Homeশোবিজ টুডেনিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি নিয়েই চলে গেলেন অভিনেত্রী নাসিমা খান

নিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি নিয়েই চলে গেলেন অভিনেত্রী নাসিমা খান

সাদা-কালো পর্দার জনপ্রিয় মুখ, ঢাকা ও লাহোরের চলচ্চিত্রে অভিনয়, স্বাধীনতার পর স্বেচ্ছায় রুপালি জগৎ থেকে দূরে সরে যাওয়া—৮২ বছরের জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছিল এক অসহায় মায়ের অপেক্ষা

শোবিজ টুডে ডেস্ক

একসময় যাঁর উপস্থিতিতে সাদা-কালো পর্দা হয়ে উঠত প্রাণবন্ত, বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষার চলচ্চিত্রেই যিনি পেয়েছিলেন পরিচিতি, সেই অভিনেত্রী নাসিমা খানের জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন এক বিষাদময় গল্প। যে নারী একসময় চলচ্চিত্রের আলোয় নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন, জীবনের শেষ মাসগুলোতে তাঁর দিন কেটেছে নিখোঁজ ছোট ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায়। সংবাদমাধ্যমের সামনে আকুল কণ্ঠে জানিয়েছিলেন সন্তানের জন্য তাঁর দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার কথা। কিন্তু সেই আকুতির অবসান হওয়ার আগেই চলে গেলেন তিনি।

বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাসিমা খান আর নেই। ১১ অক্টোবর, রোববার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন এই অভিনেত্রী। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবারের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এবং চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

নাসিমা খানের মৃত্যুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রাথমিক বিকাশপর্বের আরেকজন শিল্পীর জীবনাবসান হলো। তাঁর জীবন ছিল শুধু অভিনয়ের সাফল্য কিংবা তারকাখ্যাতির ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্রজগতের উত্থান, বাংলা ও উর্দু ছবির সহাবস্থান, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের প্রতি টান এবং স্বাধীনতার পর একসময় স্বেচ্ছায় চলচ্চিত্র থেকে সরে যাওয়ার গল্প। আর মৃত্যুর আগে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনা হয়ে উঠেছিল নিখোঁজ ছোট ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি।

পুরান ঢাকার লালবাগে জন্ম, সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা

১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্ম নাসিমা খানের। তাঁর পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান ছিলেন ব্যবসায়ী। তাঁর দাদা খান বাহাদুর আবদুল জলিল ব্রিটিশ ভারতের ঢাকায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরিবারের সাংস্কৃতিক আবহ, পড়াশোনা এবং শৈশবের অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে।

পড়াশোনা করেছেন কামরুন্নেসা স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই নাচের প্রতিও আগ্রহ ছিল তাঁর। তবে যে সময়ে তিনি চলচ্চিত্রে আসেন, তখন বাঙালি মুসলিম নারীদের জন্য সিনেমায় কাজ করা সহজ ছিল না। সামাজিক রক্ষণশীলতা, পারিবারিক দ্বিধা এবং পেশাটি নিয়ে নানা ধরনের নেতিবাচক ধারণা ছিল। এসব বাধা সত্ত্বেও পরিবারের সম্মতিতে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। শর্ত ছিল, অভিনয়ের জন্য পড়াশোনায় অবহেলা করা যাবে না।

চলচ্চিত্রে প্রবেশের পেছনে অভিনেতা ও নির্মাতা খান আতাউর রহমানের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের পরিচিতিও ভূমিকা রেখেছিল। লালবাগে তাঁদের বাড়ির কাছেই থাকতেন খান আতা। তাঁর সুবাদে চলচ্চিত্রের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় নাসিমার। তখনকার চলচ্চিত্রজগত ছিল আজকের মতো বিস্তৃত নয়; ছবির সংখ্যা ছিল কম, শিল্পীদের পারস্পরিক যোগাযোগ ছিল ঘনিষ্ঠ এবং অনেক কিছুই শিখতে হতো কাজ করতে করতেই।

‘জাগো হুয়া সাভেরা’ থেকে বড় পর্দায় যাত্রা

১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘জাগো হুয়া সাভেরা’-তে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় নাসিমা খানের। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন তৃপ্তি মিত্র, খান আতাউর রহমানসহ আরও অনেকে। কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ছবিটির চিত্রনাট্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পেয়েছিল; ১৯৫৯ সালে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপদক অর্জন করে এটি।

প্রথম কাজের পর উর্দু চলচ্চিত্র ‘তানহা’য়ও অভিনয় করেন নাসিমা খান। সেখানে তাঁর সহশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন শামীম আরা, সুমিতা দেবী ও শবনম। তবে দর্শকমহলে তাঁর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা বাড়ে ১৯৬১ সালে সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘যে নদী মরু পথে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর। এরপর ‘সূর্যস্নান’ তাঁকে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করে।

ষাটের দশকের ঢাকার চলচ্চিত্র তখন নিজের ভাষা ও শৈলী নির্মাণের পথে। বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষাতেই তৈরি হচ্ছিল ছবি। নতুন শিল্পীরা আসছিলেন, নির্মাতারা গল্প বলার নতুন পদ্ধতি খুঁজছিলেন। সেই সময়ের চলচ্চিত্রে নাসিমা খান হয়ে ওঠেন পরিচিত মুখ। তাঁর অভিনয়জীবন একদিকে ঢাকার চলচ্চিত্রের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে তৎকালীন পাকিস্তানের চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গেও গড়ে তোলে সংযোগ।

ঢাকা থেকে লাহোর—দুই চলচ্চিত্রজগতেই কাজ

নাসিমা খানের অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা ছবিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে নির্মিত উর্দু ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন। সেখানকার চলচ্চিত্রজগতে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে ভিন্ন নির্মাণপদ্ধতি, শিল্পীদের কাজের ধরন এবং চলচ্চিত্রের পেশাগত পরিবেশ সম্পর্কে জানার সুযোগ দেয়।

লাহোরে নির্মিত তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘নয়ি লায়লা নয়া মজনু’ ও ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’—দুটিই ১৯৬৯ সালের চলচ্চিত্র। এ ছাড়া ছিল ‘আঁসু বন গয়ে মোতি’ (১৯৭০) এবং ‘রোড টু সোয়াত’ (১৯৭১)। ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’ ছবির প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্য দিকেও তাঁর আগ্রহের এটি একটি উদাহরণ।

নিজের আত্মকথনে নাসিমা লাহোরের চলচ্চিত্রজগতের কাজের পরিবেশ এবং সেখানকার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। ঢাকার পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার সময় চরিত্র, অভিনয় ও দৃশ্যের বিষয়ে যে আলোচনা হতো, লাহোরের কাজের পরিবেশে তার কিছুটা ভিন্নতা তিনি লক্ষ করেছিলেন। এসব স্মৃতিচারণে ফুটে ওঠে তাঁর পেশাগত সচেতনতা এবং অভিনয়কে কেবল তারকাখ্যাতির মাধ্যম নয়, একটি শিল্প হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।

যে ছবিগুলো তাঁকে দর্শকের স্মৃতিতে রেখেছে

নাসিমা খানের উল্লেখযোগ্য বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে ‘সূর্যস্নান’, ‘ধারাপাত’, ‘কার বউ’, ‘উজালা’, ‘বেগানা’, ‘আপন দুলাল’, ‘উলঝন’, ‘ম্যায় ভি ইনসান হু’, ‘দুই ভাই’, ‘গৌরী’, ‘আমার বৌ’ এবং ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’। এসব ছবিতে তিনি কাজ করেছেন আনোয়ার হোসেন, হাসান ইমাম, রহমান, গোলাম মুস্তাফা, আজিমসহ সে সময়ের একাধিক পরিচিত অভিনেতার সঙ্গে।

‘সূর্যস্নান’ তাঁর নায়িকাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। অন্যদিকে ‘দুই ভাই’-এ জহির রায়হানের মতো নির্মাতার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছিল। ‘কার বউ’ ছবির শুটিংয়ে দুর্ঘটনায় সিঁড়ি থেকে পড়ে আহত হওয়ার কথাও তিনি আত্মকথনে উল্লেখ করেছিলেন। এসব স্মৃতি শুধু একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এগুলো ষাটের দশকের চলচ্চিত্র নির্মাণের বাস্তবতা, শুটিংয়ের ঝুঁকি এবং শিল্পীদের কর্মনিষ্ঠারও দলিল।

সে সময়ে আজকের মতো অভিনয় প্রশিক্ষণের বিস্তৃত প্রতিষ্ঠান, কর্মশালা কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর প্রস্তুতির সুযোগ ছিল না। অভিজ্ঞ শিল্পী ও পরিচালকদের কাছ থেকে কাজ করতে করতেই শিখতেন নতুনরা। নাসিমার আত্মকথনে উঠে এসেছে, চলচ্চিত্রের সেটে শিল্পীরা অনেকটা পরিবারের মতো একসঙ্গে কাজ করতেন। কে কতটা পর্দাজুড়ে থাকলেন, তার চেয়ে চরিত্রের উপযোগী অভিনয়কে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন।

তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা ও জনপ্রিয়তার চেয়ে তাই বড় হয়ে ওঠে সময়টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। বাংলা চলচ্চিত্রের যে প্রজন্ম শিল্পমাধ্যমটির ভিত্তি নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল, নাসিমা খান ছিলেন তাঁদেরই একজন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত

নাসিমা খানের জীবনের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। লাহোরে কাজ করতে গিয়ে তিনি সেখানে সংসারও গড়ে তুলেছিলেন। চলাচলের সুবিধার জন্য গাড়ি কেনা, ঘর সাজানো—নিজের স্মৃতিচারণে সেখানকার জীবনের কথাও লিখেছেন তিনি। কিন্তু ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা শুরু হওয়ার খবর এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তারের সংবাদ তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

তিনি লিখেছেন, দেশের বাইরে থাকলেও নিজেকে পরবাসী মনে হতো; সংকটের সময়ে দেশের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। লাহোরে তখন তাঁর কাজের সুযোগ ও সংসার ছিল, কিন্তু দেশের টানকে তিনি সেসবের চেয়ে বড় মনে করেছিলেন।

স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, চলচ্চিত্রের পরিবেশে পরিবর্তন এবং নিজের শিল্পীসত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন নাসিমা। তাঁর আত্মকথন থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ‘মেঘের পর মেঘ’ ছিল সে সময়ের তাঁর শেষ চলচ্চিত্রগুলোর একটি। স্বাধীনতার পর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে নতুন ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব এলেও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।

জনপ্রিয়তা ছেড়ে সংসার ও সন্তানকে বেছে নেওয়া

নাসিমা খান ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্বামী চলচ্চিত্রজগতের কেউ ছিলেন না। তবে প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রে স্বামীর নাম ও পেশাগত জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। তাঁর নিজের আত্মকথনে সংসার, মাতৃত্ব এবং দুই সন্তানকে ঘিরে জীবনের কথা উঠে এসেছে।

১৯৭৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয় তাঁর প্রথম সন্তান উপল। মাতৃত্বের পর সন্তান পরিচর্যা ও সংসার তাঁর জীবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আত্মকথনে নাসিমা লিখেছিলেন, সন্তানদের সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই তখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। সেই সময়কার তারকাদের প্রচলিত গ্ল্যামারাস জীবনযাপনের প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল না বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। সাধারণ জীবন, সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং প্রাচুর্যের চেয়ে সচ্ছলতাকে গুরুত্ব দেওয়া ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অংশ।

চলচ্চিত্র থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে একসময় অনেকে বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ, অভিনয়জগতে তখন তাঁর পরিচিতি ছিল, আরও কাজ করার সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু তিনি মনে করতেন, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর নিজেরই। তাঁর কাছে অভিনয় ছেড়ে দেওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া নয়; বরং জীবনের অন্য দায়িত্বকে বেছে নেওয়া।

স্বাধীনতার পর একসময় চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে গেলেও পুরোপুরি পর্দা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেননি তিনি। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত টেলিভিশনে উপস্থাপনা করেছেন। পরবর্তী সময়ে আবারও কিছু চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেন। দীর্ঘ বিরতির পর তাঁকে দেখা যায় ‘মাতৃত্ব’, ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ ও ‘মাটির পিঞ্জিরা’র মতো ছবিতে। ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ তাঁর পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি।

স্বামীহারা জীবনে দুই ছেলে, বড় ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে

নাসিমা খানের দুই ছেলে। বড় ছেলে উপল, যাঁর আরেক পরিচিত নাম শাবাব নাসিম রহমান, পড়াশোনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন বলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল। মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আগের বছরের ডিসেম্বরে অল্প সময়ের জন্য দেশে এসেছিলেন তিনি।

নাসিমার স্বামী তাঁর আগেই মারা গিয়েছিলেন বলে ছোট ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার আকুতির সময় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ জীবনের শেষ দিকে এই অভিনেত্রী ছিলেন স্বামীহারা মা। বড় ছেলে থাকতেন দেশের বাইরে, আর ছোট ছেলেকে নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তা ক্রমেই গভীর হচ্ছিল।

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আশুলিয়া এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি করেন এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁর সন্ধান মেলেনি বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

ছেলের সন্ধান না পেয়ে নাসিমা খান সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তাঁর উদ্বেগ ছিল, ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে, নিরাপদে আছে কি না। একজন পরিচিত অভিনেত্রী হিসেবে নয়, তখন তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে ছিলেন এক উদ্বিগ্ন মা—যাঁর কাছে সন্তানের নিরাপত্তা ও ফিরে আসার অপেক্ষা ছাড়া অন্য সব পরিচয় যেন গৌণ হয়ে গিয়েছিল।

শেষ অধ্যায়ে রয়ে গেল অপূর্ণ অপেক্ষা

মৃত্যুর আগে নাসিমা খানের ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সংবাদপ্রতিবেদনে ইতিবাচক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশের সময়ও বড় ছেলে শাবাবের দেশে ফেরার অপেক্ষার কথা উঠে এসেছে। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বড় ছেলে দেশে ফিরলে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।

এই তথ্যের বাইরে পরিবারের অন্য সদস্যদের ব্যক্তিগত জীবন বা বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য তথ্য সীমিত। তাই সেসব বিষয়ে অনুমান করে কিছু বলার সুযোগ নেই। তবে প্রকাশিত তথ্য থেকেই বোঝা যায়, নাসিমা খানের জীবনের শেষ দিনগুলোতে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা কত বড় মানসিক ভার হয়ে উঠেছিল।

একসময় যিনি পর্দায় চরিত্রের প্রয়োজনে প্রেম, বেদনা, আনন্দ কিংবা সংঘাতকে জীবন্ত করে তুলতেন, শেষ জীবনে তাঁকেই নিজের ব্যক্তিগত শোকের সঙ্গে একা লড়তে হয়েছে। তাঁর সেই অপেক্ষার পরিণতি কী হবে, তা জানার আগেই জীবনের মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হলো তাঁকে।

ইতিহাসের পাতায় নাসিমা খান

নাসিমা খানের জীবনকে শুধু কয়েকটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের তালিকায় সীমাবদ্ধ করে দেখলে তাঁর অবদান পুরোপুরি ধরা পড়বে না। তিনি এমন এক সময়ে অভিনয় শুরু করেছিলেন, যখন ঢাকার চলচ্চিত্রশিল্প নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। বাংলা ও উর্দু ছবির মধ্যে শিল্পী ও নির্মাতাদের যাতায়াত ছিল, লাহোরের চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং অভিনয়ের অনেক কিছু শিখতে হতো কাজের অভিজ্ঞতা থেকে।

তিনি অভিনয় করেছেন, প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন, টেলিভিশনে উপস্থাপনা করেছেন এবং নিজের জীবন সম্পর্কে আত্মকথন লিখেছেন। স্বাধীনতার সময় দেশের টানে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়। আবার স্বাধীনতার পর চলচ্চিত্রের জৌলুস থেকে সরে এসে পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তও তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন অনেক শিল্পী রয়েছেন, যাঁদের কাজ ও অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে যথেষ্ট পরিচিত নয়। নাসিমা খানের প্রয়াণ সেই ইতিহাস আবার ফিরে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর অভিনীত ছবিগুলো সংরক্ষণ, চলচ্চিত্রের পুরোনো দলিল ও স্মৃতিচারণা সংরক্ষণ এবং প্রারম্ভিক প্রজন্মের শিল্পীদের অবদান নিয়ে নতুন করে গবেষণা করা জরুরি।

নাসিমা খান চলে গেছেন। কিন্তু ‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ‘যে নদী মরু পথে’, ‘সূর্যস্নান’ কিংবা ‘দুই ভাই’-এর মতো ছবিতে তাঁর কাজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। আর তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি মনে করিয়ে দেবে—তারকাখ্যাতির আড়ালেও একজন মানুষ থাকেন, যাঁর ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা ও অপেক্ষা সাধারণ মানুষের মতোই গভীর।

একসময় পর্দায় যিনি ছিলেন দর্শকের পরিচিত মুখ, জীবনের শেষ সময়ে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছিল—তিনি এক মা, যিনি হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা ছাড়তে পারেননি। নাসিমা খানের জীবনের এই বেদনাময় অধ্যায় হয়তো তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর মতোই দীর্ঘদিন দর্শকের মনে থেকে যাবে।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪ডটকম, চ্যানেল আই অনলাইন, বাংলা মুভি ডেটাবেজ, এনটিভি অনলাইন, আরটিভি

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments