Homeনাগরিক দর্পণইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে কীভাবে বিশ্বে পৌঁছেছিল জুলাইয়ের রক্তাক্ত চিত্র

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে কীভাবে বিশ্বে পৌঁছেছিল জুলাইয়ের রক্তাক্ত চিত্র

ভিস্যাট লাইন, সীমিত কম্পিউটার আর সাংবাদিকদের রেশনিং—শফিকুল আলমের ভাষ্যে ২০২৪ সালের সেই কয়েকটি দিন

ঢাকা | TODAY TV BD | বিশেষ প্রতিবেদন

২০২৪ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি বাংলাদেশ যখন দফায় দফায় ইন্টারনেট শাটডাউনে অন্ধকারে ডুবে যায়, তখন দেশটি কার্যত বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রাজধানী থেকে জেলা শহর—সর্বত্র খবর, ছবি ও ভিডিও পাঠানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক সেই সময় ঢাকার একটি সাংবাদিকতা অফিসে ভিস্যাট-নির্ভর বিকল্প সংযোগের মাধ্যমে বাইরে যেতে থাকে বাংলাদেশের ভেতরের দৃশ্য। আর সেই কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তৎকালীন এএফপির বাংলাদেশ ব্যুরো চিফ শফিকুল আলম।

শফিকুল আলমের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৭ জুলাইয়ের পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা টের পান, দেশজুড়ে শুধু তথ্যপ্রবাহ নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংগ্রহের স্বাভাবিক চ্যানেলও বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু ঢাকার ওই অফিসে একটি ভিস্যাট লাইন চালু থাকায় পুরো ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও সংযোগ ধরে রাখা সম্ভব হয়। পরে সেই লাইনই হয়ে ওঠে বহু দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের শেষ ভরসা।

অন্ধকারে খবর পাঠানোর একমাত্র জানালা

শফিকুল আলম জানান, প্রথমে তাঁরা পরিস্থিতি সামাল দিতে সোনারগাঁও হোটেলে রুম ভাড়া করেন, যাতে কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সুবিধা নিশ্চিত রাখা যায়। পরদিন অফিসে এসে তিনি দেখেন, দেশজুড়ে ইন্টারনেট নেই, কিন্তু তাঁদের অফিসে সংযোগ সচল। সেই সংযোগ ব্যবহার করেই শুরু হয় সংবাদ পাঠানোর এক ব্যতিক্রমী দৌড়।

তাঁর ভাষায়, বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রথম যোগাযোগ আসে রয়টার্স থেকে। এরপর ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা, এপি, ইএফইসহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশের শীর্ষ দৈনিকগুলোর প্রতিনিধিরাও সেখানে ভিড় করতে থাকেন। কারণ বাইরে তখন সহিংসতা, উত্তেজনা ও তথ্য-অভাব একসঙ্গে চলছিল। অন্যদিকে ছবি, ভিডিও আর রিপোর্ট পাঠানোর আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

পাঁচটা কম্পিউটার, প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক

শফিকুল আলমের বর্ণনায়, অফিসে ছিল মাত্র পাঁচটি কম্পিউটার। কিন্তু কাজ করতে এসেছিলেন প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক। তাই তাঁকে কার্যত একটি রেশনিং সিস্টেম চালু করতে হয়। কারও হাতে ১০ মিনিট, কারও হাতে ১৫ মিনিট—যে যার জরুরি ছবি, ভিডিও বা রিপোর্ট পাঠিয়ে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছেন পরের জনকে।

এই ছোট্ট অফিসটিই কয়েক দিন ধরে হয়ে ওঠে একধরনের অস্থায়ী আন্তর্জাতিক সংবাদকক্ষ। বাইরে তখন ভয়াবহ সংঘর্ষ, গুলি, হতাহত, কারফিউ আর যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার পরিবেশ। ভেতরে চলছে রিপোর্ট জমা, ফাইল আপলোড আর সংবাদ পাঠানোর নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ। শফিকুল আলমের মতে, এই দিনগুলো ছিল তার সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে চাপের, কিন্তু একই সঙ্গে সবচেয়ে গর্বের সময়।

রয়টার্সের ফোন, ঝুঁকির সিদ্ধান্ত

তিনি জানান, তখন রয়টার্সের এশিয়া চিফ সরাসরি যোগাযোগ করে জানতে চান, তারা অন্য সংবাদমাধ্যমকেও তাঁদের অফিসের ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেবে কি না। শফিকুল আলমকে বলা হয়, সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তাঁর; কাউকে সাহায্য করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে তবেই যেন তা করেন। কারণ আইনি বা নিরাপত্তাজনিত কোনো জটিলতা হলে তার দায়ও তাঁকেই নিতে হতে পারে।

সব ঝুঁকি জেনেও তিনি সাহায্য করতে রাজি হন। তাঁর যুক্তি ছিল, এমন সংকটে একা বসে সংযোগ ধরে রাখা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সাংবাদিকতার কাজই হলো সত্যকে বাইরে নিয়ে যাওয়া—আর সেটি একা একটি ডেস্কে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। এই মনোভাব থেকেই পরের কয়েক দিনে তার অফিসে একে একে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অসংখ্য সংবাদমাধ্যমের লোকজন আসতে থাকেন।

কারা এসেছিলেন, কী পাঠানো হয়েছিল

শফিকুল আলমের ভাষ্যে, ওই কয়েক দিনে শুধু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমই নয়, দেশের বড় বড় পত্রিকার প্রতিনিধিরাও এসে ভিড় করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, সমকালের সাংবাদিকরা। কেউ ছবি পাঠাচ্ছেন, কেউ ভিডিও, কেউ লিখিত রিপোর্ট। বাইরে থেকে আসছে ভয়াবহ সহিংসতার খবর, আর সেগুলোই দ্রুততম সময়ে আন্তর্জাতিক ডেস্কে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, এই সময়টাতে তাঁর সহকর্মীরা দিনরাত খেটে গেছেন। ফটোগ্রাফার, ভিডিও সাংবাদিক, ফ্যাক্ট-চেকিং টিম—সবাই একসঙ্গে কাজ করেছেন। সকাল ৬টায় অফিস খোলা হতো, আর কখনো কখনো রাত ১২টা বা ২টায় কাজ শেষ হতো। শারীরিক ক্লান্তি ছিল, মানসিক চাপ ছিল, তবু সবার লক্ষ্য একটাই—সংবাদ বাইরে যেতেই হবে।

চাপ, হুমকি আর নৈতিক অবস্থান

শফিকুল আলমের দাবি, এই কাজের জন্য তাঁদের ওপর চাপও আসছিল। সরকারের পক্ষ থেকে পরোক্ষ ইঙ্গিত ছিল যে, ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যে এমন সংযোগ রাখা ‘অবৈধ’ হতে পারে। আওয়ামীপন্থী কিছু সাংবাদিক নাকি তাঁকে ফোনে হুমকিও দেন। সরকারি ব্রিফিংয়েও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু তিনি মনে করেন, এসবের ওপর সাংবাদিকতার নৈতিক দায় অগ্রাধিকার পেয়েছিল।

তাঁর মতে, চোখের সামনে যখন হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নের ছবি আসছে, তখন সেগুলো বিশ্বকে না জানিয়ে বসে থাকা অসম্ভব ছিল। এ কারণেই তিনি একা বসে না থেকে সবাইকে সেই সংযোগ ব্যবহারের সুযোগ দেন। তাঁর চোখে, এটাই ছিল সত্যকে আটকে রাখা থেকে মুক্ত করার সঠিক পথ।

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পটভূমি

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বাংলাদেশে ব্যাপক ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটে, যা ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং দমন-পীড়নের মধ্যে দেশকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরে ২৪ জুলাই কিছু ব্রডব্যান্ড সংযোগ ফের চালু হয় এবং ২৮ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেটও আংশিকভাবে ফিরে আসে। তবে সেই সময় পর্যন্ত দেশজুড়ে তথ্যপ্রবাহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

এরপর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান—এ খবরও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সবার আগে যায়। সেই মুহূর্তে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটছে বলে খবরটি দ্রুত বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করে। শফিকুল আলমের নিজের বর্ণনায়, এই খবর ব্রেক করার পেছনেও জুলাইয়ের সেই যোগাযোগযুদ্ধের ভূমিকা ছিল।

সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়

শফিকুল আলমের এই অভিজ্ঞতা শুধু এক ব্যক্তির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক বিরল অধ্যায়। যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়, তখন একটি সাংবাদিকতা অফিস কীভাবে বিশ্বসংবাদে বাংলাদেশের বাস্তবতা পৌঁছে দিতে পারে—তারই উদাহরণ এই ঘটনা।

একই সঙ্গে এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, আধুনিক রাষ্ট্রে ইন্টারনেট আর শুধু প্রযুক্তি নয়; এটি তথ্য, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সংবাদপ্রবাহের অবিচ্ছেদ্য অবকাঠামো। জুলাইয়ের সেই দিনে তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের ভেতরের সত্যকে বাইরে পৌঁছাতে মানুষের নির্ভর করতে হয়েছে সাংবাদিকদের সাহস, কৌশল আর ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার ওপর।

এখন কী থেকে গেল

শফিকুল আলমের বর্ণনা জুলাইয়ের ব্ল্যাকআউটের ভেতর এক সাংবাদিকের নৈতিক সিদ্ধান্তের দলিল। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে আরও বড় প্রশ্নও উঠে আসে—রাষ্ট্র যখন তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করে, তখন সত্যকে বাইরে পৌঁছাতে কারা দায়িত্ব নেন? আর সেই দায়িত্ব নিতে গিয়ে সাংবাদিকদের কতটা ঝুঁকি বয়ে বেড়াতে হয়?

জুলাইয়ের সেই ছয়-সাত দিন তাই কেবল একটি সংবাদ-সংকট ছিল না; ছিল বাংলাদেশের গণমাধ্যম, তথ্যস্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের ওপর এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা।

তথ্যসূত্র: শফিকুল আলমের ২০২৬ সালের ১৯ জুলাই প্রকাশিত সাক্ষাৎকারভিত্তিক নিবন্ধ, Reuters-এর ১৮–২৯ জুলাই ২০২৪ সালের বাংলাদেশ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার খবর, AFP Showcase-এর ১৯ জুলাই ২০২৪-এর Bangladesh protests report, Al Jazeera-র ২৮ জুলাই ২০২৪-এর internet restoration report, Context News-এর ২৬ জুলাই ২০২৪-এর internet shutdown report.

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments