Homeনাগরিক দর্পণ১৯৭৫-১৯৮১-র রক্তাক্ত সামরিক অস্থিরতা ও জিয়া হত্যাকাণ্ডের পটভূমি

১৯৭৫-১৯৮১-র রক্তাক্ত সামরিক অস্থিরতা ও জিয়া হত্যাকাণ্ডের পটভূমি

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, পাল্টা অভ্যুত্থান, তাহের, সামরিক বিচার ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব—ছয় বছরের অস্থিরতা কি শেষ পর্যন্ত জিয়া হত্যাকাণ্ডের পথ তৈরি করেছিল?

২ জুন ২০২৬ | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: পর্ব–৪

Today TV BD-এর ৮ পর্বের বিশেষ অনুসন্ধানধর্মী ধারাবাহিক “রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাকাণ্ড”

🕯 একটি ভোরের গুলির শব্দ, যার শুরু ছয় বছর আগে

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হবেন। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন মোড় নেবে। সেনাবাহিনী আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসবে।

কিন্তু সেই ভোরের গুলির শব্দের ইতিহাস শুরু হয়নি চট্টগ্রামে। তার সূত্র খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় আরও ছয় বছর আগে—১৯৭৫ সালের আগস্টে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থান, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ, কর্নেল তাহেরের বিচার, ১৯৭৭ সালের বিমানবাহিনী বিদ্রোহ এবং পরবর্তী সামরিক পুনর্বিন্যাস—সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘ অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডকে অনেকেই ৩০ মে ১৯৮১-এর একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখেন। কিন্তু ইতিহাস, সামরিক নথি, আদালতের রায়, গবেষণা, স্মৃতিকথা এবং সমসাময়িক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে আসে।

সেই বাস্তবতায় জিয়া হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ভোরের রক্তাক্ত ঘটনা নয়; বরং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে জমে ওঠা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সংঘটিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ১৯৮১ সালের চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের ট্র্যাজেডি পর্যন্ত সময়কাল ছিল ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, রাজনৈতিক বৈধতার সংকট, সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং নেতৃত্বের রক্তাক্ত প্রতিযোগিতার যুগ।

এই ছয় বছরে সেনাবাহিনী শুধু রাষ্ট্রের security বা নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে—১৯৮১ সালের ৩০ মে কি হঠাৎ ঘটে যাওয়া একটি বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ ছিল, নাকি ১৯৭৫ সালের পর থেকে জমে ওঠা সামরিক অস্থিরতার শেষ বড় বিস্ফোরণ?
এই পর্বে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হবে।

🕯 ১৫ আগস্ট ১৯৭৫: যে ভোর বদলে দেয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাস

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের দিন নয়; এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো আমূল বদলে যাওয়ার সূচনা। সেদিন ভোরে একদল সেনা কর্মকর্তা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাসভবনে হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেন। একইসঙ্গে নিহত হন বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন রাজনৈতিক সহযোগী।

এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। কিন্তু এর আরেকটি গভীর প্রভাব পড়ে সেনাবাহিনীর ওপর। স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীকে একটি পেশাদার ও সাংবিধানিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার যে চেষ্টা চলছিল, ১৫ আগস্টের পর সেই ধারণা বড় ধাক্কা খায়। প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনীর একটি অংশ সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
অনেক গবেষকের মতে, এখান থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের সামরিক রাজনীতির নতুন অধ্যায়।

লরেন্স লিফশুল্টজ তাঁর গবেষণায় লিখেছেন, ১৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি বিপজ্জনক ধারণা জন্ম নেয়—political বা রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কখনো কখনো সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে। এই ধারণা পরবর্তী কয়েক বছরে বারবার ফিরে আসে।

⚖ বৈধতা সংকট: রাষ্ট্রের রক্ষক নাকি রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার?

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এলেও সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে—রাষ্ট্র পরিচালনায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী?

একটি অংশ মনে করত, রাজনৈতিক leadership বা নেতৃত্ব ব্যর্থ হলে জাতীয় স্থিতিশীলতার স্বার্থে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ বৈধ হতে পারে। অন্য অংশের মতে, এটি সেনাবাহিনীকে তার পেশাদার চরিত্র থেকে বিচ্যুত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করবে। সমস্যা ছিল—এই বিতর্কের কোনো সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান তৈরি হয়নি। ফলে ক্ষমতা, আনুগত্য, বৈধতা এবং রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নগুলো ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। পরবর্তী can-ছয় বছরে সংঘটিত প্রায় প্রতিটি সামরিক সংকটের পেছনে এই অমীমাংসিত বিতর্কের ছায়া দেখা যায়।

🔥 ৩ নভেম্বর ১৯৭৫: খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থান

১৫ আগস্টের পর গঠিত নতুন ক্ষমতার কাঠামো স্থিতিশীল হতে পারেনি। মাত্র আড়াই মাসের মাথায়, ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।

খালেদ মোশাররফ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানায়ক। তাঁর সমর্থকদের মতে, তিনি সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, ১৫ আগস্টের ঘটনার পর সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছিল এবং সেটি পুনর্গঠন করা জরুরি হয়ে উঠেছিল। তবে সমালোচকদের একটি অংশ এই ঘটনাকে আরেকটি ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখেন।

এই অভ্যুত্থানের ফলে তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান কার্যত গৃহবন্দি হয়ে পড়েন। কয়েক দিনের জন্য ক্ষমতার ভারসাম্য আবার বদলে যায়। কিন্তু খালেদ মোশাররফের উদ্যোগ স্থায়ী হয়নি। কারণ সেনাবাহিনীর ভেতরে তখনও অস্থিরতা গভীর ছিল, এবং মাত্র চার দিনের মাথায় নতুন বিস্ফোরণ ঘটে।

⚔ ৭ নভেম্বর: মুক্তি, বিপ্লব নাকি আরেক অভ্যুত্থান?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর সম্ভবত সবচেয়ে বিতর্কিত দিনগুলোর একটি। সেদিন কর্নেল আবু তাহের ও তাঁর সমর্থকদের প্রভাবাধীন সৈনিকদের অংশগ্রহণে নতুন এক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এর ফলে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য আবার পরিবর্তিত হয়। এতে খালেদ মোশাররফ নিহত হন।

সরকারি বর্ণনায় দীর্ঘদিন এই ঘটনাকে “সিপাহী-জনতার বিপ্লব” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে গভীর মতভেদ রয়েছে। কেউ একে গণভিত্তিক সামরিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখেন, আবার কেউ মনে করেন, এটি মূলত আরেকটি ক্ষমতা পরিবর্তনের সামরিক অভিযান ছিল।

যে ব্যাখ্যাই গ্রহণ করা হোক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট—৭ নভেম্বরের পর বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে জিয়াউর রহমানের উত্থান শুরু হয় এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়।

👤 কর্নেল তাহের: সহযোগী থেকে প্রতিপক্ষ

৭ নভেম্বরের ঘটনায় কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাহের ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় চিন্তার অধিকারী একজন কর্মকর্তা। তিনি সেনাবাহিনীতে অধিক সমতা, অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন।

কিন্তু ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান ও তাহেরের রাজনৈতিক দর্শনের পার্থক্য দ্রুত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাহের যে ধরনের রূপান্তর চেয়েছিলেন, রাষ্ট্র সেই পথে এগোয়নি। ১৯৭৬ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন। সামরিক ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচার হয়। তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং সেই রায় কার্যকর করা হয়।

দশক পরে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত সেই বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করে। তাহেরের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড আজও বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ঘটনাটি সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠায়—রাষ্ট্রের নতুন ক্ষমতা কাঠামোর বিরোধিতা করলে তার মূল্য অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

🪖 সেনাবাহিনীর ভেতরে অদৃশ্য বিভাজনের জন্ম

১৯৭৫–১৯৮১ সময়কাল নিয়ে লেখা স্মৃতিকথা, গবেষণা এবং সাক্ষাৎকারগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেনাবাহিনীর ভেতরে একাধিক ক্ষমতাকেন্দ্র এবং মানসিক বিভাজন তৈরি হয়েছিল। জনপ্রিয় আলোচনায় অনেক সময় এটিকে “মুক্তিযোদ্ধা বনাম পাকিস্তানফেরত” বিভাজন হিসেবে তুলে করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও জটিল।

  • একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে নেতৃত্বের প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখত।
  • অন্য অংশ পেশাদার সামরিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সামরিক মানদণ্ডকে বেশি গুরুত্ব দিত।
  • আবার কিছু কর্মকর্তা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন, অন্যরা কঠোরভাবে অরাজনৈতিক সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নেন।

সব মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা একই মতাদর্শে বিশ্বাস করতেন না, আবার সব পাকিস্তানফেরত কর্মকর্তাও এক ধরনের অবস্থানে ছিলেন না। তবুও অবিশ্বাস, প্রতিযোগিতা, পদোন্নতি-সংক্রান্ত অসন্তোষ এবং ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে প্রভাবিত করছিল। এই অদৃশ্য বিভাজন পরবর্তী ঘটনাগুলোর পটভূমি তৈরি করতে ভূমিকা রেখেছিল বলে অনেক গবেষক মনে করেন।

✈️ ১৯৭৭: বিমানবাহিনী বিদ্রোহ এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে ভয়ের সংস্কৃতির জন্ম

বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে ১৯৭৭ সালকে অনেক গবেষক একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করেন। ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর এবং ৭ নভেম্বরের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রকে অনেকটাই স্থিতিশীল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্থিতিশীলতার আড়ালে সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ, অনিশ্চয়তা এবং পারস্পরিক সন্দেহ পুরোপুরি দূর হয়নি।
১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক একটি ঘটনাকে ঘিরে সেই অস্থিরতা আবার সামনে আসে।

জাপান এয়ারলাইন্স ছিনতাই এবং ঢাকা বিমানবন্দর

১৯৭৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাপান এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান ‘জাপানিজ রেড আর্মি’ নামের একটি উগ্রপন্থী সংগঠন ছিনতাই করে ঢাকায় নিয়ে আসে। ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারকে একই সঙ্গে জিম্মি সংকট, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।

এই সংকট চলাকালেই বিমানবাহিনীর ভেতরে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। বিদ্রোহের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং প্রকৃত পরিসর নিয়ে আজও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

কী ঘটেছিল?

সরকারি বর্ণনা অনুযায়ী, বিমানবাহিনীর একটি অংশ রাষ্ট্রক্ষমতা উৎখাতের উদ্দেশ্যে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল। তৎকালীন সামরিক কর্তৃপক্ষ দাবি করে, বিদ্রোহটি দেশের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি ছিল এবং তা দ্রুত দমন করা জরুরি হয়ে পড়ে।

তবে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন স্মৃতিকথা, মানবাধিকারভিত্তিক গবেষণা এবং সাক্ষাৎকারে ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। সমালোচকদের মতে, বিদ্রোহে জড়িতদের সংখ্যা, পরিকল্পনার ব্যাপ্তি এবং পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অনেক অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

কঠোর বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড

বিদ্রোহ দমনের পর ব্যাপক গ্রেপ্তার শুরু হয়। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী শত শত সামরিক সদস্যকে আটক করা হয়। পরবর্তী সময়ে বহু সামরিক সদস্যের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে বিচার পরিচালিত হয়। বিভিন্ন সূত্রে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সংখ্যা ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণেই সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে এখনো ঐকমত্য নেই।

তবে অধিকাংশ গবেষক একমত যে ১৯৭৭ সালের বিচার ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সামরিক বিচার অভিযান।

যে প্রশ্নগুলো আজও রয়ে গেছে

মানবাধিকার সংগঠন, গবেষক এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করে আসছেন

  • প্রত্যেক অভিযুক্ত কি পর্যাপ্ত আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিলেন?
  • সব বিচার কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেছিল?
  • অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ কতটা শক্তিশালী ছিল?
  • কতজন প্রকৃতপক্ষে বিদ্রোহে জড়িত ছিলেন এবং কতজন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন?
    এই প্রশ্নগুলোর অনেকগুলোর চূড়ান্ত উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।

⚠️ আনুগত্য ছিল, কিন্তু আস্থা ছিল কি?

১৯৭৭ সালের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। সামরিক শৃঙ্খলা দৃশ্যত শক্তিশালী হয়, অভ্যুত্থানের ঝুঁকি কমে আসে এবং কমান্ড কাঠামো আরও কেন্দ্রীভূত হয়।

কিন্তু অনেক সাবেক কর্মকর্তা, গবেষক এবং পর্যবেক্ষকের মতে, একই সঙ্গে ভয়ের সংস্কৃতিও তৈরি হয়। অনেক কর্মকর্তা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে—ভুল পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে, ভুল সময়ে ভুল মত প্রকাশ করলে, অথবা কোনো সন্দেহের মধ্যে পড়লে তাঁদের সামরিক ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়তে পারে।

একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করা হয়েছে:

“শৃঙ্খলা ফিরেছিল, কিন্তু পারস্পরিক বিশ্বাস পুরোপুরি ফিরে আসেনি।”

যদিও এই ধরনের মূল্যায়ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে, তবু বিভিন্ন সূত্রে একই ধরনের পর্যবেক্ষণ বারবার দেখা যায়।

🪖 পদোন্নতি, পদায়ন এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা

সেনাবাহিনীর মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি ও পদায়ন সবসময়ই সংবেদনশীল বিষয়। ১৯৭৭ সালের পর এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ তখন সেনাবাহিনীতে একাধিক প্রজন্মের কর্মকর্তা একই সঙ্গে নেতৃত্বের অবস্থানে উঠে আসছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন:
১. মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া কর্মকর্তা
২. পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনকারী কর্মকর্তা
৩. স্বাধীনতার পরে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
৪. যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের সময় দ্রুত পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তা
ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, এই প্রতিযোগিতা সব সময় প্রকাশ্য ছিল না। কিন্তু শীর্ষ পর্যায়ের পদায়ন ও কমান্ড পোস্ট নিয়ে অসন্তোষের আলোচনা সামরিক মহলে নিয়মিত শোনা যেত।

📍 কেন চট্টগ্রাম এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল?

১৯৮১ সালের ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে হলে চট্টগ্রামের গুরুত্ব বুঝতে হবে। চট্টগ্রাম ছিল—

  • দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর
  • পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের কেন্দ্র
  • পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা কার্যক্রমের ঘাঁটি
  • গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও সরবরাহ রুটের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র
    ফলে চট্টগ্রামের জিওসি পদ ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। এই পদেই ছিলেন মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর। তাঁর অধীনে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গ্যারিসন পরিচালিত হতো। সামরিক ইতিহাসবিদদের মতে, চট্টগ্রামের মতো একটি কমান্ডের নেতৃত্বে থাকা যে কোনো কর্মকর্তা স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠতেন।

🔄 ১৯৮০–৮১: শীর্ষ নেতৃত্বে নতুন সমীকরণ

১৯৮০ সালের শেষভাগে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে শুরু করে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ছিলেন। অন্যদিকে সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদও ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছিলেন।

একই সময়ে বিভিন্ন কমান্ডে পদায়ন ও রদবদল নিয়ে আলোচনা চলছিল। পরে প্রকাশিত বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য ও আস্থার সংকটের কিছু উপাদান বিদ্যমান ছিল। তবে এসব বিষয়ে অনেক দাবি এখনো প্রমাণিত নয়। এ কারণেই ইতিহাসবিদরা সতর্ক করে বলেন—অনুমান এবং প্রমাণিত তথ্যকে একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলা উচিত নয়।

কিন্তু এটাও সত্য যে ১৯৮১ সালের মে মাসে সেনাবাহিনী ছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠানে, যার পেছনে ছিল ছয় বছরের ধারাবাহিক অস্থিরতার ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের শেষ বড় বিস্ফোরণ ঘটে ৩০ মে চট্টগ্রামে।

🧭 ১৯৮১ সালের দিকে অগ্রসর হওয়া: সংকেতগুলো কি আগে থেকেই ছিল?

১৯৮১ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন চট্টগ্রাম সফরে যান, তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল মনে হচ্ছিল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দ্রুত সাংগঠনিক বিস্তার লাভ করছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমান একজন প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রনেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোতেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছিল।
কিন্তু সামরিক ইতিহাস বিশ্লেষকরা মনে করেন, দৃশ্যমান স্থিতিশীলতার নিচে কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন তখনও রয়ে গিয়েছিল। সেই প্রশ্নগুলো ছিল—

  • সেনাবাহিনীর ভেতরে আস্থার প্রকৃত অবস্থা কী?
  • ১৯৭৫–৭৭ সময়কার ক্ষত কতটা নিরাময় হয়েছিল?
  • সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্ক কতটা দৃঢ় ছিল?
  • বিভিন্ন কমান্ডের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কী অবস্থায় ছিল?
    এই প্রশ্নগুলোর অনেকগুলোর স্পষ্ট উত্তর কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ইতিহাসবিদদের সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে তুলতে বাধ্য করেছে।

👤 মঞ্জুর, এরশাদ ও শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব

১৯৮১ সালের ঘটনায় তিনটি নাম বারবার সামনে আসে—

  • রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান
  • মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর
  • সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ

তিনজনই ছিলেন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।

মঞ্জুর ছিলেন চট্টগ্রামের জিওসি,
এরশাদ ছিলেন সেনাপ্রধান,
আর জিয়া ছিলেন রাষ্ট্রপতি এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।

পরবর্তীকালে প্রকাশিত বিভিন্ন স্মৃতিকথা, সাক্ষাৎকার এবং গবেষণায় তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নানা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তবে এসব ব্যাখ্যার অনেকগুলোর পক্ষে পূর্ণাঙ্গ নথিভিত্তিক প্রমাণ নেই।

এ কারণেই ইতিহাসবিদরা সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি মূল্যায়নের পরামর্শ দেন। তবে একটি বিষয় নিয়ে মতভেদ কম—১৯৮১ সালের মে মাসে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পুনর্বিন্যাস চলছিল।

🔄 মঞ্জুরের বদলি: প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নাকি রাজনৈতিক বার্তা?

জিয়া হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরকে চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে ঢাকায় বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি অবস্থান ছিল—এটি সেনাবাহিনীর নিয়মিত প্রশাসনিক রদবদলের অংশ।

কিন্তু পরবর্তীকালে বহু গবেষক, সাংবাদিক এবং সামরিক পর্যবেক্ষক এই সিদ্ধান্তকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন। কারণ চট্টগ্রাম ছিল দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ডগুলোর একটি, আর মঞ্জুর ছিলেন সেই কমান্ডের জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী কর্মকর্তা। তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে; আজ পর্যন্ত এমন কোনো চূড়ান্ত নথি প্রকাশিত হয়নি যা প্রমাণ করে যে এই বদলির সিদ্ধান্তই বিদ্রোহ বা হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল। তবুও ইতিহাসের আলোচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে থেকে গেছে।

⚠️ জিয়া হত্যাকাণ্ড: বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি দীর্ঘ অস্থিরতার ফল?

এই ধারাবাহিকের প্রথম চার পর্বে আমরা যে ঘটনাগুলো দেখেছি, সেগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—১৯৮১ সালের ৩০ মে কি কেবল কয়েকজন অসন্তুষ্ট কর্মকর্তার বিদ্রোহ ছিল? নাকি এটি ছিল ১৯৭৫ সালের পর থেকে সেনাবাহিনীর ভেতরে জমে থাকা সংকটের চূড়ান্ত প্রকাশ?

এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ঐকমত্য নেই।

  • একটি ধারা মনে করে: জিয়া হত্যাকাণ্ড মূলত সীমিত পরিসরের একটি সামরিক বিদ্রোহ ছিল, যার সঙ্গে বৃহত্তর কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের সরাসরি সম্পর্ক নেই।
  • অন্য ধারা মনে করে: ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ভেতরে জমে থাকা অবিশ্বাস, পুনর্বিন্যাস, বিচার, বিদ্রোহ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখানে নতুন সংকটের ঝুঁকি ক্রমাগত বেড়েছিল।

উভয় অবস্থানের পক্ষেই কিছু তথ্য ও যুক্তি রয়েছে। কিন্তু কোনটি পুরো সত্য, তা আজও নিশ্চিতভাবে বলা যায়না।

📚 ইতিহাসবিদরা কী বলেন?

১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সময়কাল নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাখ্যাগত পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে বেশিরভাগের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে—এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে অস্থির সামরিক-রাজনৈতিক অধ্যায়গুলোর একটি।

  • অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর Bangladesh: A Legacy of Blood গ্রন্থে এই সময়কে সামরিক পুনর্বিন্যাস, ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাষ্ট্রের নতুন ক্ষমতা কাঠামো গঠনের যুগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
  • লরেন্স লিফশুল্টজ-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর সম্পর্কের চরিত্র মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়। সেনাবাহিনী শুধু নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেও আবির্ভূত হয়।
  • বাংলাদেশি গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন, জিয়া হত্যাকাণ্ডকে শুধু মঞ্জুর-কেন্দ্রিক বিদ্রোহ বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের আলোকে ব্যাখ্যা করলে বৃহত্তর সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আড়ালে থেকে যায়।
  • অন্যান্য বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮১ সালের ঘটনাকে অতিরিক্ত ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত করলে তৎকালীন তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কারণগুলোর গুরুত্ব কমে যায়।

এ কারণেই জিয়া হত্যাকাণ্ডের ব্যাখ্যা আজও ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্কের বিষয়।

📜 ইতিহাসের অসমাপ্ত অধ্যায়

জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর নিহত হন। পরবর্তীকালে সামরিক আদালতে বহু কর্মকর্তার বিচার হয়। কিন্তু ঘটনার বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর আর কখনো জানা যায়নি। কারণ—

  • প্রধান অভিযুক্তদের একজন জীবিত ছিলেন না।
  • পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন কখনো জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি।
  • অনেক সাক্ষ্য ও নথি গবেষকদের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
  • বিভিন্ন পক্ষের বর্ণনা একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
    ফলে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১-এর সামরিক ইতিহাস আজও আংশিকভাবে উন্মুক্ত এবং আংশিকভাবে অন্ধকারে ঢাকা একটি অধ্যায়।

📌 এই পর্বে যা জানা গেল

  • ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১—বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ছয় বছর ছিল রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সেনাবাহিনীর সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের সময়।
  • বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থান, ۷ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ, কর্নেল তাহেরের বিচার, ১৯৭৭ সালের বিমানবাহিনী বিদ্রোহ এবং ধারাবাহিক সামরিক পুনর্বিন্যাস—সব মিলিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে আনুগত্য, নেতৃত্ব, বৈধতা এবং ক্ষমতার প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে।
  • জিয়াউর রহমান সেই অস্থিরতার ভেতর থেকে উঠে এসে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছান এবং রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে জমে থাকা অবিশ্বাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব কতটা দূর হয়েছিল, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ইতিহাস এখনো দেয়নি।
  • ফলে ১৯৮১ সালের ৩০ মে-র হত্যাকাণ্ডকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ হিসেবে দেখা যায় কি না, তা নিয়ে বিতর্ক এখনো অব্যাহত।
  • একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট—চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সেই ভোরকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ১৯৭৫ সালের আগস্ট এবং তার পরবর্তী ছয় বছরের ঘটনাপ্রবাহের দিকে। কারণ ইতিহাসের অনেক বড় ঘটনা একদিনে ঘটে, কিন্তু তার পটভূমি তৈরি হয় বহু বছর ধরে।

📌 তথ্যসূত্র:

১. অ্যান্থনি মাসকারেনহাস — Bangladesh: A Legacy of Blood
২. লরেন্স লিফশুল্টজ — Bangladesh: The Unfinished Revolution
৩. জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী — দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড: ১৯৮১-র ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান
৪. কর্নেল আবু তাহের মামলা সম্পর্কিত উচ্চ আদালতের রায়
৫. ১৯৭৭ সালের সামরিক বিচার নিয়ে গবেষণা ও মানবাধিকারভিত্তিক প্রকাশনা
৬. বিবিসি বাংলা, সমসাময়িক সংবাদপত্র আর্কাইভ (১৯৭৫–১৯৮১)

পরবর্তী পর্ব:
এরশাদ, ভারত ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব: তথ্য, দাবি ও বাস্তবতা

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular