বিলি জেন, জন লোভিৎজ, রবার্ট ডাভি ও জেইমি কিং অভিনীত সিনেমাটি ১৯৮০-এর দশকের মার্কিন অপরাধজগতের সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত; আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন কাজ নিয়ে হাজির বাংলাদেশি-আমেরিকান নির্মাতা
শোবিজ টুডে ডেস্ক
হলিউডের পরিচিত তারকাদের এক সিনেমায় একত্র করেছেন বাংলাদেশি-আমেরিকান নির্মাতা আসিফ আকবর। তাঁর নতুন ক্রাইম-ড্রামা ‘রিডেম্পশন’-এর বিশ্ব প্রিমিয়ার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে। ১৯৮০-এর দশকের মার্কিন অপরাধজগতের সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন ‘টাইটানিক’খ্যাত বিলি জেন, জন লোভিৎজ, রবার্ট ডাভি, জেইমি কিং, ফ্র্যাঙ্ক স্ট্যালোন ও ওয়েস্টন কেজ কপোলার মতো পরিচিত শিল্পীরা।
গত ১ অক্টোবর লাস ভেগাসের সাহারা রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোর পুলসাইডে বসে সিনেমাটির বিশ্ব প্রিমিয়ারের আয়োজন। রেড কার্পেট, সরাসরি সংগীত পরিবেশনা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং প্রদর্শনী-পরবর্তী প্রশ্নোত্তর পর্বে সাজানো হয়েছিল অনুষ্ঠানটি। এতে অংশ নেন সিনেমার পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীরা। বিশ্ব প্রিমিয়ারের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে হাজির হয়েছে আসিফ আকবরের নতুন এই চলচ্চিত্র।
হলিউডের পরিচিত মুখদের উপস্থিতিতে আয়োজনটি ঘিরে তৈরি হয় বাড়তি আগ্রহ। তবে তারকাদের উপস্থিতির পাশাপাশি সিনেমাটির গল্প, অপরাধজগতের পটভূমি এবং মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পরিণতি—এসব বিষয়ও ‘রিডেম্পশন’কে আলোচনায় এনেছে।
এক সিনেমায় হলিউডের পরিচিত তারকারা
‘রিডেম্পশন’-এর প্রিমিয়ারে উপস্থিত ছিলেন সিনেমাটির একাধিক অভিনয়শিল্পী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিলি জেন, জন লোভিৎজ, রবার্ট ডাভি, জেইমি কিং, ফ্র্যাঙ্ক স্ট্যালোন ও ওয়েস্টন কেজ কপোলা। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন জন লেমন। গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি চরিত্রে রয়েছেন নিকোলাস পেত্রোচিওনে।
বিলি জেন বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান জেমস ক্যামেরনের অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘টাইটানিক’-এ ক্যালেডন হকলির চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। জন লোভিৎজ দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের কৌতুকাভিনেতা হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, রবার্ট ডাভি ‘লাইসেন্স টু কিল’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। জেইমি কিংয়ের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘সিন সিটি’, আর ফ্র্যাঙ্ক স্ট্যালোন ‘রকি’ চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি অভিনয় ও সংগীতেও কাজ করেছেন।
বিভিন্ন ঘরানার চলচ্চিত্রে কাজ করা এসব শিল্পীকে একই গল্পে নিয়ে এসেছেন আসিফ আকবর। প্রিমিয়ারে রেড কার্পেট আয়োজনের পর সিনেমাটি প্রদর্শিত হয়। পরে দর্শকদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীরা। এ ধরনের আয়োজন নির্মাতাদের জন্য সিনেমার পেছনের ভাবনা, চরিত্র নির্মাণ ও অভিনয়ের অভিজ্ঞতা দর্শকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে।
অপরাধজগতের অন্ধকারে এক তরুণের গল্প
‘রিডেম্পশন’-এর গল্পের কেন্দ্রে লিও রুসো নামের এক তরুণ। ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ও লাস ভেগাসের সংগঠিত অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সে। একসময় নিজের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু জোনাথনের সঙ্গে লিও প্রবেশ করে এমন এক জগতে, যেখানে অর্থ ও ক্ষমতার আকর্ষণের পাশাপাশি রয়েছে সহিংসতা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং বিপদের স্থায়ী ছায়া।
অপরাধজগতের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর লিওর সামনে তৈরি হয় নানা সংকট। একদিকে বন্ধুত্ব ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অন্যদিকে অপরাধী চক্রের প্রতি আনুগত্য—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নৈতিক অবস্থান ধরে রাখার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয় তাকে।
সিনেমাটিতে তাই শুধু অপরাধের ঘটনা বা সংঘাত নয়, মানুষের সিদ্ধান্ত, তার পরিণতি এবং ভুল পথ থেকে ফিরে আসার সম্ভাবনাও গুরুত্ব পেয়েছে। ‘রিডেম্পশন’ শব্দটির অর্থ প্রায়শ্চিত্ত, মুক্তি বা ভুলের পর নিজেকে সংশোধনের সুযোগ। সিনেমার নামের মধ্যেও গল্পের এই নৈতিক দিকটির ইঙ্গিত রয়েছে।
তবে বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় নির্মিত হলেও সিনেমাটি একটি নাট্যধর্মী কাহিনিচিত্র। বাস্তব ঘটনা ও চরিত্রের সঙ্গে গল্পের কোন কোন অংশ সরাসরি সম্পর্কিত, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ছাড়া একে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার হুবহু পুনর্নির্মাণ বলা যায় না।
পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্যও লিখেছেন আসিফ
‘রিডেম্পশন’-এর পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্যও লিখেছেন আসিফ আকবর। অপরাধ, রহস্য ও অ্যাকশনধর্মী গল্প নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। এর আগে ‘দ্য কমান্ডো’, ‘এমআর-৯: ডু অর ডাই’ এবং ‘বোনইয়ার্ড’-এর মতো চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন তিনি।
‘বোনইয়ার্ড’-এও অপরাধ ও তদন্তনির্ভর গল্প তুলে ধরেছিলেন এই নির্মাতা। নতুন সিনেমা ‘রিডেম্পশন’-এও সংগঠিত অপরাধের জগৎকে পটভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। তবে এবারের গল্পে অপরাধের সংঘাতের পাশাপাশি বন্ধুত্ব, পরিবার ও নৈতিক সিদ্ধান্তের দিকটিও গুরুত্ব পেয়েছে।
পরিচালক হিসেবে একটি সিনেমার গল্প, অভিনয়, দৃশ্যায়ন ও সম্পাদনার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। আর চিত্রনাট্যকার হিসেবে গল্পের চরিত্র, দ্বন্দ্ব ও পরিণতি নির্মাণের দায়িত্বও থাকে তাঁর ওপর। ‘রিডেম্পশন’-এ দুই দায়িত্বই পালন করেছেন আসিফ। হলিউডের পরিচিত অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী একটি ক্রাইম-ড্রামা নির্মাণের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের চলচ্চিত্রযাত্রায় আরেকটি অধ্যায় যোগ করলেন।
প্রিমিয়ারের পর সামনে উৎসব ও মুক্তির পরিকল্পনা
লাস ভেগাসে বিশ্ব প্রিমিয়ারের পর ‘রিডেম্পশন’ বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রেক্ষাগৃহ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুক্তির পথেও এগোবে সিনেমাটি। তবে এর আন্তর্জাতিক মুক্তির নির্দিষ্ট তারিখ, পরিবেশক কিংবা কোন কোন দেশে প্রথমে প্রদর্শিত হবে—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ একটি সিনেমার জন্য আন্তর্জাতিক দর্শক ও সমালোচকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুক্তির ক্ষেত্রে দর্শকের আগ্রহ, পরিবেশনা কৌশল এবং প্রচারণাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ‘রিডেম্পশন’-এর বিশ্ব প্রিমিয়ারকে সিনেমাটির আন্তর্জাতিক যাত্রার সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে; এর পরবর্তী সাফল্য নির্ভর করবে দর্শক-সমালোচকের প্রতিক্রিয়া ও মুক্তির ফলাফলের ওপর।
আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্মাতার নতুন কাজ
আসিফ আকবরের ‘রিডেম্পশন’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সরাসরি প্রযোজনা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নির্মিত একটি কাজ। তবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন নির্মাতা হিসেবে তাঁর আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের দর্শকদের জন্যও আগ্রহের বিষয়। বিশেষ করে হলিউডের পরিচিত অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে সেটির প্রিমিয়ার আয়োজন তাঁর কাজকে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে একজন নির্মাতার পরিচিতি গড়ে ওঠে ধারাবাহিক কাজ, গল্প বলার নিজস্বতা, নির্মাণের মান এবং দর্শকের সাড়ার মধ্য দিয়ে। তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী তালিকা একটি সিনেমার প্রতি প্রাথমিক আগ্রহ তৈরি করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গল্প ও নির্মাণের শক্তিই দর্শকের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে।
লাস ভেগাসের রেড কার্পেট থেকে শুরু হওয়া ‘রিডেম্পশন’-এর যাত্রা এখন কোন দিকে এগোয়, সেটিই দেখার বিষয়। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, প্রেক্ষাগৃহ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সিনেমাটির পরবর্তী উপস্থিতি নির্ধারণ করবে এটি কতটা বিস্তৃত দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে। আর সেই যাত্রার মধ্য দিয়েই আরও স্পষ্ট হবে, হলিউডের পরিচিত তারকাদের নিয়ে আসিফ আকবরের এই নতুন কাজ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে কতটা জায়গা করে নিতে পারে।
তথ্যসূত্র




