দেড় মাস আগে মন্ত্রীর ঘোষণার পরও কার্যকর হয়নি মিটার ভাড়া মওকুফ; ডিমান্ড চার্জ ও অতিরিক্ত ফির চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ
ঢাকা | ১৩ মে ২০২৬
বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে মাসিক ভাড়া বা মিটার চার্জ পুরোপুরি প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গত ২৯ মার্চ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই ঘোষণার প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও মাঠ পর্যায়ে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। উল্টো রিচার্জের সময় মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাটের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়ায় গ্রাহক ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
অভিযোগের পাহাড়: রিচার্জ করলেই টাকা গায়েব
রাজধানীর ভাষানটেক এলাকার বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন গত ৭ মে ১,৫০০ টাকা রিচার্জ করে মিটারে পেয়েছেন মাত্র ১,২৫৫ টাকা। মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ বাবদ শুরুতেই তাঁর ২৪৫ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রিপেইড মিটার চালুর সময় বলা হয়েছিল খরচ কমবে, কিন্তু বাস্তবে পোস্টপেইড মিটারের তুলনায় খরচ অনেক বেড়েছে।
🔎 বিশ্লেষণ: কেন এই চার্জ কাটছে বিতরণ কোম্পানিগুলো?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিপিডিসি ও ডেসকোর মতো বিতরণ কোম্পানিগুলো বিভিন্ন বিদেশি দাতা সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে এই প্রিপেইড মিটারগুলো কিনেছে। ঋণের কিস্তি পরিশোধের অজুহাত দেখিয়ে তারা মিটার ভাড়া আদায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যদিও পিডিবি (PDB) শুরুতে বিনামূল্যে মিটার দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল, কারণ গ্রাহক অগ্রিম টাকা দেওয়ায় কোম্পানিগুলো এমনিতেই লাভবান হচ্ছে। বর্তমানে কোম্পানিগুলোর কাছে এই চার্জ আদায় একটি ‘লাভজনক ব্যবসা’ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
📊 প্রিপেইড মিটারের খরচের হিসাব (এক নজরে)
| চার্জের ধরন | হার / পরিমাণ |
|---|---|
| সিঙ্গেল ফেজ মিটার ভাড়া | ৪০ টাকা (মাসিক) |
| থ্রি ফেজ মিটার ভাড়া | ২৫০ টাকা (মাসিক) |
| ডিমান্ড চার্জ | ৪২ টাকা (প্রতি কিলোওয়াট) |
| ভ্যাট | মোট চার্জের ওপর ৫% |
| রিবেট (ছাড়) | ৫% (প্রিপেইড গ্রাহকদের জন্য) |
উদাহরণ স্বরূপ: ১,০০০ টাকা রিচার্জ করলে ডিমান্ড চার্জ ও ভাড়া বাবদ প্রায় ২২১ টাকা শুরুতেই কেটে নেওয়া হতে পারে।
পুরোনো মিটারের টাকাও ফেরত পাননি গ্রাহক
অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, এনালগ মিটার সরিয়ে ডিজিটাল মিটার স্থাপনের সময় তাদের কেনা পুরোনো মিটারগুলো ডিপিডিসি বা ডেসকো কর্তৃপক্ষ নিয়ে গেছে। প্রতিটি মিটার ২,৫০০-৩,০০০ টাকা দিয়ে কেনা হলেও এর কোনো ক্ষতিপূরণ বা সমন্বয় করা হয়নি। কামরাঙ্গীরচর ও মান্ডা এলাকার গ্রাহকরা একে ‘জুলুম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
যান্ত্রিক ত্রুটি ও বাড়তি খরচ
ডিজিটাল হওয়ার পর যান্ত্রিক ত্রুটিও বেড়েছে। মিটার হ্যাং হওয়া বা লক হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকরা। জরুরি ভিত্তিতে মিটার সচল করতে অনেক ক্ষেত্রে অফিসের লোকদের বা স্থানীয় মেকানিকদের ‘বাড়তি চা-খরচ’ বা বকশিশ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
💬 কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) মোরশেদ আলম খান বলেন, “মিটার ভাড়া না নেওয়া সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা বা কাগজ এখনও আমার নজরে পড়েনি।”
উপসংহার: সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ঘোষণা আসলেও দাপ্তরিক জটিলতা বা সদিচ্ছার অভাবে তার সুবিধা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। অগ্রিম টাকা দিয়েও সেবার বদলে বাড়তি চার্জের বোঝা বহন করতে হচ্ছে গ্রাহকদের, যা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।



