সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির নামে সাইনবোর্ড; বরাদ্দ ও রেজিস্ট্রির দাবি সমিতির, দখলচেষ্টার অভিযোগ রাড্ডার—মামলায় হানিফ মিয়াসহ ২০০–২৫০ জন
ঢাকা | TODAY TV BD | বিশেষ প্রতিবেদন
রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতে হামলা, লুটপাট ও ভারী যন্ত্র দিয়ে পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এখন সামনে এসেছে প্রায় ১০ কাঠা জমির দীর্ঘদিনের বিরোধ। ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে মুখোশধারী দুই শতাধিক ব্যক্তি কেন্দ্রে ঢুকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানোর পর একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবন ভেঙে ফেলে। যাওয়ার আগে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়। রাড্ডা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জমি দখলের উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এই হামলা হয়েছে। অন্যদিকে, ওই সমবায়ের পক্ষ থেকে জমিটি তাদের বরাদ্দ ও নিবন্ধিত সম্পত্তি বলে দাবি করা হচ্ছে।
কী ঘটেছিল সেই রাতে?
রাড্ডা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ও মামলার এজাহার অনুযায়ী, রাত ১২টার দিকে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি দা, হাতুড়ি, লাঠিসোঁটাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে কেন্দ্রের সীমানাপ্রাচীর টপকে ঢোকে। দুই নিরাপত্তাকর্মী আন্দ্রিয় সরকার ও আবদুল হাইকে মারধর করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তারা কেন্দ্রের বিভিন্ন কক্ষ ভাঙচুর করে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন ও নগদ টাকা নিয়ে যায়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি এনে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবন ভেঙে ফেলা হয়।
রাড্ডার অভিযোগ, লুট হওয়া সামগ্রীর মধ্যে ছিল সরকারি ইপিআই টিকা ও টিকাদানের রেজিস্টার, পরিবার পরিকল্পনার সরঞ্জাম, ওষুধ, প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নগদ, প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, ফ্রিজ, এসি, সিসিটিভি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম ও বিভিন্ন আসবাব। ক্ষতির মোট অঙ্ক নিয়ে রাড্ডার দেওয়া হিসাবেও কিছু পার্থক্য আছে—এক জায়গায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং অন্য বিবৃতিতে দেড় কোটি টাকার বেশি ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।
কেন ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র সাইনবোর্ড?
ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানেই। হামলার পর সেন্টারের সামনে যে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়, সেখানে দাবি করা হয়—জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ ও রেজিস্ট্রির মাধ্যমে ১০ কাঠা প্লটটির মালিক ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’। ঘটনাস্থলে প্রথম আলোও ওই বক্তব্যসংবলিত সাইনবোর্ড দেখেছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতারের বক্তব্য, পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে সমমনা সমবায় সমিতির নামে কিছু ব্যক্তি ওই জমি দখলের চেষ্টা করে আসছিলেন। ২০২২ সালেও একই ধরনের চেষ্টা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল জমিটি দখলে নেওয়া।
অন্যদিকে, The Business Standard-এর প্রতিবেদনে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির পক্ষের বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, জমিটি ২০০৬ সালে তাদের নামে বরাদ্দ হয় এবং ২০২১ সালে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের নামে নিবন্ধিত হয়। সমিতির দাবি, পরে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ওই জমিতে থাকা দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য চিঠিও দিয়েছিল। তবে এসব বরাদ্দ, নিবন্ধন ও উচ্ছেদ-সংক্রান্ত মূল নথি প্রকাশ্য অনলাইন উৎসে স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অর্থাৎ, একই জমি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাড্ডা বলছে, তারা সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে এবং তাদের আগে কোনো সরকারি উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হয়নি। সমবায় পক্ষ বলছে, জমিটির বৈধ বরাদ্দ ও নিবন্ধন তাদের নামে। এই বিরোধের চূড়ান্ত আইনি অবস্থান নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিল ও আদালতের নথি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
পুরোনো বিরোধ কতটা বড়?
প্রথম আলোর অনুসন্ধান অনুযায়ী, স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দা, দোকানি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। জায়গাটি নিয়ে মামলা হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। তবে কোন মামলায় কারা পক্ষ, মামলার বর্তমান অবস্থা কী এবং আদালত কোনো পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে কী আদেশ দিয়েছেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নথি ওই প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।
স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রথম আলো আরও জানিয়েছে, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সঙ্গে যুক্ত একটি পক্ষকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নেতৃত্বাধীন পক্ষ হিসেবে স্থানীয়ভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে ফেরদৌসী আহমেদ নিজে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সঙ্গে তাঁর নাম থাকলেও ভাঙচুরের ঘটনায় তিনি জড়িত নন এবং মামলার তদন্ত আইন অনুযায়ী হওয়া উচিত।
এখানে আরেকটি নাম এসেছে—হানিফ মিয়া। রাড্ডার দায়ের করা মামলায় তাঁকে নামীয় আসামি করা হয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। শাহ আলী থানার পুলিশও মামলায় তাঁর নাম থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে হানিফ মিয়া তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন এবং সেখানে কী হয়েছে সেটিও জানেন না।
ফলে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলার সঙ্গে কারা মাঠপর্যায়ে সরাসরি যুক্ত ছিল, কে বা কারা ভারী যন্ত্রপাতি এনেছিল, সমবায়টির হয়ে কারা সাইনবোর্ড টাঙিয়েছিল এবং নির্দেশদাতা কারা—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত ছাড়া বলা যাচ্ছে না।
রাড্ডার জমির অধিকার নিয়ে আরেক দাবি
রাড্ডা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার জন্য কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটেও ১৯৭৪ সালে রাড্ডা বার্নেনের উদ্যোগে মিরপুরে কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরুর কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা এবং শিশুদের টিকাদানসহ বিভিন্ন সেবা দেয়।
রাড্ডার কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি চুক্তির ভিত্তিতে ১৯৭৬ সাল থেকে তারা ওই এলাকায় সেবা দেওয়ার অধিকার পেয়ে আসছেন। তাঁদের দাবি, কেন্দ্রটি যতদিন রাড্ডা পরিচালনা করতে চায়, ততদিন জমি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সেই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে এই বক্তব্যের সমর্থনে মূল চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সমবায় পক্ষের দাবি—তাদের নামে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ ও নিবন্ধন রয়েছে। ফলে বিরোধটি শুধু দখলকে কেন্দ্র করে নয়, বরং জমিটির বৈধ অধিকার ও ব্যবহারের ভিত্তি কী ছিল—সেই প্রশ্নেও দুই পক্ষের অবস্থান পরস্পরবিরোধী।
হামলার সময় পুলিশ কোথায় ছিল?
রাড্ডা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলার খবর পেয়ে পুলিশকে জানানো হয়েছিল এবং পুলিশ এসে সবাইকে সরিয়ে দেবে বলে আশ্বস্ত করেছিল। তাদের অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও পুরো স্থাপনা রক্ষা করা যায়নি।
অন্যদিকে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছিল এবং ঘটনার পর মামলা হয়েছে। এখন তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিও বন্ধ
স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; এর সঙ্গে একটি চলমান সরকারি টিকাদান কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রাড্ডা কেন্দ্রে ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে সরকারি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হামলার পর কেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওই কর্মসূচিসহ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে রাড্ডা ও সমকাল জানিয়েছে।
রাড্ডার কর্মকর্তাদের হিসাবে, প্রতিদিন গড়ে চার শতাধিক মানুষ সেখানে সেবা নিতেন। ফলে জমি নিয়ে বিরোধের সঙ্গে এখন সরাসরি জনস্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
এখন যেসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে দরকার
ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো হলো—সমবায় সমিতির কথিত বরাদ্দ ও ২০২১ সালের নিবন্ধনের নথি আসলে কী; জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ কোনো উচ্ছেদ নোটিশ দিয়েছিল কি না; রাড্ডার সঙ্গে সরকারের চুক্তির আইনি অবস্থান কী; জমিটি নিয়ে আগের মামলা থাকলে তার রায় বা আদেশ কী; রাতের হামলায় ভারী যন্ত্রপাতি ও এত সংখ্যক লোক কীভাবে সেখানে পৌঁছাল; কারা তাঁদের সংগঠিত করেছিল; মামলায় নাম থাকা হানিফ মিয়ার সঙ্গে হামলাকারীদের কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল কি না; এবং স্থানীয় সূত্রে ফেরদৌসী আহমেদকে যে পক্ষটির সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, সেই দাবির পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে।
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তাধীন। ফলে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে হামলার চূড়ান্ত নির্দেশদাতা বা অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করার মতো পর্যাপ্ত সরকারি বা আদালতভিত্তিক প্রমাণ এই মুহূর্তে প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। মামলার তদন্ত, জমির মূল দলিল, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নথি এবং সংশ্লিষ্ট পুরোনো মামলার রেকর্ডই এই বিরোধের প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার করতে পারে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS), সমকাল, বাংলা ট্রিবিউন, ইউএনবি (UNB) এবং রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নিজস্ব ওয়েবসাইট।




