প্রায় ৪৯০ কোটি টাকার মদ বিক্রি, ডিস্টিলারি বিভাগে ২২৪ কোটি টাকার কর-পূর্ব মুনাফা—অন্য চিনিকলগুলোতে কি গড়ে উঠতে পারে নতুন শিল্প, আর বিদেশে রপ্তানির সুযোগ কোথায়?
বিশেষ প্রতিবেদন | TODAY TV BD
বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি ও খাদ্যশিল্পে একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানের নাম কেরু অ্যান্ড কোম্পানি। চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান একদিকে চিনি উৎপাদন করে, অন্যদিকে আখের উপজাত চিটাগুড় থেকে মদ ও বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত অ্যালকোহলজাত পণ্য তৈরি করে। চিনিশিল্পে লোকসান থাকলেও এর ডিস্টিলারি বা মদ উৎপাদন বিভাগ ধারাবাহিকভাবে বিপুল মুনাফা করছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে কেরুর মদ বিক্রি থেকে আয় প্রায় ৪৯০ কোটি টাকা হয়েছে বলে কোম্পানির কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। একই অর্থবছরে ডিস্টিলারি বিভাগের কর-পূর্ব মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে চিনি বিভাগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। সব বিভাগ মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা বলে প্রকাশিত হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের সময় কোম্পানির বার্ষিক হিসাব নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি বলে জানানো হয়েছিল। ফলে নিরীক্ষিত হিসাব প্রকাশের পর চূড়ান্ত অঙ্ক নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এখানে হিসাবের একটি পার্থক্য বোঝা জরুরি। ৪৯০ কোটি টাকা মদ বিক্রির আয়, ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ডিস্টিলারি বিভাগের কর-পূর্ব মুনাফা, আর ১৬৫ কোটি টাকা পুরো প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা—এগুলো তিনটি আলাদা হিসাব। এই পার্থক্য না বুঝলে কেরুর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন ভুল হতে পারে।
প্রশ্ন হলো, কেরুর এই সাফল্যের কারণ কী? প্রতিষ্ঠানটি কোন ধরনের মদ তৈরি করে, সেগুলো কোথায় বিক্রি হয়, বর্তমান দাম কত, উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ কতটা এগিয়েছে, অন্য চিনিকলগুলোতে কেন একই ধরনের শিল্প গড়ে ওঠেনি এবং বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনাই বা কতটা?
‘ফরেন লিকার’ মানেই কি বিদেশ থেকে আমদানি করা মদ?
কেরুর পণ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রচলিত একটি বিভ্রান্তি হলো—ফরেন লিকার মানেই বিদেশ থেকে আনা মদ।
বাস্তবে কেরুর ফরেন লিকার বাংলাদেশেই উৎপাদিত। এখানে ‘ফরেন লিকার’ বলতে বিদেশি ধরনের পানীয়—যেমন হুইস্কি, ব্র্যান্ডি, জিন, ভদকা ও রাম—বোঝানো হয়। অর্থাৎ এগুলো বিদেশি ব্র্যান্ডের আমদানি করা বোতল নয়; কেরুর নিজস্ব উৎপাদিত পণ্য।
কেরুর সরকারি ওয়েবসাইটে ফরেন লিকার বিভাগের অধীনে নয়টি ব্র্যান্ডের নাম রয়েছে।
| ব্র্যান্ডের নাম | পানীয়ের ধরন |
|---|---|
| ইয়েলো লেবেল মল্টেড হুইস্কি (Yellow Label Malted Whisky) | মল্টেড হুইস্কি |
| গোল্ড রিবন জিন (Gold Ribbon Gin) | জিন |
| ফাইন ব্র্যান্ডি (Fine Brandy) | ব্র্যান্ডি |
| চেরি ব্র্যান্ডি (Cherry Brandy) | চেরি-স্বাদের ব্র্যান্ডি |
| ইম্পেরিয়াল হুইস্কি (Imperial Whisky) | হুইস্কি |
| অরেঞ্জ কুরাসাও (Orange Curaçao) | কমলাজাতীয় স্বাদযুক্ত পানীয় |
| জারিনা ভদকা (Zarina Vodka) | ভদকা |
| রোজা রাম (Rosa Rum) | রাম |
| ওল্ড রাম (Old Rum) | রাম |
এই নয়টি ব্র্যান্ডের নাম কেরুর সরকারি ওয়েবসাইট ও প্রতিষ্ঠানের পণ্যবিষয়ক প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে মেলে। তবে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে কোনো কোনো নামের বানান এবং ব্র্যান্ডের তালিকায় সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। বর্তমান পণ্যের লেবেলই নামের চূড়ান্ত বানান যাচাইয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
কান্ট্রি লিকার বা দেশি মদ কী?
ফরেন লিকারের পাশাপাশি কেরু উৎপাদন করে কান্ট্রি লিকার বা দেশি মদ। এটি ফরেন লিকারের মতো আলাদা আন্তর্জাতিক ধরন অনুকরণ করে বাজারজাত করা একাধিক ব্র্যান্ডের তালিকা নয়; বরং দেশি মদ হিসেবে পরিচিত একটি পণ্যশ্রেণি।
কেরুর ডিস্টিলারি বিভাগে কান্ট্রি স্পিরিটও উৎপাদিত হয়। আখ থেকে চিনি তৈরির পর যে চিটাগুড় পাওয়া যায়, তা অ্যালকোহল উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। আখের উপজাত ব্যবহার করে মদ, স্পিরিট, ভিনেগার ও জৈবসার তৈরির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি একই কাঁচামাল থেকে একাধিক ধরনের পণ্য উৎপাদনের সুযোগ পায়।
সরকারি দরপত্রের নথিতে বোতলজাত কান্ট্রি লিকারের জন্য ৫০০ মিলিলিটার ও এক লিটারের বোতল সরবরাহের উল্লেখ রয়েছে। ২০২৬ সালের আরেকটি দরপত্রে দেশি মদ বোতলজাত করার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র স্থাপন, বোতল ভরা, মুখ বন্ধ করা, গায়ে লেবেল লাগানো এবং নির্ধারিত মানের বাইরে থাকা বোতল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নথিতে কান্ট্রি লিকারের জন্য ১৭–৪০ শতাংশ অ্যালকোহলঘনত্বের পণ্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। এটি উৎপাদনব্যবস্থার দরপত্রে ব্যবহৃত সীমা; প্রতিটি বোতলে একই মাত্রার অ্যালকোহল আছে—এমন প্রমাণ নয়। নির্দিষ্ট বোতলের অ্যালকোহলঘনত্ব জানতে পণ্যের লেবেল দেখতে হবে।
দাম কত? বর্তমান মূল্যতালিকা নিয়ে অস্পষ্টতা
কেরুর বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতল ১৮০, ৩৭৫ ও ৭৫০ মিলিলিটার আকারে বাজারজাত করা হয় বলে প্রতিষ্ঠানের পণ্যবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। দেশি মদের ক্ষেত্রে ৫০০ মিলিলিটার ও এক লিটারের বোতল সরবরাহের তথ্যও সরকারি ক্রয় নথিতে পাওয়া যায়।
কিন্তু অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিটি ব্র্যান্ড ও বোতলের আকার অনুযায়ী হালনাগাদ সরকারি খুচরা মূল্যতালিকা অনলাইনে নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা যায়নি। বিভিন্ন বেসরকারি ওয়েবসাইটে কেরুর মদের দাম নিয়ে তালিকা রয়েছে; সেগুলো সবই প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক মূল্যতালিকা নয়। কোনো কোনো তালিকার তথ্য পুরোনোও হতে পারে।
এ কারণে ইয়েলো লেবেল, গোল্ড রিবন জিন, জারিনা ভদকা বা অন্য কোনো ব্র্যান্ডের নির্দিষ্ট বর্তমান দাম নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা ঠিক হবে না। বিশেষ করে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে স্থানীয়ভাবে তৈরি বিলাতি মদের ওপর নতুন সুনির্দিষ্ট কর যুক্ত হওয়ায় পুরোনো দাম দিয়ে বর্তমান বাজারমূল্য বোঝা আরও কঠিন।
দামের বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কেরুর উচিত ব্র্যান্ড, বোতলের পরিমাণ, অ্যালকোহলঘনত্ব, কর এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যসহ হালনাগাদ তালিকা সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা।
নতুন করের প্রভাব কতটা?
২০২৬ সালের অর্থ আইনে বাংলাদেশে প্রস্তুত বিলাতি মদের জন্য প্রতি লিটার প্রুফে ৫০০ টাকা সুনির্দিষ্ট মূল্য সংযোজন করের বিধান যুক্ত হয়েছে। আইনের ভাষায় করের একক হলো ‘প্রতি লিটার প্রুফ’—এটি প্রতিটি বোতল বা সাধারণ এক লিটার তরলের ওপর সরাসরি একই অঙ্ক বসানোর সমান নয়। করের হিসাব নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট পণ্যের শ্রেণি ও প্রযোজ্য নিয়মের ওপর।
এ কারণে নতুন করের প্রভাব নির্ধারণ করতে হলে কেরুর প্রতিটি পণ্যের শ্রেণি, কর নিরূপণের পদ্ধতি এবং সংশোধিত মূল্যতালিকা দেখতে হবে। দেশি মদসহ সব পণ্যের ওপর কীভাবে কর কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও প্রতিষ্ঠানের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
সরকারের জন্য কর রাজস্ব গুরুত্বপূর্ণ, আবার করের পরিবর্তনের কারণে পণ্যের দাম ও বিক্রির পরিমাণও বদলাতে পারে। তাই কর বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন, বিক্রি ও রাজস্বের প্রভাব নিয়মিত মূল্যায়ন করা উচিত।
কোথায় বিক্রি হয়?
কেরুর সরকারি ওয়েবসাইটে বর্তমানে চারটি বিক্রয় অফিসের নাম দেওয়া আছে:
- দর্শনা বিক্রয় অফিস, চুয়াডাঙ্গা
- ঢাকা বিক্রয় অফিস
- চট্টগ্রাম বিক্রয় অফিস
- কক্সবাজার বিক্রয় অফিস
এ ছাড়া সরকারি ওয়েবসাইটে মাদকদ্রব্য পণ্যাগার বা বিতরণকেন্দ্র হিসেবে পার্বতীপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, শ্রীমঙ্গল, ঢাকা, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, দর্শনা, পাবনা ও শান্তাহারের নাম রয়েছে।
তবে বিক্রয় অফিস, পণ্যাগার এবং সাধারণ খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র এক ধরনের প্রতিষ্ঠান নয়। কোনো স্থানে মজুদ বা বিতরণ কার্যক্রম থাকলেই সেখানে সরাসরি পণ্য কেনা যাবে—এমন নয়। সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের বর্তমান কার্যক্রম ও বিক্রয়ব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে মদ বিক্রি ও পান করা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এবং অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী প্রযোজ্য পারমিট ও লাইসেন্সের নিয়ম মেনে চলতে হয়। তাই কেরুর পণ্যও সাধারণ ভোগ্যপণ্যের মতো অবাধে সবার কাছে বিক্রি হয় না।
কেরুর মুনাফা এত বেশি হওয়ার পেছনে কী আছে?
কেরুর সাম্প্রতিক লাভের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, চাহিদা বেড়েছে। বিদেশি মদ আমদানিতে ২০২১ সাল থেকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মদের চাহিদা বেড়েছে বলে ব্যবসায়িক প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে কেরুর পণ্য বাজারে বাড়তি সুযোগ পেয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কাঁচামালের সুবিধা রয়েছে। চিনি তৈরির উপজাত চিটাগুড় ডিস্টিলারি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। ফলে একই শিল্পাঞ্চলে চিনি ও ডিস্টিলারি থাকায় কাঁচামালের ব্যবহার ও পণ্য উৎপাদনের মধ্যে সংযোগ তৈরি হয়েছে।
তৃতীয়ত, বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন আলাদা। কেরু দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র লাইসেন্সপ্রাপ্ত মদ উৎপাদনকারী ডিস্টিলারি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বাজারে একটি বিশেষ অবস্থানে রয়েছে। আমদানি সীমিত থাকলে স্থানীয় পণ্যের জন্য বাজারে জায়গা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
চতুর্থত, উৎপাদন ও বিপণন সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। বোতলজাতকরণে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, নতুন বোতল কেনা এবং ডিস্টিলারির অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন সরকারি দরপত্রে এমন উদ্যোগের প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে এই সাফল্যকে শুধু কেরুর পণ্যের মানের ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বাজারে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতা, করনীতি ও চাহিদার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উৎপাদন কি আরও বাড়ানো হচ্ছে?
হ্যাঁ, উৎপাদন ও বোতলজাতকরণ আধুনিকায়নের কিছু উদ্যোগের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৫ সালে কেরু কান্ট্রি লিকারের জন্য ৫০০ মিলিলিটারের ২৫ লাখ এবং এক লিটারের ১৫ লাখ বোতল সরবরাহের দরপত্র দিয়েছিল—মোট ৪০ লাখ বোতল। ২০২৬ সালে কান্ট্রি লিকার উৎপাদন ও বোতলজাত করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা স্থাপনের জন্যও দরপত্র প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডিস্টিলারি বিভাগের জন্য নতুন ফরেন লিকার শাখা ভবনের নকশা ও প্রকৌশলসংক্রান্ত পরামর্শক নিয়োগের সরকারি বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়।
অর্থাৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ শুধু আলোচনায় নেই; বোতল সরবরাহ, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সরকারি নথিতেও এর প্রমাণ রয়েছে।
তবে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো আর বাস্তবে উৎপাদন ও বিক্রি কতটা বাড়বে—দুটি আলাদা বিষয়। নতুন যন্ত্র স্থাপনের পর প্রকৃত উৎপাদন, খরচ, বাজারচাহিদা, মজুদ ও বিক্রির তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
অন্য চিনিকলে ডিস্টিলারি হচ্ছে না কেন?
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের অধীনে ১৫টি চিনিকলের কথা সরকারি করপোরেট তথ্যেই উল্লেখ আছে। কিন্তু কেরুর মতো ডিস্টিলারি সব চিনিকলে গড়ে ওঠেনি।
এর কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ রয়েছে।
১. সব চিনিকলের কাঁচামালের পরিস্থিতি এক নয়
ডিস্টিলারি স্থাপনে শুধু একটি চিনিকল থাকলেই হবে না। পর্যাপ্ত ও নিয়মিত চিটাগুড়, কাঁচামালের মান, উৎপাদন মৌসুম, পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়। যে চিনিকল বছরে অল্প দিন চলে বা প্রয়োজনীয় উপজাত নিয়মিত পায় না, সেখানে আলাদা ডিস্টিলারি স্থাপনের অর্থনৈতিক যুক্তি দুর্বল হতে পারে।
২. নতুন কারখানায় বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন
ডিস্টিলারি নির্মাণে পরিশোধন ও পাতনযন্ত্র, নিরাপদ সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ, পরীক্ষাগার, অগ্নিনিরাপত্তা, বর্জ্য পরিশোধন এবং দক্ষ জনবল দরকার। শুধু কারখানা বসালেই উৎপাদন শুরু করা সম্ভব নয়।
৩. আইনি অনুমোদন ও বাজারব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ
মদ উৎপাদন ও বিক্রি সাধারণ শিল্পপণ্যের মতো অবাধ নয়। লাইসেন্স, উৎপাদননিয়ন্ত্রণ, কর, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির বিশেষ নিয়ম রয়েছে। তাই নতুন চিনিকলে ডিস্টিলারি স্থাপন করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং বাজার ও বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।
৪. মুনাফার ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হবে
কেরু লাভ করছে বলেই সব চিনিকলে ডিস্টিলারি স্থাপন করলে একই মুনাফা হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। স্থানীয় চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, কর, কাঁচামালের প্রাপ্যতা ও বিক্রয়ব্যবস্থা অনুযায়ী ফল বদলাতে পারে।
তাই অন্য চিনিকলে নতুন ডিস্টিলারি স্থাপনের আগে স্বচ্ছ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন। কোথায় কত চিটাগুড় উৎপাদন হয়, কত বিনিয়োগ লাগবে, বাজারে কত চাহিদা রয়েছে এবং বিকল্প শিল্পে সেই কাঁচামাল ব্যবহার করলে বেশি মূল্য পাওয়া যাবে কি না—এসব বিষয় তুলনা করা উচিত।
বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব?
এটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা, কিন্তু শুধু উৎপাদনক্ষমতা বাড়ালেই রপ্তানি নিশ্চিত হয় না।
২০২১ সালে কেরুর এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত মদ তখন শুধু দেশের বাজারেই বিক্রি হতো; রপ্তানি করা হতো না। সাম্প্রতিক সময়ে কেরু নিয়মিতভাবে বাণিজ্যিক পরিসরে মদ রপ্তানি শুরু করেছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য তথ্যও এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
রপ্তানি শুরু করতে হলে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মান ও পণ্যের ধারাবাহিকতা: বিদেশি ক্রেতার জন্য অ্যালকোহলের মাত্রা, উপাদান, বিশুদ্ধতা, বোতলজাতকরণ, নিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে।
আমদানিকারক দেশের আইন: প্রতিটি দেশে অ্যালকোহল আমদানি, নিবন্ধন, কর, লেবেল ও বাজারজাতের আলাদা বিধি রয়েছে। ক্রেতা এবং বৈধ আমদানিকারক নিশ্চিত না করে বাজারে প্রবেশ করা যাবে না।
ব্র্যান্ড ও বাজারজাতকরণ: দেশের বাজারে পরিচিত ব্র্যান্ড বিদেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রেতা পাবে না। পণ্যের স্বাদ, মান, দাম, বিপণন, পরিবহন ও প্রতিযোগী ব্র্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করতে হবে।
রপ্তানির প্রকৃত লাভ: আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির আয় থেকে উৎপাদন, মাননিয়ন্ত্রণ, পরিবহন, শুল্ক, বিপণন ও অনুমোদনের খরচ বাদ দেওয়ার পর কত মুনাফা থাকবে—তা আগে হিসাব করতে হবে।
বাংলাদেশ কাস্টমসের নিয়ম অনুযায়ী, রপ্তানি পণ্য পাঠানোর আগে রপ্তানি ঘোষণা এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক নথি জমা দিয়ে ছাড়পত্র নিতে হয়। অ্যালকোহলের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে খাতভিত্তিক লাইসেন্স ও গন্তব্য দেশের বিধিও যুক্ত হবে।
কেরু যদি রপ্তানির সম্ভাবনা যাচাই করতে চায়, তাহলে প্রথমে আন্তর্জাতিক বাজার-সমীক্ষা, পণ্যের পরীক্ষাগারভিত্তিক মান যাচাই এবং সম্ভাব্য আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার।
শুধু মদ নয়, আখের উপজাতের অন্য বাজারও গুরুত্বপূর্ণ
কেরুর সাফল্যের আরেকটি শিক্ষা হলো—একটি মূল পণ্য থেকে পাওয়া উপজাতকে কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প তৈরি করা সম্ভব।
চিটাগুড় থেকে ডিস্টিলারি পণ্য তৈরি হয়; আখের অন্যান্য উপজাত ব্যবহার করে জৈবসার ও ভিনেগারের মতো পণ্যও তৈরি করা যায়। এর বাইরে কাঁচামালের মান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অনুযায়ী শিল্পকারখানায় ব্যবহারের উপযোগী অ্যালকোহল, জৈব জ্বালানি, জৈব গ্যাস এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপকরণ তৈরির সম্ভাবনাও সমীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। তবে প্রতিটি পণ্যের জন্য আলাদা প্রযুক্তি, বাজার, মাননিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
এখানে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত—যে উপজাত থেকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক মূল্য পাওয়া যায় এবং যে উৎপাদন জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেই বিকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
মদ উৎপাদন লাভজনক হলেই কেবল সেটি বাড়ানো হবে, এমন নীতি গ্রহণের আগে অ্যালকোহলজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সামাজিক ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। সরকারি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য শুধু মুনাফা নয়; জনস্বার্থও নিশ্চিত করা।
কেরুর জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কী?
প্রথমত, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাব প্রকাশ করতে হবে, যাতে মদ বিক্রির আয়, ডিস্টিলারির মুনাফা, কর, শুল্ক, চিনির লোকসান ও পুরো প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা আলাদা করে বোঝা যায়।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ব্র্যান্ডের বর্তমান মূল্যতালিকা, বোতলের আকার এবং প্রযোজ্য করের তথ্য প্রকাশ করা উচিত।
তৃতীয়ত, উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্পগুলোর খরচ, সময়সীমা ও প্রত্যাশিত ফল নিয়মিত জানাতে হবে।
চতুর্থত, অন্য চিনিকলগুলোতে ডিস্টিলারি, জৈব জ্বালানি বা আখের উপজাতভিত্তিক নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক মান, বাজারচাহিদা, আইনগত অনুমোদন ও সম্ভাব্য মুনাফার একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনা প্রকাশ করা উচিত।
শেষ কথা
কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ফলাফল বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে চিনি উৎপাদন ও উপজাতভিত্তিক শিল্প চালাতে পারে; কিন্তু একটি বিভাগ লাভজনক হলেই পুরো প্রতিষ্ঠান সমানভাবে লাভজনক হয় না।
কেরুর মদ বিক্রির আয় প্রায় ৪৯০ কোটি টাকা এবং ডিস্টিলারি বিভাগের কর-পূর্ব মুনাফা প্রায় ২২৪ কোটি টাকা—এটি বড় অর্থনৈতিক অর্জন। তবে এর অর্থ এই নয় যে অন্য সব চিনিকলে একই ধরনের কারখানা তৈরি করলেই একই ফল পাওয়া যাবে, কিংবা বিদেশে রপ্তানি করলেই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত হবে।
সঠিক পথ হলো তথ্যভিত্তিক বিনিয়োগ, উৎপাদনব্যয় কমানো, পণ্যের মান উন্নয়ন, উপজাতের সর্বোচ্চ ব্যবহার, আইন মেনে বাজার সম্প্রসারণ এবং সম্ভাব্য রপ্তানির বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।
কেরুর সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের চিনিশিল্পকে টেকসই ও বহুমুখী করা সম্ভব—কিন্তু সেই পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সরকারি জবাবদিহিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
তথ্যসূত্র:
১. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড—কেরুর ডিস্টিলারি মুনাফা, মদ বিক্রির আয় ও চিনিকলের লোকসান, সেপ্টেম্বর ২০২৬।
২. জাগোনিউজ২৪—কেরুর ২০২৫–২৬ অর্থবছরের উৎপাদন, বিক্রি ও মুনাফার তথ্য।
৩. কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের সরকারি ওয়েবসাইট—পণ্যের তালিকা, বিক্রয় অফিস, পণ্যাগার ও ডিস্টিলারি বিভাগ।
৪. বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন—প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি ও শিল্পসংক্রান্ত তথ্য।
৫. বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট কর্তৃপক্ষ—কেরুর দেশি মদের বোতল সরবরাহ ও স্বয়ংক্রিয় বোতলজাতকরণসংক্রান্ত দরপত্র।
৬. বাংলাদেশ সরকারি ই-ক্রয়ব্যবস্থা—কেরুর ফরেন লিকার শাখা ভবনের নকশা ও প্রকৌশল পরামর্শক নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি, ২০২৬।
৭. বাংলাদেশ সরকারের অর্থ আইন, ২০২৬—বাংলাদেশে প্রস্তুত বিলাতি মদের ওপর সুনির্দিষ্ট করের বিধান।
৮. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর—অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২২ ও পারমিটসংক্রান্ত নির্দেশনা।
৯. বাংলাদেশ কাস্টমস—রপ্তানি পণ্যের ঘোষণা ও ছাড়পত্রসংক্রান্ত নিয়ম।
১০. প্রথম আলো—আখের উপজাত থেকে কেরুর পণ্য উৎপাদন ও ডিস্টিলারি ব্যবসা নিয়ে প্রতিবেদন।
১১. বিডিনিউজ২৪ডটকম—কেরুর উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজারের চাহিদা ও রপ্তানি না করার বিষয়ে কোম্পানি কর্মকর্তার বক্তব্য।




