সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা ও বাংলাদেশি অভিবাসী নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন
মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। কিন্তু কী ধরনের কাজের অভিযোগে তাঁদের এই সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে এ বিষয়ে বাংলাদেশি কনস্যুলেটকে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট। পরে দুই ব্যক্তির পরিচয়, অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ।
এখানেই প্রশ্ন। অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার আগে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের কূটনৈতিক মিশনকে অবহিত করার মতো বিষয়গুলো কি গুরুত্বহীন? সৌদি কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্তের পর তাঁদের আদালতে তোলা হয়েছিল, আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের পর তা কার্যকর হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সামনে সেই বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত নেই। বাংলাদেশও এখন পর্যন্ত চেয়েছে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ।
অভিযোগের বিস্তারিত অজানা, অথচ শাস্তি চূড়ান্ত—এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন তোলা মানেই অপরাধকে সমর্থন করা নয়; বরং ন্যায়বিচারের স্বচ্ছতা দাবি করা। অভিযোগ সত্য হলে তার বিচার হোক। কিন্তু অভিযোগ কী ছিল, কী প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল, অভিযুক্তরা আত্মপক্ষ সমর্থনের কী সুযোগ পেয়েছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তরও জনসমক্ষে থাকা জরুরি। বিশেষ করে যখন শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
কিন্তু এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরেকটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এসেছে। মসজিদের পবিত্রতা কিংবা নৈতিকতার প্রশ্নে সৌদি বিচারব্যবস্থা যদি এত কঠোর হয়, তাহলে দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন, বেতন আটকে রাখা ও অমানবিক আচরণের অভিযোগগুলোর বেলায় কার্যকর বিচার কোথায়? নৈতিকতার আইন কি শুধু অভিযুক্তের পরিচয়, পরিস্থিতি কিংবা ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে কঠোর বা কোমল হয়ে ওঠে?
নির্যাতিত নারীদের কান্না কি বিচারব্যবস্থার কানে পৌঁছায় না?
বাংলাদেশের হাজারো নারী পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচানোর আশায় সৌদি আরবে গেছেন। কেউ জমি বন্ধক রেখে, কেউ ঋণ করে, কেউ পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। তাঁদের স্বপ্ন ছিল উপার্জন করে সন্তানদের পড়াশোনা করানো, বাবা-মায়ের চিকিৎসা, পরিবারের অভাব দূর করা। কিন্তু তাঁদের একটি অংশকে দেশে ফিরতে হয়েছে নির্যাতনের ক্ষত, ভাঙা শরীর, ঋণের বোঝা এবং গভীর মানসিক আঘাত নিয়ে। কারও ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাবর্তন হয়েছে কফিনবন্দি হয়ে।
২০২০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে ২ হাজার ৩১৫ জন নারী গৃহকর্মী দেশে ফিরেছিলেন। তাঁদের অনেকে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন, অপর্যাপ্ত খাবার, বেতন না দেওয়া কিংবা চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত কাজ করানোর অভিযোগ করেছিলেন।
এ সংখ্যা শুধু দেশে ফিরে আসা নারীদের হিসাব। যাঁরা নির্যাতন সহ্য করেও কোনোভাবে কাজ চালিয়ে গেছেন, যাঁরা ভয় বা অসহায়ত্বের কারণে মুখ খোলেননি, কিংবা যাঁদের অভিজ্ঞতা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধ হয়নি—তাঁদের সবার চিত্র এই সংখ্যা তুলে ধরে না।
২০১৯ সালের ৮ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আল জাজিরা জানায়, ওই বছরের ২৬ আগস্ট সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা ১১১ জন নারী শ্রমিকের মধ্যে ৩৮ জন শারীরিক কিংবা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৪৮ জন বেতন ও ভাতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। একই প্রতিবেদনে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির বরাত দিয়ে বলা হয়, আগের চার বছরে সৌদি আরবে অন্তত ৬৬ জন বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল; তাঁদের ৫২ জনের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এগুলো কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব নয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং অভিবাসনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে উঠে আসা উদ্বেগজনক চিত্র। তবু এই নারীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের প্রশ্নের শেষ নেই। নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে কতজন অভিযুক্ত নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত হয়েছে? কতটি ঘটনায় আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে? কতজন অপরাধী শাস্তি পেয়েছেন? দুই দেশের সরকার কি নিয়মিতভাবে এসব মামলার অগ্রগতি পর্যালোচনা করে? জনসমক্ষে এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর খুব কমই পাওয়া যায়।
আমেনা বেগমের গল্প: অপরাধের শিকার, নাকি ব্যবস্থার বন্দি?
২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা এক বাংলাদেশি নারীর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। ওই প্রতিবেদনে তাঁর নাম আমেনা বেগম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল; নামটি পরিবর্তিত। তিনি জানিয়েছিলেন, রিয়াদে প্রায় দেড় বছর থাকার মধ্যে তাঁকে পাঁচ মাস পুলিশের হেফাজতে কাটাতে হয়েছিল।
আমেনার বক্তব্য অনুযায়ী, গৃহকর্তার যৌন প্রস্তাবে সম্মত না হওয়ায় তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। টানা তিন দিন খাবার দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে মারধরে তাঁর হাত ভেঙে যায় এবং তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে। চিকিৎসার পর এজেন্টের মাধ্যমে তাঁকে আবার সেই বাড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। সেখানে ফেরার পরও শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চলেছিল বলে বিবিসিকে জানান তিনি।
এক বছর কাজ করেও তিনি পেয়েছিলেন মাত্র দুই মাসের আংশিক বেতন। সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য ঋণ করেছিলেন; দেশে ফেরার সময় সেই ঋণ শোধ করার মতো অর্থও তাঁর হাতে ছিল না।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: একজন নারী যৌন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করলে, তাঁর সুরক্ষা ও অভিযোগের তদন্ত নিশ্চিত করা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? তিনি পুলিশের হেফাজতে থাকলেন, দেশে ফেরার ব্যবস্থা হলো—কিন্তু তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে কোনো চূড়ান্ত ফল উল্লেখ করা হয়নি।
একজন নির্যাতিত নারীকে উদ্ধার করে দেশে পাঠিয়ে দিলেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? অপরাধের অভিযোগের তদন্ত, অভিযুক্তের জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার—এসব কি তবে অপ্রয়োজনীয়?
লাশ ফিরে আসে, প্রশ্ন থেকে যায়
প্রবাসী নারী শ্রমিকদের মৃত্যুর পরিসংখ্যানও ভয়াবহ। দ্য ডেইলি স্টার ২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, ২০১৬ সাল থেকে ওই বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪৭৩ জন নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ বাংলাদেশে ফিরেছিল। তাঁদের মধ্যে ১৭৫ জনের মরদেহ এসেছিল সৌদি আরব থেকে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ওই সময়ের মধ্যে অন্তত ৮১ জন নারী আত্মহত্যা করেছিলেন; তাঁদের ৫১ জন সৌদি আরবে।
এই সংখ্যাগুলোকে এককভাবে নির্যাতনের কারণে মৃত্যুর প্রমাণ বলা যাবে না। সব মৃত্যুর পরিস্থিতি এক ছিল না, আর প্রতিটি ঘটনার পূর্ণ তদন্তের তথ্যও ওই পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় না। কিন্তু এতগুলো মৃত্যুর পরও কেন প্রতিটি সন্দেহজনক ঘটনা নিয়ে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা যায় না—সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মরদেহের সঙ্গে দেশে আসে নানা অসংগতি, পরিবারের অভিযোগ, আর্তনাদ ও জবাবহীন প্রশ্ন। কোনো পরিবার জানতে চায়, তাদের মেয়ের মৃত্যু সত্যিই আত্মহত্যা ছিল কি না। কেউ শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখানোর দাবি করে। কেউ মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও দীর্ঘদিন মরদেহের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে বিদেশের মাটিতে আইনি লড়াই চালানো অত্যন্ত কঠিন। ভাষা, অর্থ, নথিপত্র, কূটনৈতিক সহায়তা এবং বিদেশের বিচারব্যবস্থা—সব মিলিয়ে ন্যায়বিচার অনেকের কাছে প্রায় অসম্ভব এক গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।
২০১৯ সালের নভেম্বরে আল জাজিরার প্রতিবেদনে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির কর্মকর্তাও অভিযোগ করেছিলেন, নির্যাতিত নারী শ্রমিকদের ঘটনায় সৌদি নিয়োগকর্তাদের শাস্তি পাওয়ার নজির তিনি খুঁজে পাননি। এটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য—সৌদি আরবের সব মামলার বিচারিক পরিসংখ্যান নয়। তবু এমন বক্তব্যই দেখিয়ে দেয়, অভিযোগের তদন্ত ও জবাবদিহির বিষয়ে কতটা গভীর উদ্বেগ জমে আছে।
ন্যায়বিচার কি শুধু দুর্বলদের জন্য কঠোর?
সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা শরিয়াহভিত্তিক আইন ও বিচারিক বিবেচনার কথা বলে। মক্কার সাম্প্রতিক ঘটনায় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আদালত ‘তাআজির’ বা বিচারিক বিবেচনাধীন শাস্তির আওতায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। সরকার বলেছে, অভিযোগের গুরুত্ব এবং সময় ও স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ন্যায়বিচারের আসল পরীক্ষা কেবল কত কঠোর শাস্তি দেওয়া হলো, তা নয়। আসল পরীক্ষা হলো—আইন কি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর? ক্ষমতাবান নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হয় কি না? বিদেশি শ্রমিকের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয় কি না? যৌন নির্যাতনের শিকার নারী নিরাপদে অভিযোগ জানাতে পারেন কি না? অভিযুক্তের পরিচয় বা অর্থনৈতিক অবস্থান কি বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে?
যদি কোনো অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিজের আইন প্রয়োগে এতটা দৃঢ় হয়, তাহলে একজন অসহায় নারী শ্রমিকের ওপর যৌন নির্যাতন, মারধর, জোরপূর্বক আটকে রাখা কিংবা বেতন আত্মসাতের অভিযোগেও একই রকম গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা উচিত। অপরাধের ধরন আলাদা হতে পারে, শাস্তিও আইন অনুযায়ী আলাদা হবে; কিন্তু অভিযোগকারীর নাগরিকত্ব, লিঙ্গ, সম্পদ বা সামাজিক অবস্থানের কারণে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব কমে যাওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলা সহজ। কঠোর শাস্তির ঘোষণা দেওয়াও সহজ। কঠিন কাজ হলো ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা, দুর্বল মানুষের কথা শোনা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। সেই কাজেই রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান সবচেয়ে স্পষ্ট হয়।
এখানে আরেকটি সতর্কতা জরুরি। সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পূর্ণ বিচারিক নথি এখনো প্রকাশ্যে নেই। তবে বাংলাদেশের কনস্যুলেটকে বিচারপ্রক্রিয়া বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে জানানো হয়নি বলে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা গুরুতর কূটনৈতিক ও ন্যায়বিচারসংক্রান্ত প্রশ্ন তৈরি করে। একইভাবে নারী শ্রমিকদের প্রতিটি নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন—এমনও বলা যায় না। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারই হওয়া উচিত। এই মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র কি শুধু লাশ গ্রহণ করবে?
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। অসংখ্য বাংলাদেশি সেখানে কাজ করেন এবং পরিবারের ভরণপোষণের জন্য অর্থ পাঠান। দুই দেশের সম্পর্কের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্কের স্বার্থে নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন চাপা পড়ে থাকতে পারে না।
বাংলাদেশ সরকারের কাছে এখন শুধু দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সৌদি আরবের ব্যাখ্যা চাওয়াই যথেষ্ট নয়। জানতে হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, কী প্রমাণের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, বিচারপ্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কী ছিল এবং বাংলাদেশি মিশনকে কেন জানানো হয়নি। একই সঙ্গে সৌদি আরবে নির্যাতিত নারী শ্রমিকদের অভিযোগের অগ্রগতি, সন্দেহজনক মৃত্যুর তদন্ত এবং অভিযুক্তদের জবাবদিহির বিষয়েও নিয়মিত ও নির্দিষ্ট তথ্য চাইতে হবে।
বাংলাদেশকে এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে বিদেশে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ভুক্তভোগী নারী দ্রুত দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সহায়তা পান, নিরাপদ আশ্রয় পান, আইনি সহায়তা পান এবং তাঁর অভিযোগের পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারেন। মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে মরদেহ দেশে ফেরত পাঠানো এবং কাগজপত্র গ্রহণের পাশাপাশি স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের দাবিও তুলতে হবে। অভিযুক্ত নিয়োগকর্তা বা এজেন্ট বাংলাদেশের নাগরিক হোন কিংবা বিদেশি—অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকেই জবাবদিহির বাইরে রাখা উচিত নয়।
শুধু বিদেশে পাঠানোর সময় কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো, রেমিট্যান্সের হিসাব প্রকাশ করা কিংবা দেশে ফেরত আসা মরদেহ গ্রহণ করাকে দায়িত্বের সমাপ্তি ভাবলে চলবে না। শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।
শেষ প্রশ্নটি থেকেই যায়
মক্কার মসজিদে কথিত অনৈতিক কাজের অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে অভিযোগের প্রকৃতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত নেই, আর বাংলাদেশের কনস্যুলেট বলছে, তাদের আগে জানানো হয়নি। ফলে স্বচ্ছতা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্পূর্ণ যৌক্তিক।
অন্যদিকে, বছরের পর বছর ধরে সৌদি আরব থেকে নির্যাতিত নারী শ্রমিকদের ফিরে আসা, বেতন না পাওয়ার অভিযোগ, যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের বিবরণ এবং অসংখ্য নারীর মরদেহ দেশে ফেরার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচারের প্রশ্ন একদিনের নয়। এর উত্তরও শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করে পাওয়া যাবে না; দরকার তদন্ত, জবাবদিহি এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ।
যে আইন পবিত্রতা রক্ষার নামে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করতে পারে, সেই আইনের সামনে একজন অসহায় নারী শ্রমিকের কান্না কেন যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে না—এই প্রশ্নের জবাব সৌদি আরবকেও দিতে হবে, বাংলাদেশকেও। বিচার যেন কেবল দুর্বল মানুষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোরতার প্রদর্শনী না হয়; বিচার হোক সত্য উদ্ঘাটনের, অপরাধীর জবাবদিহির এবং প্রতিটি মানুষের মর্যাদা রক্ষার ব্যবস্থা।
কারণ ন্যায়বিচারের মূল্য কেবল অপরাধীর শাস্তিতে নয়, নির্যাতিত মানুষের সুরক্ষায়ও। আর যে রাষ্ট্র দুর্বল মানুষের আর্তনাদ শুনতে পায় না, তার আইনের কঠোরতা যতই প্রচার করা হোক, ন্যায়বিচারের পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা, আল জাজিরা, দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম




