১৯৭৪ সাল থেকে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটি রাতারাতি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো কেন? ২০০৬ সালে জমি বরাদ্দের আবেদনে মিষ্টির স্বাক্ষর, ২০২১ সালে সমিতির নামে ৯৯ বছরের ইজারা, আদালতে বিচারাধীন বিরোধ, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে হামলা সংগঠনের অভিযোগ এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা—সব মিলিয়ে রাড্ডা-কাণ্ডের গভীরে রয়েছে জমির অধিকার, রাজনৈতিক প্রভাব ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন।
টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় সংসদ সদস্য হওয়ার প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় পদত্যাগ করেছেন বিএনপির নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে দুই শতাধিক মুখোশধারী ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করেন, ওষুধ, টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালপত্র লুট করেন এবং ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একাধিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেন। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। রাড্ডা কর্তৃপক্ষের দাবি, এতে এক কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। ঘটনাটি শুধু একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা নয়; এর পেছনে রয়েছে জমির বরাদ্দ ও দখল নিয়ে দীর্ঘ বিরোধ, স্থানীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
মিষ্টির রাজনৈতিক উত্থান: ছাত্রদল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্ব ও পারিবারিক পরিচয়
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে পড়ার সময় ছাত্রদলের রাজনীতি দিয়ে। তিনি কলেজ ছাত্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক বা এজিএস নির্বাচিত হন। পরে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর স্বামী সাইদুর রহমান নিউটন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। ২০০২ সালে নিউটন নিহত হওয়ার পর মিষ্টি ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হন; ২০১৯ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও তিনি বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন। তিনি প্রয়াত বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন। ২০২৬ সালে বিএনপির মনোনয়নে তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন ও সাধারণ আসনে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের অনুপাত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তাঁর সংসদে প্রবেশ ছিল দলীয় সিদ্ধান্তের ফল। কিন্তু এত বছরের স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচিতি ও দলীয় অবস্থান রাড্ডা-কাণ্ডের পর তাঁর জন্য রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক বা অতীতের সাংগঠনিক পদকে কোনো অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। মূল প্রশ্ন হলো, রাড্ডা সেন্টারের জমি নিয়ে সমিতির পুরোনো কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক যোগাযোগের কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র ছিল কি না।
রাড্ডা সেন্টার: ১৯৭৪ সাল থেকে স্বাস্থ্যসেবা, অথচ জমির বরাদ্দ অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুরের নিম্ন আয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য মাতৃস্বাস্থ্য, প্রসূতিসেবা, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে। এই দীর্ঘ সেবার ইতিহাসের মধ্যেই জমিটির মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নথি সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিরপুর সেকশন-১, ব্লক ‘ডি’, এভিনিউ-৪-এর দক্ষিণ পাশে ৬/১ নম্বর প্লটটির মূল মালিক জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। ২০০৬ সালে একটি আবেদনের ভিত্তিতে জমিটি সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে ৯৯ বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং ২০২১ সালের ২৯ জুন সমিতির পক্ষে সভাপতি মো. আশরাফ উদ্দিনের নামে ইজারা দলিল নিবন্ধিত হয়। অর্থাৎ জমির আইনি অবস্থানকে শুধু ‘রাড্ডার জমি’ বা ‘সমিতির জমি’ বলে সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ জমিটির মূল মালিক; সমিতির নামে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা নথিভুক্ত হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য। অন্যদিকে রাড্ডা কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে বহু বছর ধরে সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতারের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে তাদের কার্যক্রমের মেয়াদ বাড়িয়েছে এবং সর্বশেষ ১৯৮৩ সালে মেয়াদ বৃদ্ধির চুক্তি হয়েছিল। একই সঙ্গে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে সমিতির নামে ইজারা নিবন্ধনের পর রাড্ডা কর্তৃপক্ষ উচ্চ আদালতে রিট করে; সেই রিটের নিষ্পত্তি তখনো হয়নি। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রশ্ন হলো, একটি প্রতিষ্ঠান যখন পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি অনুমতি নিয়ে জনস্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল, তখন তার দখলে থাকা জমি অন্য একটি সমিতির নামে বরাদ্দ ও ইজারা নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হলো? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ, ২০২১ সালের ইজারা দলিল এবং উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রিট—এই চারটি নথি পাশাপাশি না দেখলে জমির প্রকৃত আইনি অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
মিষ্টির স্বাক্ষর কোথায়, আর সমিতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কতটা পুরোনো?
এই ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম সামনে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, তিনি অতীতে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সভাপতি ছিলেন। মিষ্টি নিজেই গণমাধ্যমকে বলেছেন, ২০০৬ সালে ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে তিনি সমিতির সভাপতি ছিলেন এবং জমি বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছিলেন। প্রথম আলো ও বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদনেও বরাদ্দের আবেদনে সভাপতি হিসেবে তাঁর স্বাক্ষরের কথা এসেছে। তবে সমিতির সঙ্গে বর্তমানে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর বা লুটপাটে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই বলে তিনি দাবি করেছেন। এখানে একটি নথিগত বিষয়ও যাচাই করা দরকার। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে জমি বরাদ্দের আবেদনের সাল নিয়ে ২০০৪ ও ২০০৬—দুই ধরনের তথ্য এসেছে। কোথাও বলা হয়েছে, ২০০৪ সালে আবেদন করা হয়েছিল; অন্য প্রতিবেদনে ২০০৬ সালে আবেদনের কথা উল্লেখ রয়েছে। মূল আবেদনপত্র, সমিতির নিবন্ধন নথি এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ ফাইল পরীক্ষা করলেই তারিখ ও স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। এই পার্থক্য ছোট মনে হলেও জমির আবেদন, বরাদ্দ ও ইজারা নিবন্ধনের ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য মূল নথিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মিষ্টির স্বাক্ষরযুক্ত পুরোনো আবেদন তাঁর সঙ্গে সমিতির ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রমাণ হতে পারে; এটি নিজে থেকে ২০২৬ সালের হামলার পরিকল্পনা বা নির্দেশনায় তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে না। সেই সংযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে হামলার আগে ও পরে তাঁর যোগাযোগ, অর্থায়ন, নির্দেশনা, সংগঠকদের সঙ্গে কথোপকথন কিংবা অন্য প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন।
২৪ সেপ্টেম্বরের রাত: পরিকল্পিতভাবে জমি দখলের অভিযোগ কেন জোরালো হচ্ছে?
প্রথম আলো ও বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গভীর রাতে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন ব্যক্তি মুখোশ পরে দেশীয় অস্ত্র ও ভাঙচুরের সরঞ্জাম নিয়ে রাড্ডা সেন্টারে ঢোকেন। নিরাপত্তাকর্মীদের আটকে রেখে তাঁরা ওষুধ, টিকা, আসবাব, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যান। এরপর একটি টিনশেড ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ স্থাপনার একাধিক অংশ ভাঙা হয়। হামলার পর সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির নামে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। রাড্ডা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় বছর ধরে সমিতির নামে কিছু লোক জমিটি দখলের চেষ্টা করছিল। ঘটনার ধরন থেকে তদন্তকারীদের সামনে দুটি আলাদা প্রশ্ন আসে। প্রথমত, এটি কি জমির দখল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে চালানো পরিকল্পিত অভিযান ছিল? দ্বিতীয়ত, জমি দখলের দাবি থাকলেও চিকিৎসাকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ও ওষুধ লুট এবং ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো? কোনো জমির ওপর ইজারা বা মালিকানার দাবি থাকলে তার নিষ্পত্তির আইনি পথ রয়েছে। কিন্তু জমির দাবি থাকলেই নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করা, সম্পদ লুট করা বা স্থাপনা ভেঙে ফেলার অধিকার তৈরি হয় না। জমির অধিকার এবং হামলা-লুটপাটের দায় আলাদা আইনি প্রশ্ন।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের নাম, সিসিটিভি ও হামলার সংগঠক কারা?
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার ভিত্তিতে কয়েকজন স্থানীয় নেতার নাম এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার আগে কিছু ব্যক্তি স্থানীয় বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেনিন এবং মোহাম্মদ হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়েছিলেন। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হানিফ মিয়া, আবুল কালাম আজাদ এবং যুবদলের সাবেক নেতা মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে এলাকায় ঘোরাফেরা করতে এবং হামলার সময় নির্দেশনা দিতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হামলাকারীদের হাতে দেশীয় অস্ত্র সরবরাহ এবং ভবন ভাঙার জন্য খননযন্ত্রের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও তদন্তে এসেছে। এগুলো গুরুতর অভিযোগ, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদা করে প্রমাণ করা প্রয়োজন। রাড্ডার করা মামলায় হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। হানিফ মিয়া নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, তিনি ঘটনার বিষয়ে কিছু জানেন না। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে অন্য কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং সংবাদমাধ্যমে কারও নাম আসা, মামলায় আসামি হওয়া, গ্রেপ্তার হওয়া এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া—চারটি আলাদা বিষয়। তবে সিসিটিভি, স্থানীয় সূত্র ও হামলার আগের জমায়েতের তথ্য মিলিয়ে একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে: কারা হামলাকারীদের একত্র করেছিল, কারা অস্ত্র ও সরঞ্জাম জোগাড় করেছিল, কে খননযন্ত্রের ব্যবস্থা করেছিল এবং ঘটনাস্থলে নির্দেশনা দিয়েছিল কারা? গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছেন কি না, আর কারও ভূমিকা ছিল পরিকল্পনা বা অর্থায়নে—তদন্তে এই পার্থক্য নির্ধারণ করা জরুরি।
১০ জন গ্রেপ্তার, দুই ট্রাক মালামাল উদ্ধার—কিন্তু নির্দেশদাতা কারা?
২৭ সেপ্টেম্বর বিডিনিউজ২৪ জানায়, রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় তখন পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং লুট হওয়া দুই ট্রাক মালামাল উদ্ধার করা হয়। পরে প্রথম আলোর ৩০ সেপ্টেম্বরের অনুসন্ধানে মোট ১০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়। উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে আসবাবপত্র, টিকা, রেজিস্টার, ফ্রিজ, প্রিন্টার ও জেনারেটরের মতো জিনিস ছিল। তদন্তকারীরা তখনো হামলার নেতৃত্ব, খননযন্ত্রের ব্যবস্থা এবং অন্যদের ভূমিকা শনাক্তের চেষ্টা করছিলেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একা মামলার মূল প্রশ্নের উত্তর দেয় না। দুই শতাধিক লোকের উপস্থিতি, আগে থেকে জমায়েত, অস্ত্র সংগ্রহ, ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং একাধিক স্থাপনা ভাঙার জন্য সমন্বিত কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত রয়েছে। তাই তদন্তে শুধু ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিদের নয়, নির্দেশদাতা, অর্থদাতা, পরিবহন ও সরঞ্জাম সরবরাহকারী এবং সমিতির পক্ষে দখল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত যাঁরা নিয়েছেন, তাঁদের ভূমিকা আলাদাভাবে খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
পুলিশের ভূমিকা: খবর পাওয়ার পরও হামলা থামল না কেন?
রাড্ডা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, হামলার সময় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও হামলাকারীদের থামাতে বা গ্রেপ্তার করতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে বলা হয়, শাহ আলী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরও হামলা থামানোর উদ্যোগ নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা নিয়ে গঠিত প্রাথমিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা পড়ার পর ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁকে প্রত্যাহার করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এখানেই তদন্তের আরেকটি স্তর তৈরি হয়। একজন ওসিকে প্রত্যাহার করা প্রশাসনিক ব্যবস্থা; সেটি নিজে থেকে তাঁর অপরাধ প্রমাণ করে না। তবে যদি আগাম খবর পাওয়ার পরও পুলিশ হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে থাকে, তাহলে শুধু প্রত্যাহার যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তদন্তে জানতে হবে, থানায় প্রথম খবর কখন আসে, কোন কর্মকর্তা তা গ্রহণ করেন, পুলিশ কখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, হামলাকারীদের থামানোর জন্য কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কী জানানো হয়েছিল। দায়িত্বে অবহেলার সঙ্গে ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা বা কোনো পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও প্রমাণের ভিত্তিতে পরীক্ষা করতে হবে।
জমির কাগজ থাকলেই কি রাতের আঁধারে দখল নেওয়া যায়?
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য হলো জমির ইজারা এবং জমির দখল। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, জমিটি রাড্ডা সেন্টারের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি; সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির নামে দীর্ঘমেয়াদি বরাদ্দ ও ইজারা নিবন্ধন রয়েছে। অন্যদিকে রাড্ডা কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমতিতে ১৯৭৪ সাল থেকে সেখানে সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে এবং ২০২১ সালে ইজারা নিবন্ধনের পর উচ্চ আদালতে রিট করেছে। সেই রিট নিষ্পত্তি না হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জমির দলিলের পাশাপাশি ইজারার শর্ত, বরাদ্দের উদ্দেশ্য, জমির দখল হস্তান্তর হয়েছিল কি না, রাড্ডার ব্যবহার-অনুমতির মেয়াদ এবং আদালতে করা রিটের নথি পরীক্ষা করা দরকার। সমিতির নামে ইজারা নিবন্ধন হয়ে থাকলেও তা দিয়ে হামলা, লুটপাট বা ভাঙচুরের বৈধতা তৈরি হয় না। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের বক্তব্যও উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমিতির নামে জমির ইজারা থাকলেও দখলপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ এবং জবরদস্তি বা ভাঙচুর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
২০০৬ সালের আবেদন থেকে ২০২১ সালের ইজারা: ১৫ বছরের মধ্যে কী ঘটেছিল?
এই সময়কালই অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সমিতির নামে ২০০৬ সালে জমি বরাদ্দের কথা বলা হচ্ছে; ২০২১ সালে ৯৯ বছরের ইজারা দলিল নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে রাড্ডা সেন্টার সেখানে সেবা চালিয়ে গেছে বলে জানায়। তাহলে বরাদ্দের সময় জমির বাস্তব দখল কার কাছে ছিল, ইজারা নিবন্ধনের আগে রাড্ডাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না, সমিতি কখনো জমির দখল বুঝে পেয়েছিল কি না এবং ২০২১ সালে রিট করার পর আদালত কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ দিয়েছিল কি না—এসব তথ্য প্রকাশ্যে পরিষ্কার নয়। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের পূর্ণ বরাদ্দ ফাইল, ২০২১ সালের নিবন্ধিত ইজারা দলিল, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ও নবায়নপত্র এবং উচ্চ আদালতের রিটের আবেদন ও আদেশ দেখা প্রয়োজন। শুধু সাইনবোর্ডে ‘জমির মালিক’ লেখা বা দীর্ঘদিন সেখানে সেবা পরিচালনা—কোনোটিই একা পুরো আইনি অবস্থান নির্ধারণ করে না।
পদত্যাগ: রাজনৈতিক দায়ের স্বীকৃতি, নাকি দলীয় সংকট সামলানোর সিদ্ধান্ত?
৩০ সেপ্টেম্বর রাতে সংবাদমাধ্যমে খবর আসে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। পরে মিষ্টি সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। আনুষ্ঠানিক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করছেন। স্পিকার জানান, সংবিধানের ৬৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ শূন্য হয়েছে। আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্রে ‘স্বেচ্ছায়’ বলা হলেও তার আগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, পদত্যাগের সিদ্ধান্তটি দলীয় নেতৃত্বের চাপের প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছে। তবে পদত্যাগকে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বীকারোক্তি বা অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাজনৈতিক দায় সামলানোর পদক্ষেপ; ফৌজদারি দায় নির্ধারণের বিষয়টি তদন্ত ও আদালতের।
এক দিনে তিন কমিটি বিলুপ্ত, ১৪ নেতাকে বহিষ্কার
রাড্ডা-কাণ্ডের পর রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন স্তরের ১৪ জন নেতাকে বহিষ্কারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, মেয়াদোত্তীর্ণতা ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে রাড্ডা-কাণ্ড নিয়ে দলের ভেতরে চাপ তৈরি হওয়ায় এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে ঘটনার সম্পর্ক আছে বলে কয়েকজন দলীয় নেতা ধারণা প্রকাশ করেছেন। তবে দলীয় বিজ্ঞপ্তিগুলোতে সব সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে সরাসরি রাড্ডা-কাণ্ডের উল্লেখ নেই। তাই ঘটনাপ্রবাহের সময়গত মিল থাকলেও প্রতিটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের কারণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এই সিদ্ধান্তগুলোর রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। স্থানীয় সংগঠনের একাধিক স্তরের কমিটি বিলুপ্ত হওয়া দেখায়, রাড্ডা-কাণ্ডের প্রতিক্রিয়া একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তবে সাংগঠনিক শাস্তি দিয়ে ফৌজদারি তদন্তের বিকল্প তৈরি করা যায় না। দলীয় পদ হারানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার প্রয়োজন; একইভাবে দলের সিদ্ধান্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কারও অপরাধ প্রমাণ করে না।
মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগের আইনি অবস্থান কী?
মিষ্টি অতীতে সমমনা সমিতির সভাপতি ছিলেন এবং জমি বরাদ্দের আবেদনে তাঁর স্বাক্ষর ছিল—এ তথ্য তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। কিন্তু তিনি বলেছেন, বর্তমানে সমিতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নেই এবং হামলা, ভাঙচুর বা লুটপাটে তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ১ অক্টোবর বলেছেন, তদন্তে তাঁর সংশ্লিষ্টতা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে; অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাঁকে দোষী ধরে মন্তব্য করা ঠিক নয়। এই অবস্থান থেকে দুটি প্রশ্ন আলাদা রাখতে হবে। প্রথমত, মিষ্টি সমিতির সঙ্গে অতীতে যুক্ত ছিলেন—এটি নথিভিত্তিক তথ্য। দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালের হামলার পরিকল্পনা, নির্দেশনা বা বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকা ছিল কি না—এটি এখনো তদন্তের বিষয়। তাঁর পুরোনো স্বাক্ষর বা স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে পরিচিতি তদন্তে প্রাসঙ্গিক হতে পারে, কিন্তু সরাসরি সম্পৃক্ততার বিকল্প প্রমাণ নয়।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষতি: জমির বিরোধে সবচেয়ে বড় মূল্য দিল কারা?
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সাল থেকে নিম্ন আয়ের মা ও শিশুদের সেবা দিয়ে আসছিল। সেখানে প্রসূতিসেবা, টিকাদান, শিশুস্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার মতো সেবা দেওয়া হতো। ভবন ভাঙা ও যন্ত্রপাতি লুটের কারণে এসব সেবা ব্যাহত হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরও কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের সামনে সীমিত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন; এক পর্যায়ে ৫০ জনের বেশি নারী ও শিশু সেখানে এসেছিলেন এবং ৩৭ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। এই ক্ষতির মূল্য কেবল ভবন ও যন্ত্রপাতির অর্থমূল্যে হিসাব করা যায় না। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ওপর নির্ভরশীল নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো এখন কোথায় যাবে, সেবা পুনরায় চালু হতে কত সময় লাগবে, টিকা ও চিকিৎসার ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় থাকবে—এসবও রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক বিবেচনার বিষয়। জমির বিরোধ নিষ্পত্তির দায় প্রশাসনের; তার জন্য মা ও শিশুর চিকিৎসাসেবা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দায় সাধারণ মানুষকে বহন করতে হওয়া উচিত নয়।
তদন্তে এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি
রাড্ডা-কাণ্ডের পূর্ণ সত্য জানতে অন্তত ছয়টি ক্ষেত্রে নথিভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন: প্রথমত, ২০০৪/২০০৬ সালের জমি বরাদ্দের আবেদনের মূল কপি, অনুমোদনের শর্ত এবং ২০২১ সালের নিবন্ধিত ইজারা দলিল; দ্বিতীয়ত, রাড্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-প্রদত্ত অনুমতি ও নবায়নের নথি এবং উচ্চ আদালতে চলমান রিটের সর্বশেষ অবস্থা; তৃতীয়ত, হামলার আগে স্থানীয় কার্যালয়ের সামনে জমায়েত, অস্ত্র সরবরাহ, খননযন্ত্র ভাড়া এবং হামলার সময়কার সিসিটিভি ও যোগাযোগের তথ্য; চতুর্থত, লুট হওয়া পণ্যের পরিবহন ও উদ্ধার-শৃঙ্খল; পঞ্চমত, থানায় অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশি পদক্ষেপের সময়রেখা এবং ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত; ষষ্ঠত, মিষ্টি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা বা নির্দেশনায় সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ আছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্য হলে একদিকে জমির মালিকানা ও ব্যবহারের আইনি বিরোধ পরিষ্কার হবে, অন্যদিকে হামলার পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীদের আলাদা করে শনাক্ত করা সহজ হবে। এর কোনোটি কেবল সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য বা দলীয় সিদ্ধান্ত দিয়ে নিষ্পত্তি করা যাবে না।
টুডে টিভি বিডির অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির রাজনৈতিক উত্থান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্ব, ছাত্রদলের অভিজ্ঞতা, বিএনপির সাংগঠনিক পদ এবং পরিচিত রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ঘটেছে। সংসদ সদস্য হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় তাঁর নাম সামনে আসে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করেন। এই ঘটনাপ্রবাহ তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বড় সংকট তৈরি করেছে। কিন্তু তাঁর পদত্যাগকে ব্যক্তিগত অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না; আবার অতীতের রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে তদন্ত এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও থাকা উচিত নয়। এই ঘটনার সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন সম্ভবত শুধু ‘জমির মালিক কে’ নয়। প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন জনস্বাস্থ্যসেবা দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের জমি নিয়ে বিরোধ আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কীভাবে শতাধিক লোকের একটি দল রাতের আঁধারে ঢুকে কর্মীদের জিম্মি করে, মালপত্র লুট করে এবং ভবন গুঁড়িয়ে দিতে পারল? কেন পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে হামলা ঠেকাতে পারেনি? কারা লোক জড়ো করল, কারা সরঞ্জাম দিল, কারা নির্দেশ দিল এবং কারা এই দখলপ্রক্রিয়া থেকে লাভবান হওয়ার কথা ছিল? মিষ্টির পদত্যাগ রাজনৈতিক জবাবদিহির একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ। কিন্তু রাড্ডা-কাণ্ডের পূর্ণ জবাবদিহি হবে কেবল তখনই, যখন জমির বরাদ্দ ও ইজারার নথি প্রকাশ্যে যাচাই হবে, হামলার সংগঠক ও নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা হবে, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার দায় নির্ধারণ হবে এবং লুটপাট ও ভাঙচুরের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত পুনরায় চালু করা জরুরি, কারণ জমির বিরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সেই দরিদ্র পরিবারগুলো, যাদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছিল।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো—রাড্ডা সেন্টার ভাঙচুর ও স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা, প্রথম আলো—মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি, জাগো বাংলা—জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা, বিডিনিউজ২৪—হামলায় গ্রেপ্তার ও মালামাল উদ্ধার, বিডিনিউজ২৪—মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ, বিডিনিউজ২৪—তদন্তে দোষ পেলে আইনি ব্যবস্থা, যুগান্তর—ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির রাজনৈতিক পরিচয়, বিডিনিউজ২৪—ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ তিন কমিটি বিলুপ্ত।




