সংবাদপত্র ও বিবিসিতে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার বিকাশে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ২৪ ঘণ্টার সংবাদপ্রবাহ, ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদসেবা এবং সূত্রের স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে। ৫৯ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণে দেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতা হারাল এক গুরুত্বপূর্ণ পথিকৃৎকে।
ঢাকা | ৩ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের পরিচিত মুখ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী আর নেই। ২ অক্টোবর শুক্রবার লন্ডনের সেন্ট বার্থোলোমিউস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর ১ অক্টোবর রাতে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্থানীয় সময় ২ অক্টোবর বেলা ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা অবস্থায় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জানিয়েছে পরিবার।
তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম হারাল এমন একজন সম্পাদককে, যাঁর কর্মজীবনের বড় অংশ জুড়ে ছিল সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টা। সংবাদপত্র, আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম এবং ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদসেবায় কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতাকে একটি পূর্ণাঙ্গ পেশাদার কাঠামোয় দাঁড় করানোর উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন। তাঁর নাম তাই শুধু একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নয়, দেশের সংবাদপ্রবাহের প্রযুক্তিগত ও পেশাগত রূপান্তরের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
সংবাদপত্র থেকে সাংবাদিকতার বিস্তৃত পরিসরে
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতা-জীবনের সূচনা ১৯৮৯ সালে, ঢাকার সানডে এক্সপ্রেস পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা শেষে তিনি সংবাদপেশায় যুক্ত হন। পরে দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কূটনীতি, রাজনীতি, বাণিজ্য ও অর্থনীতিসহ নানা বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরির অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।
১৯৯১ সালে দ্য ডেইলি স্টার-এ কূটনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে কাজ শুরু করেন খালিদী। ১৯৯৩ সালে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এ যোগ দিয়ে জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ও সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে আবার দ্য ডেইলি স্টার-এ ফিরে ব্যবসা ও অর্থনীতি বিভাগের প্রধান, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক এবং সাপ্তাহিক সংস্করণের বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে সম্পাদনা ও সংবাদ পরিকল্পনা—সাংবাদিকতার বিভিন্ন স্তরে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত দক্ষতাকে বিস্তৃত করে।
২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৫ সালের জুন পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যের বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ করেন। সেখানে সংবাদ ও সাম্প্রতিক ঘটনাবিষয়ক অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও উপস্থাপনার পাশাপাশি আলোচিত ‘ডিবেট’ অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বও পালন করেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে সংবাদ নির্বাচন, তথ্য যাচাই, সম্পাদনা এবং বিভিন্ন মতের প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে আরও বিস্তৃত ধারণা দেয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলার কাজে এসব অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০০৬ সালে অনলাইন সাংবাদিকতায় নতুন অধ্যায়
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্য সংবাদমাধ্যমে খবর সরবরাহ করত। তখন দেশের সংবাদ সংস্থাগুলোর বড় অংশ প্রচলিত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদ সরবরাহ ছিল নতুন উদ্যোগ।
২০০৬ সালে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ২৩ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন সংবাদমাধ্যম হিসেবে ২৪ ঘণ্টার সংবাদপ্রবাহ শুরু করে। বাংলাদেশের সংবাদপাঠের অভ্যাসে এটি ছিল উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। আগে পাঠককে পরদিনের সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশনের পরবর্তী সংবাদ বুলেটিনের অপেক্ষা করতে হতো। অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিকাশের ফলে দিনের যেকোনো সময় ইন্টারনেটে সর্বশেষ খবর জানার সুযোগ তৈরি হয়।
এই পরিবর্তন শুধু সংবাদ প্রকাশের গতি বাড়ায়নি; সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা, প্রকাশ এবং পাঠকের কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকেও নতুনভাবে সাজিয়েছে। একটি সচল অনলাইন বার্তাকক্ষ পরিচালনা, দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খবর হালনাগাদ করা এবং একই সঙ্গে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। খালিদীর নেতৃত্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর এই নতুন সংবাদধারার অন্যতম পরিচিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
দ্রুততার পাশাপাশি সূত্রের স্বচ্ছতা
অনলাইন সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো দ্রুত সংবাদ প্রকাশ। তবে দ্রুততার সঙ্গে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও থাকে। এ কারণে সংবাদ কত দ্রুত প্রকাশিত হলো, তার পাশাপাশি তথ্য কোথা থেকে পাওয়া গেল এবং তা কতটা যাচাই করা হয়েছে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী সম্পাদিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের সংবাদচর্চায় তথ্যসূত্রের নাম উল্লেখ এবং যাচাই করা তথ্য প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। তাঁর সম্পাদনাগত দৃষ্টিভঙ্গিতে সংবাদ ও মতামতের পার্থক্য বজায় রাখা এবং সংবাদকে নির্দিষ্ট পক্ষের প্রচারের মাধ্যম হতে না দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে কোনো সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা কেবল তার নিজের দাবি দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। তা যাচাই করতে হয় প্রতিবেদনের যথার্থতা, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, ভুল হলে সংশোধনের ব্যবস্থা এবং ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে একই পেশাগত মানদণ্ড প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না—এসবের ভিত্তিতে। এই বিবেচনায় সূত্রের স্বচ্ছতা ও তথ্য যাচাইয়ের ওপর জোর দেওয়া তাঁর রেখে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত শিক্ষার অংশ।
সংবাদসেবায় নতুন উদ্যোগ
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিল আরও কিছু নতুন উদ্যোগ। শিশুদের জন্য বাংলা ভাষার ওয়েবসাইট ‘কিডজ’ চালু করা হয়। ইউনিসেফের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে শিশুদের অংশগ্রহণে সংবাদ তৈরির প্ল্যাটফর্ম ‘হ্যালো’ গড়ে ওঠে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের জন্য সংবাদ ও সাংবাদিকতার একটি আলাদা পরিসর তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল।
মোবাইল ফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে সংবাদ পাঠানোর ব্যবস্থাও চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। স্মার্টফোন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সর্বব্যাপী হওয়ার আগে মোবাইল ফোনকে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা ছিল সময়োপযোগী উদ্যোগ। আজকের পাঠকের কাছে মুহূর্তে সংবাদ পাওয়া স্বাভাবিক মনে হলেও সেই ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে ধাপে ধাপে। বিডিনিউজের এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের ডিজিটাল সংবাদসেবার পরিবর্তনের ইতিহাসের অংশ।
আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বীকৃতি
ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের বিকাশে অবদানের জন্য তৌফিক ইমরোজ খালিদী আন্তর্জাতিক পরিসরেও স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সাউথ-টু-সাউথ মিডিয়া ডায়ালগে এশিয়া-প্যাসিফিক, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ১৪ জন ডিজিটাল মিডিয়া উদ্ভাবকের একজন হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবসে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।
২০১৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তিনি। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নেন। জার্মানির বন শহরে গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ রাইজিং’ সম্মেলনেও অংশ নেন তিনি। সাংবাদিকতার পাশাপাশি অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা পর্যালোচনা ও প্রণয়নের জন্য গঠিত জাতীয় কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করেন।
এসব অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত পরিসরকে শুধু সংবাদ সম্পাদনা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সীমাবদ্ধ রাখেনি। গণমাধ্যমের নীতি, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনাতেও তাঁকে যুক্ত রেখেছিল।
চাপের মুখে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্ন
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের পথচলা সব সময় মসৃণ ছিল না। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব প্রতিবেদনে পুরোনো সংবাদ সরাতে অস্বীকৃতি জানানোর পর একাধিক মামলার মুখে পড়ার কথা বলা হয়েছে। প্রধান সম্পাদক হিসেবে খালিদীও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হন। বিডিনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়।
২০১৮ সালে একটি প্রতিবেদনে সেনাপ্রধানের ভাইয়ের পরিচয় উল্লেখ করার পর ওয়েবসাইটটি কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ওয়েবসাইটটি প্রায় এক মাস বন্ধ থাকার কথাও সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব ঘটনার ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য আলাদা হতে পারে। তবে ঘটনাগুলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনি চাপ এবং সংবাদ প্রকাশের অধিকার নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে চলমান আলোচনার অংশ।
একটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু মালিকানা বা সম্পাদকীয় ঘোষণার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের নিরাপত্তা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, আইনি প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা এবং ভুল হলে তা সংশোধনের সক্ষমতা। খালিদীর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এসব প্রশ্নকে সামনে আনে।
সহকর্মীদের স্মৃতিতে একজন সম্পাদক
তাঁর মৃত্যুর পর সহকর্মী ও সাংবাদিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে। চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন তাঁকে অনলাইন গণমাধ্যমের বিকাশে অবদান রাখা এবং আপসহীন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণ করেছে। সংগঠনটির শোকবার্তায় বলা হয়, তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা-জীবন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিকাশে অবদান সাংবাদিক সমাজ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে তাঁর সম্পাদনাগত অবস্থান, তথ্য যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে পরিণত করার প্রচেষ্টার কথা উঠে এসেছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘস্থায়ী পরিচয় একজন সম্পাদকের ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি নির্ভর করে তার প্রতিবেদক, সম্পাদক, প্রযুক্তিবিদ ও অন্যান্য কর্মীর সম্মিলিত কাজের ওপর। সেই কারণে খালিদীর উত্তরাধিকার মূল্যায়নের সময় তাঁর সহকর্মীদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ।
দায়িত্ব হস্তান্তরের যে ইচ্ছা পূরণ হলো না
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ১৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে খালিদী জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পর তিনি তরুণ ও দক্ষ সহকর্মীদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিতে চান। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকেরা প্রতিষ্ঠানটিকে পরবর্তী বহু বছর এগিয়ে নিয়ে যাবেন।
একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের বড় দায়িত্ব শুধু প্রতিদিনের সংবাদ প্রকাশ নিশ্চিত করা নয়; পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি করা, সম্পাদনাগত নীতি প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই নীতিকে ব্যক্তিনির্ভরতা থেকে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত করাও জরুরি। খালিদীর মৃত্যুতে দায়িত্ব হস্তান্তরের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই তাঁর পথচলা থেমে গেল।
এখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের সামনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও সম্পাদনাগত মানদণ্ডকে ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখা। সংবাদ যাচাই, সূত্রের স্বচ্ছতা, ভুল সংশোধন, পেশাগত স্বাধীনতা এবং কর্মীদের দক্ষতা বিকাশ—এসব ক্ষেত্রেই ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
পথিকৃতের প্রকৃত উত্তরাধিকার
তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে মূল্যায়ন করতে গেলে শুধু তাঁর পদবি কিংবা একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠানের সাফল্যের দিকে তাকালে চলবে না। দেখতে হবে, বাংলাদেশের সংবাদপ্রবাহে কী ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত। ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদপ্রকাশকে পেশাদার কাঠামোয় দাঁড় করানো, ২৪ ঘণ্টার বার্তাকক্ষ পরিচালনা, মোবাইল ফোনে সংবাদ পৌঁছে দেওয়া, শিশুদের জন্য আলাদা সংবাদপ্ল্যাটফর্ম চালু করা এবং তথ্যসূত্রের স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব—এসব তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য দিক।
তবে ডিজিটাল সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ শুধু দ্রুততার ওপর নির্ভর করে না। পাঠকের আস্থা ধরে রাখতে প্রয়োজন নির্ভুলতা, প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন, অভিযোগের ক্ষেত্রে সব পক্ষের বক্তব্য, ভুল হলে দ্রুত সংশোধন এবং সংবাদ ও মতামতের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য। প্রযুক্তি বদলাবে, সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস বদলাবে, নতুন প্ল্যাটফর্ম আসবে; কিন্তু এসব পেশাগত দায়িত্ব বদলাবে না।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কর্মজীবন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার পরিবর্তনশীল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংবাদধারার মূল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে সেই ধারার প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে, নির্ভরযোগ্যভাবে ও জবাবদিহির সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করতে পারে, তার ভিত্তিতে। তাঁর প্রতি দীর্ঘস্থায়ী শ্রদ্ধা জানানোর অর্থ হবে—সংবাদকে তথ্যনির্ভর, দায়িত্বশীল ও জনস্বার্থমুখী রাখার এই পেশাগত অঙ্গীকারকে বাস্তবে ধরে রাখা।
৫৯ বছরের জীবনে তৌফিক ইমরোজ খালিদী রেখে গেলেন বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর পথচলা থেমেছে, কিন্তু যে সংবাদজগৎ গড়ে তোলার কাজে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তার সামনে এখন সেই কাজের মান, স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ২৪, প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, বাসস




