Homeনাগরিক দর্পণকবি সুফিয়া কামালের বড় ছেলে সাংবাদিক ও শিক্ষক শাহেদ কামাল আর নেই

কবি সুফিয়া কামালের বড় ছেলে সাংবাদিক ও শিক্ষক শাহেদ কামাল আর নেই

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষক, প্রবীণ সাংবাদিক এবং কবি সুফিয়া কামালের বড় ছেলে শাহেদ কামালের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীরা স্মৃতি, শ্রদ্ধা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন আবেগঘন ভাষায়।

ঢাকা | ৫ জুলাই ২০২৬

প্রবীণ সাংবাদিক, শিক্ষক এবং কবি সুফিয়া কামালের বড় ছেলে শাহেদ কামাল আর নেই। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বার্ধক্যজনিত সমস্যার পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক ও স্মৃতিচারণায় ভরে উঠেছে অনেকের টাইমলাইন। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন আবেগঘন ভাষায়।

সাবেক শিক্ষার্থী চ্যানেল আইয়ের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ খান লিখেছেন, শাহেদ কামাল ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যাঁকে বহু বছর ধরে শুধু শিক্ষক নয়, সাংবাদিকতার নীরব শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবেও দেখেছেন তাঁরা।

তিনি স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন—

“স্যারের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল কয়েক বছর আগে বন্ধু অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের বাসায়। একটা নৈশভোজে নিমন্ত্রণ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন তিনি। সাইকেলে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন। মাথায় কখনো চুল দেখিনি— চুল যে ছিল না তা নয়; তিনি নিয়মিত মাথা কামিয়ে রাখতেন।”

শাহেদ কামালকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা গল্প ও মিথ প্রচলিত ছিল। তাঁর এক সাবেক ছাত্রের ভাষায়, এসবের কিছু হয়তো গল্প, কিছু বাস্তবও ছিল।

স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে দুটি বিষয়। প্রথমত, তিনি প্রায়ই ক্লাস নিয়ে হঠাৎ বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে যেতেন। পরে আবার ফিরে এসে ক্লাস শুরু করলেও অনেকে জানতে পারতেন না। দ্বিতীয়ত, সংবাদ প্রতিবেদনের ইন্ট্রো নিয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। খুব কম ক্ষেত্রেই তিনি সন্তুষ্ট হতেন।

সেই সাবেক শিক্ষার্থী লিখেছেন—

“আমি সৌভাগ্যবানদের একজন। একনেক বৈঠকের একটি প্রতিবেদনের ইন্ট্রোতে তিনি টিক দিয়েছিলেন। আমি মজা করে অন্যদের বলতাম— আমি শাহেদ কামাল স্যার সার্টিফায়েড রিপোর্টার।”

১৯৫৭ সালে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন শাহেদ কামাল। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসে বার্তা সম্পাদক এবং পরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০১২ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন কঠোর, কিন্তু অহেতুক নয়; সংযমী, কিন্তু দূরেরও নন। সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের সরলতা— এই তিনের এক অনন্য মিশ্রণ ছিল তাঁর জীবন।

এক শিক্ষার্থীর আবেগঘন স্মৃতিচারণে আরও লেখা হয়েছে—

“সবসময় নরম বিছানার বদলে শক্ত কাঠের উপর ঘুমানো মানুষ ছিলেন তিনি। আমি নিশ্চিত, স্যার এই বাক্যটা পড়লে বলতেন— ‘কাঠ লিখলে আবার শক্ত শব্দটা কেন?’ তাঁর ছোট ছোট সংশোধন, কৌতুক আর শৃঙ্খলাই তাঁকে আলাদা করেছিল।”

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তাঁর মরদেহ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ‘সাঁঝের মায়া’য় রাখা হবে। পরে রোববার বাদ জোহর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে তাঁর মা কবি সুফিয়া কামালের কবরের পাশেই তাঁকে দাফন করা হবে।

একজন শিক্ষক চলে যান, কিন্তু তাঁর ক্লাসরুম থেকে যাওয়া শব্দগুলো থেকে যায়। শাহেদ কামালের ক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই সত্য। তিনি আর সাইকেলে চড়ে ক্যাম্পাসে আসবেন না, ক্লাসরুমে হঠাৎ থেমে গিয়ে কোনো বাক্যের ভুল ধরিয়ে দেবেন না। কিন্তু তাঁর শেখানো সাংবাদিকতার শৃঙ্খলা, ভাষার প্রতি কঠোরতা আর নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো বেঁচে থাকবে তাঁর অসংখ্য ছাত্রের ভেতর।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, যুগান্তর ও সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ খানের ফেসবুক স্ট্যাটাস

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments