “লাল জুলাইয়ের রং। কারিনা জুলাইয়ের নাম। রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু আমরা একটা পরিবার। দূরে থাকি, ভুলে থাকি, নীরব থাকি, তবু আমরা একটা পরিবার… আমাদের পরিবারের একজন চলে গেছে অকালে! মানুষের মুক্তির জন্য সে ছিল আমাদের সঙ্গে। মানুষই তাই মনে রাখবে তাকে।”
- নাহিদ ইসলাম (বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপি আহ্বায়ক): “জুলাই বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোতে ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্মম গণহত্যার বিরুদ্ধে কারিনা কায়সার ছিলেন এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি অগ্রणी ভূমিকা পালন করেছিলেন।”
- আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া (এনসিপি মুখপাত্র): “তার অকালমৃত্যু আমাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কঠিন ও দমনমূলক সময়েও তিনি গণমানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।”
- ডা. তাসনিম জারা (জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ): কারিনার অসুস্থতার সময় অনলাইনে কিছু মানুষের বিকৃত ট্রোলিংয়ের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, “২০২৬ সালে বাংলাদেশে যে বিষয়গুলো নিয়ে ও ব্যঙ্গ করত, সেগুলো নিয়ে হাসতে মেরুদণ্ড লাগে। প্রকৃত মেধাবীরা সবসময় নিজেদের পরবর্তী কাজের মধ্য দিয়ে আরও বড় হয়ে ওঠেন। আমরা ওর জীবনের মধ্যভাগ ও শেষ অধ্যায়—দুটো থেকেই বঞ্চিত হলাম।”
- হাসনাত আবদুল্লাহ (সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেতা): ৩ আগস্টের আন্দোলনের ছবি শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, “ভালো থেকো, জুলাইয়ের মানুষ, আমাদের মানুষ।”
- সারজিস আলম (এনসিপি নেতা): “হে আল্লাহ, ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো আমাদের বোনকে আপনি কবুল করে নিন।”
📊 এক নজরে কারিনা কায়সার (Data Points)
| ক্ষেত্র / তথ্য | বিবরণ |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | কারিনা কায়সার |
| পরিচিতি | ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর, অভিনেত্রী, চিত্রনাট্যকার ও জুলাই আন্দোলনের কর্মী |
| বয়স | ৩০ বছর |
| মৃত্যুর কারণ | হেপাটাইটিস এ ও ই–জনিত লিভার ফেইলিউর এবং ফুসফুসের গুরুতর জটিলতা |
| মৃত্যুর স্থান ও সময় | সিএমসি হাসপাতাল, ভেলোর, চেন্নাই (১৫ মে ২০২৬, দিনগত রাত) |
| উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি | ‘ইন্টার্নশিপ’ (ওয়েব সিরিজ), ‘৩৬-২৪-৩৬’ (চলচ্চিত্র/নাটক) |
| পারিবারিক পরিচয় | বাবা: কায়সার হামিদ (সাবেক ফুটবল অধিনায়ক), দাদি: রানী হামিদ (দাবাড়ু) |
📌 বিশেষ নোট ও বর্তমান পরিস্থিতি
পরিবার ও সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ভারতের চেন্নাই থেকে কারিনা কায়সারের মরদেহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চলছে। মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছানোর পর পারিবারিক সম্মতিতে তাঁর জানাজা ও দাফনের চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা করা হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কারণে এই তরুণ সংস্কৃতিকর্মী দেশের মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবেন।
তথ্যসূত্র: সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এবং কায়সার হামিদের অফিশিয়াল ফেসবুক হ্যান্ডেল



