জামায়াতের বহিষ্কৃত এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যু ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন; জুলাইয়ের ভাইরাল ভিডিও, বিয়ে নিয়ে নথিগত অসঙ্গতি, মগবাজারের ঘটনার পর্ব, ন্যাম ভবনে মৃত্যুর সময়ের ব্যবধান এবং এবার আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় এমপি ও তাঁর প্রথম স্ত্রী গ্রেপ্তার—ফরেনসিক ও স্বাধীন তদন্তেই বের হতে পারে প্রকৃত সত্য
টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সংসদ সদস্যদের সরকারি আবাসিক ভবন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত মোছা. মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে তীব্র প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলে থানা-পুলিশের পাশাপাশি সিআইডি, পিবিআই ও ডিবির সদস্যরা যায়; সিআইডি ক্রাইম সিনের কাজ করে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা নাকি অন্য কিছু—উদ্ধারের রাতেই পুলিশ জানায়, তা তখনো নিশ্চিত নয়। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা খানমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শেরেবাংলা নগর থানায় নেওয়া হয়। পরে ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১টার দিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। অর্থাৎ তদন্ত এখন আর কেবল অস্বাভাবিক মৃত্যু যাচাইয়ের পর্যায়ে নেই; আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
মাত্র দুই মাস আগে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্র ছিলেন মরিয়ম
মরিয়ম খাতুন সর্বসাধারণের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন ২০২৬ সালের জুলাইয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। শুরুতে গাজী নজরুলের সমর্থকদের কেউ কেউ ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছিলেন। পরে গাজী নজরুল নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই তরুণীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। প্রথম স্ত্রী মাকছুদা, মরিয়ম এবং মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহও পৃথক বক্তব্যে বিয়ের দাবি সমর্থন করেছিলেন। জাগোনিউজের প্রতিবেদনে তখন স্পষ্ট বলা হয়েছিল, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। অর্থাৎ ভিডিও নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে নিশ্চিত তথ্য ছিল—গাজী নজরুল নিজেই ভিডিওতে থাকা নারীকে তাঁর স্ত্রী হিসেবে প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন। এই ঘটনাটির পর সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ দ্রুত বাড়ে। ২২ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করে। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হয় এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশন ও স্পিকারকে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ জুলাইয়ের ভিডিওকাণ্ড থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মৃত্যু পর্যন্ত সময়টা খুব দীর্ঘ নয়। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে একজন তরুণীর ব্যক্তিগত জীবন, পরিচয়, বিয়ে এবং সামাজিক অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক তৈরি হয়; এরপর তাঁর মরদেহ উদ্ধার হয় এমন একটি ফ্ল্যাট থেকে, যেখানে তিনি সংসদ সদস্যের সঙ্গে ছিলেন।
বিয়ের তারিখ ও কাবিননামা নিয়েও ছিল প্রশ্ন
গাজী নজরুল ইসলাম প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ১৭ জুন ২০২৬ পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়মকে বিয়ে করেছেন। মরিয়মের বাবা ও প্রথম স্ত্রীও একই দাবি করেছিলেন। প্রকাশ্যে আসা কাবিননামায় তিন লাখ টাকা দেনমোহরের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের নথি নিয়ে তখনই প্রশ্ন ওঠে। যুগান্তরের প্রতিবেদনে কাবিননামা নিবন্ধনকারী কাজী মাওলানা বিএএম বাকী বিল্লাহ বলেন, বিয়ে কোথায় বা কীভাবে হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি অবগত ছিলেন না; ফোনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কাবিননামা প্রস্তুত করা হয় এবং ১৭ জুনকে বিয়ের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করতে বলা হয়েছিল। পরদিন কনে ও তাঁর অভিভাবক এসে নথিতে স্বাক্ষর করেন—এমন বক্তব্যও কাজীর। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল মরিয়মের একটি বায়োডাটা। জাগোনিউজের হাতে আসা ওই নথিতে ২২ জুন গাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষর ও ‘জোর সুপারিশ করছি’ লেখা ছিল। কিন্তু বৈবাহিক অবস্থার ঘরে লেখা ছিল ‘অবিবাহিত’। অর্থাৎ ১৭ জুন বিয়ের দাবি সত্য হলে মাত্র পাঁচ দিন পর তাঁর বৈবাহিক অবস্থায় ‘অবিবাহিত’ কেন লেখা ছিল—সেটি তখনই উত্তরহীন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এখানে আরও একটি নথিগত অসঙ্গতি আছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে মরিয়মের বয়স ১৯ বলা হলেও প্রকাশ্যে আসা কাবিননামায় তাঁর জন্মতারিখ ২২ মে ২০০৮ উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই নথি সত্য হলে ১৭ জুন ২০২৬-এ তাঁর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার কিছুদিন পরের। বয়সের এই পার্থক্যও তদন্তে মূল নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
মগবাজারের সেই ঘটনার সঙ্গে মৃত্যুর যোগসূত্র খুঁজতে হবে
ভাইরাল ভিডিওর পর গাজী নজরুল ইসলাম যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তাঁর দাবি ছিল, ১৩ জুলাই তিনি প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী ও মরিয়মের বাবাকে নিয়ে মগবাজারে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর গাড়িচালক ও মরিয়মের মামা ওবায়দুল্লাহ কয়েকজন ব্যক্তিকে নিয়ে তাঁদের জিম্মি করেন, এক লাখ টাকা নেন এবং পরে আরও টাকা দাবি করেন। একই ঘটনায় তাঁদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত গোপনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও তিনি করেছিলেন। অন্যদিকে ওই ঘটনার পর মরিয়মের মামা ও গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান পল্লবী থানায় গাজী নজরুল ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে তাঁকে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। গাজী নজরুল ওই মামলায় হাইকোর্ট থেকে আট সপ্তাহের জামিন পেয়েছিলেন এবং ২০ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর দিনই আদালতে সেই জামিননামা দাখিল করেন। এই ঘটনাপ্রবাহ এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মরিয়মের মৃত্যুর ঠিক আগে তাঁর জীবনকে ঘিরে যে সংঘাত, ভিডিও ফাঁস, ব্ল্যাকমেইল, পারিবারিক বিরোধ ও মামলা তৈরি হয়েছিল—সেগুলোর পূর্ণ নথি তদন্তকারীদের হাতে থাকা দরকার।
মৃত্যুর দিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা—সময়ের হিসাবই হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
ঘটনার পর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঘটনাস্থলে থাকা এক পুলিশ সদস্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, গাজী নজরুল ইসলাম তাঁর দুই স্ত্রীকে নিয়ে দুপুরের খাবার খান। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তাঁরা আলাদা কক্ষে যান। পরে বিকেল ৫টার পর মরিয়মকে ডাকতে গিয়ে তাঁর কক্ষের দরজা বন্ধ পাওয়া যায়। জানালা দিয়ে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পাওয়ার পর পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। অন্যদিকে ডিএমপির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে খবর পায় এবং মৃত্যুর সময় আনুমানিক বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে হতে পারে বলে একজন কর্মকর্তা প্রাথমিক ধারণা দিয়েছিলেন। এই সময়ের ব্যবধান তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রশ্ন হচ্ছে—বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে পুলিশকে খবর দেওয়া পর্যন্ত কী ঘটেছিল? কক্ষে কে ঢুকেছিলেন? কে প্রথম মরিয়মকে ডাকতে গিয়েছিলেন? দরজা কেন বন্ধ ছিল? কক্ষটি কখন থেকে বন্ধ? জানালা দিয়ে মরদেহ দেখা গেল কীভাবে? মরদেহ উদ্ধারের আগে কক্ষে কেউ ঢুকেছিল কি না? ফ্ল্যাটের সিসিটিভিতে কারা কখন কোথায় চলাচল করেছেন? ফোনে কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি, ফোনের তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য মিলিয়ে বের করা সম্ভব।
ফ্ল্যাটে কে ছিলেন—এ প্রশ্নের উত্তরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
ঘটনার রাতে পুলিশ গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধারকালে তাঁরা ফ্ল্যাটে ছিলেন; আবার পুলিশের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেছেন, ঘটনাস্থলে তাঁদের উপস্থিতির সুনির্দিষ্ট সময়সহ বিষয়গুলো তদন্তাধীন। এই দুই তথ্যের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব আছে কি না, তা তদন্তেই পরিষ্কার করতে হবে। কারণ মৃত্যুর সম্ভাব্য সময় যদি বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে হয়, তাহলে ওই সময় ফ্ল্যাটে কারা ছিলেন—এটি মামলার অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। শুধু মৌখিক বক্তব্য নয়, সিসিটিভি, মোবাইল ফোনের অবস্থান-তথ্য, কলের সময়, ফ্ল্যাটে প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য এবং আশপাশের সাক্ষীদের বক্তব্য দিয়ে সময়ের একটি নির্ভুল ধারাবাহিকতা তৈরি করা দরকার।
দরজা বন্ধ ছিল—এটি কি আত্মহত্যার প্রমাণ?
না। একটি কক্ষে ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যাওয়াকে একা আত্মহত্যার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না। একইভাবে ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া মানেই হত্যা—এমন সিদ্ধান্তেও যাওয়া যায় না। এখানেই ময়নাতদন্ত ও ঘটনাস্থলের ফরেনসিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ফরেনসিক তদন্তে মৃত্যুর ধরন নির্ধারণের সময় শুধু গলায় দাগ আছে কি না দেখা হয় না; শরীরে অন্য আঘাত, মৃত্যুর আগে ও পরে আঘাতের সম্ভাব্য চিহ্ন, নমুনা পরীক্ষা, বিষক্রিয়া বা মাদকজাতীয় পদার্থের উপস্থিতি, নখ ও পোশাকের আলামত, দড়ি বা ওড়নার সঙ্গে সম্পর্কিত চিহ্ন এবং ঘটনাস্থলের বিন্যাস—সবকিছু মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ময়নাতদন্তের আগে থেকেই আত্মহত্যা বা হত্যা—কোনো একটি ব্যাখ্যায় আটকে না যাওয়া।
মরিয়মের ফোন ও ডিজিটাল জীবন কত কিছু বলতে পারে
এখনকার তদন্তে শুধু কাগজের নথি যথেষ্ট নয়। মরিয়মের ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বার্তা, কল রেকর্ড, সাম্প্রতিক যোগাযোগ, ছবি ও ভিডিওর উৎস এবং ১৩ জুলাইয়ের ঘটনার ডিজিটাল রেকর্ড বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে জুলাইয়ের ভিডিও কোথা থেকে ধারণ করা হয়েছিল, কে ধারণ করেছিল, কীভাবে ছড়িয়েছিল, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার আগে ও পরে মরিয়মের সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ। কারও বিরুদ্ধে অপরাধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট যথেষ্ট নয়। কিন্তু ডিজিটাল সময়রেখা তৈরি করলে ঘটনার আগে-পরে কারা যোগাযোগে ছিল এবং কী পরিবর্তন ঘটেছিল, তা বের করা সম্ভব।
ভিডিও ভাইরালের পর মরিয়মের জীবনে কী ঘটেছিল?
এই প্রশ্নটি হয়তো তদন্তের সবচেয়ে মানবিক অংশ। জুলাইয়ের আগে মরিয়ম ছিলেন তুলনামূলকভাবে অজ্ঞাত এক তরুণী। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর নাম, পরিচয়, পরিবার, বিয়ে, বয়স—সবকিছু প্রকাশ্য আলোচনায় আসে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা হয়। গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর মধ্যেই বিয়ের কাবিননামা, বায়োডাটা, কাজীর বক্তব্য এবং মগবাজারের ঘটনাকে ঘিরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়। মরিয়ম এসব ঘটনার পর মানসিকভাবে কী অবস্থায় ছিলেন—এটি এখন অনুমান করে বলা ঠিক হবে না। তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি, বার্তা, বন্ধু বা আত্মীয়দের সঙ্গে সাম্প্রতিক যোগাযোগ, চিকিৎসা বা কাউন্সেলিংয়ের নথি থাকলে তদন্তকারীরা সেগুলো দেখতে পারেন। তিনি আত্মহত্যা করে থাকলেও কী কারণে সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন—আর সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে অন্য কারও আচরণ, হুমকি, চাপ, প্ররোচনা বা নির্যাতনের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এটি আলাদা তদন্তের বিষয়।
আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা কেন গুরুত্বপূর্ণ
গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে—এটি নিজেই একটি নতুন আইনি অধ্যায়। তবে গ্রেপ্তার হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। মামলার অভিযোগ, সাক্ষ্য, ফরেনসিক তথ্য এবং তদন্তের ফল আদালতেই নির্ধারিত হবে। তবে এই মামলার ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের পথ খুলেছে। এখন তদন্তকারীদের খুঁজে দেখতে হবে—মরিয়মের মৃত্যুর আগে তাঁর ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি হয়েছিল কি না, তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না, তাঁকে অপমান বা ভয় দেখানো হয়েছিল কি না, তাঁকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়েছিল কি না এবং এসবের সঙ্গে কারও সরাসরি যোগাযোগ বা ভূমিকা ছিল কি না। এখানে ভিডিও ফাঁসের ঘটনাও বাদ দেওয়া যাবে না।
হত্যা হলে কী প্রমাণ খুঁজতে হবে, আত্মহত্যা হলে কী প্রশ্নের উত্তর দরকার
যদি হত্যার সন্দেহ থাকে, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে ঘটনাস্থলে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতির কোনো চিহ্ন, শরীরে প্রতিরোধের চিহ্ন, অন্য আঘাত, আঙুলের ছাপ বা ডিএনএ, কক্ষের দরজা-জানালার অবস্থা, সিসিটিভি ও ডিজিটাল তথ্য। আর যদি আত্মহত্যা হিসেবে ময়নাতদন্ত ও তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়, তাহলেও তদন্ত শেষ হয়ে যাবে না। তখন প্রশ্ন হবে—কেন? মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল? কার সঙ্গে তাঁর শেষ যোগাযোগ? কোনো বার্তা ছিল কি? কেউ কি তাঁকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছিল? সামাজিক বা পারিবারিক চাপের কোনো নথি আছে কি? অর্থাৎ ‘আত্মহত্যা’ শব্দটি তদন্তের শেষ নয়; অনেক ক্ষেত্রে সেটিই পরবর্তী প্রশ্নের শুরু।
ন্যাম ভবনের নিরাপত্তা ও সিসিটিভি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ঘটনাটি সাধারণ কোনো বাসাবাড়িতে নয়; সংসদ সদস্যদের সরকারি আবাসিক ভবনে। তাই ভবনের প্রবেশপথ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিসিটিভি, দর্শনার্থীর রেজিস্টার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ২০ সেপ্টেম্বরের ঘটনার আগে ও পরে ফ্ল্যাটে কারা গিয়েছেন, মরিয়মের সঙ্গে শেষ দেখা কার, কে পুলিশকে খবর দিয়েছেন এবং পুলিশের আসার আগে ঘটনাস্থলে কারা ছিলেন—এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর তৈরি করা প্রয়োজন।
জুলাইয়ের বিতর্ক থেকে সেপ্টেম্বরের মৃত্যু—দুই ঘটনাকে আলাদা করে দেখা যাবে কি?
আইনগতভাবে দুটো ঘটনাকে এক করে নেওয়া যাবে না। কিন্তু তদন্তগতভাবে জুলাইয়ের ঘটনা অবশ্যই সেপ্টেম্বরের মৃত্যুর সম্ভাব্য পটভূমি হিসেবে যাচাই করা দরকার। ১৩ জুলাইয়ের মগবাজারের ঘটনা, ২০-২১ জুলাইয়ের ভিডিও বিতর্ক, ২২ জুলাই জামায়াত থেকে বহিষ্কার, পরবর্তী মামলাগুলো, আগস্টে গাজী নজরুলের জামিন এবং ২০ সেপ্টেম্বরের মৃত্যু—এই পুরো সময়ের একটি দিনভিত্তিক সময়রেখা তৈরি করা গেলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে। এই সময়রেখায় মরিয়মের ব্যক্তিগত ফোন ও সামাজিক যোগাযোগের তথ্য যুক্ত করা গেলে তদন্ত আরও নির্দিষ্ট হতে পারে।
মরিয়মকে কেন্দ্র করে এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর চাই
মরিয়মের মৃত্যুর সময় নির্ভুলভাবে কত? মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কার শেষ কথা হয়েছিল? তাঁর ফোনে শেষ কল ও বার্তা কার? মৃত্যুর সময় ফ্ল্যাটে কারা ছিলেন? সিসিটিভিতে কী দেখা গেছে? কক্ষের দরজা কে খুলেছে বা খুলতে পারেনি? কক্ষে প্রবেশের আগে কেউ আলামত স্পর্শ করেছে কি না? মরদেহের অবস্থান ও ঘটনাস্থলের বিন্যাস ময়নাতদন্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না? জুলাইয়ের ভিডিওকাণ্ডের পর তাঁর ওপর কোনো চাপ বা হুমকি এসেছিল কি? ১৩ জুলাইয়ের মগবাজার ঘটনার সঙ্গে মৃত্যুর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক আছে কি? কাবিননামা ও বায়োডাটার অসঙ্গতির ব্যাখ্যা কী? মরিয়মের বয়স ও পরিচয়সংক্রান্ত নথির প্রকৃত অবস্থা কী? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তাঁর মৃত্যু কি তিনি নিজে ঘটিয়েছেন, নাকি অন্য কেউ এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যাতে তাঁর মৃত্যু ঘটে?
এই তদন্তে কোনো পক্ষের গল্পই একমাত্র সত্য ধরে নেওয়া যাবে না
গাজী নজরুল ইসলাম জুলাইয়ে বলেছিলেন তিনি মরিয়মকে বিয়ে করেছেন এবং তাঁদের ব্যক্তিগত ভিডিও ষড়যন্ত্র করে ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মরিয়মও তখন নিজেকে তাঁর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর বাবা ও প্রথম স্ত্রীও বিয়ের দাবি সমর্থন করেছিলেন। আবার একই সময়ে বিয়ের নথি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং কাজীর বক্তব্যে অসঙ্গতির কথা প্রকাশিত হয়। এখন মরিয়ম আর নিজের বক্তব্য দেওয়ার অবস্থায় নেই। ফলে তাঁর হয়ে কেউ যেন অনুমানভিত্তিক কোনো গল্প দাঁড় করাতে না পারে—এটি তদন্তের একটি বড় নৈতিক দায়িত্ব। একইভাবে গাজী নজরুল বা তাঁর প্রথম স্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও তদন্ত ও আদালতের প্রমাণ ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বলা যাবে না।
টুডে টিভি বিডির অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ
মরিয়ম খাতুনের মৃত্যু এমন এক প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, যেখানে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন প্রকাশ্য বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছিল। গাজী নজরুল তাঁকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন; বিয়ে নিয়ে নথিগত প্রশ্ন উঠেছিল; গাজী নজরুল দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন; ১৩ জুলাইয়ের ঘটনার পর হত্যাচেষ্টা মামলা হয়েছিল; ২০ সেপ্টেম্বর তিনি আদালতে জামিননামা জমা দেন; আর সেই দিনই ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে মরিয়মের মরদেহ পাওয়া যায়। এই ঘটনাগুলোর সময়ক্রম সন্দেহ ও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। কিন্তু সময়ক্রম নিজে হত্যার প্রমাণ নয়। একইভাবে ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া আত্মহত্যার চূড়ান্ত প্রমাণও নয়। এখন একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হলো পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও ফরেনসিকভিত্তিক তদন্ত। মরিয়মের ফোন ও ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। ন্যাম ভবনের সিসিটিভি জব্দ করে বিশ্লেষণ করতে হবে। কক্ষের আলামত ও প্রবেশ-নিরাপত্তার তথ্য পুনর্গঠন করতে হবে। ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করতে হবে। ১৩ জুলাইয়ের মগবাজার ঘটনার নথিও এই তদন্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। আর যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন, তাহলেও প্রশ্ন শেষ হবে না—কেউ তাঁকে সেই সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছিল কি না। আর যদি প্রমাণ পাওয়া যায় এটি আত্মহত্যা ছিল না, তাহলে দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন ১৮/১৯ বছরের তরুণীর মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেক দফা বিচার নয়—প্রয়োজন প্রমাণের বিচার। কারণ মরিয়ম এখন তাঁর পক্ষে কথা বলতে পারবেন না। তাঁর হয়ে কথা বলবে শুধু তাঁর রেখে যাওয়া আলামত, নথি, ফোন, সময়রেখা এবং ফরেনসিক প্রমাণ।
মরিয়ম খাতুনের মৃত্যু—আত্মহত্যা নাকি হত্যা—এর উত্তর এখন অনুমানে নয়, তদন্তেই খুঁজে বের করতে হবে। আর সেই তদন্ত যেন কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার অবস্থান কিংবা জুলাইয়ের বিতর্কের চাপে প্রভাবিত না হয়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, যুগান্তর, জাগোনিউজ২৪, ইত্তেফাক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস এবং প্রকাশ্য পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট নথি।




