২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবার পার্লামেন্ট নির্বাচন করছে রাশিয়া। তিন দিনের ভোটে ৪৫০ আসনের স্টেট দুমার সদস্য নির্বাচিত হবেন; যুদ্ধ, কঠোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও বিরোধী কণ্ঠের সীমিত উপস্থিতি এবারের ভোটকে বিশেষভাবে আলোচিত করেছে।
মস্কো, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাশিয়ায় আজ, ১৮ সেপ্টেম্বর, পার্লামেন্ট নির্বাচন শুরু হচ্ছে। ভোট চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। দেশটির ৪৫০ আসনের স্টেট দুমার জন্য ভোটের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে গভর্নর ও আঞ্চলিক আইনসভা নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর এটিই রাশিয়ার প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ১৬ সেপ্টেম্বর এক ভাষণে ভোটারদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান এবং ভোটকে দেশের ঐক্য ও যুদ্ধের প্রতি সমর্থনের একটি সূচক হিসেবে তুলে ধরেন।
তিন দিনে ভোট, আছে ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাও
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৮, ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর তিন দিন ভোট হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরাসরি ভোটের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ভোটিংও রয়েছে।
রুশ নির্বাচন ব্যবস্থায় বহুদিন ধরেই একাধিক দিনের ভোট এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবহৃত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, এতে ভোটারদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ে এবং বড় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভোট আয়োজন সহজ হয়।
এবারও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচন একই সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে জাতীয় পার্লামেন্টের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটপর্ব।
যুদ্ধই হয়ে উঠেছে নির্বাচনের বড় পটভূমি
রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো অন্যতম প্রধান বিষয়। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রুশ ভূখণ্ডে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা, জ্বালানি অবকাঠামোয় ক্ষতি এবং সামরিক খরচ নিয়ে চাপও বেড়েছে।
পুতিন নির্বাচনের আগে দেশবাসীর উদ্দেশে যুদ্ধ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন। তার দল ইউনাইটেড রাশিয়া বর্তমানে স্টেট দুমার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ন্ত্রণ করে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরের সুযোগ সীমিত হয়েছে এবং ইয়াব্লোকো পার্টির মতো যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের দল ও প্রার্থীরা নানা আইনি বাধার মুখে পড়েছে। ইয়াব্লোকো দলকে দলীয় তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাটিও এবারের নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা তৈরি করেছে।
অধিকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চল নিয়ে বিরোধ
রাশিয়া ইউক্রেনের যে কয়েকটি অঞ্চল নিজের সঙ্গে যুক্ত করার দাবি করেছে, সেসব এলাকার কিছু অংশেও নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে। ইউক্রেন ও বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ এসব ভূখণ্ডে রাশিয়ার নির্বাচনী কার্যক্রমকে স্বীকৃতি দেয় না।
এই কারণে এবারের ভোট শুধু রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, ইউক্রেন যুদ্ধের আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
রাশিয়ার সরকার এসব ভূখণ্ডকে নিজেদের সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে ইউক্রেনের অবস্থান হলো, এগুলো তার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভূখণ্ড। এই মতবিরোধ নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে।
ভোটের ফলের চেয়ে নজরে থাকছে রাজনৈতিক পরিবেশ
স্টেট দুমা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের আগে কোনো চূড়ান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত টানা সম্ভব নয়। তবে এবারের ভোটে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর থাকবে ভোটের পরিবেশ, অংশগ্রহণের হার, ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থা, বিরোধী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধের প্রভাব—এসব বিষয়ের দিকে।
রয়টার্স ও এপি উভয়েই উল্লেখ করেছে, রাশিয়ার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বর্তমানে আগের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত। সরকার বলছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এসব ব্যবস্থা প্রয়োজন।
আগামী ২০ সেপ্টেম্বর ভোট শেষ হওয়ার পর প্রথম ধাপে আনুষ্ঠানিক ফলাফল সামনে আসবে। এরপরই স্পষ্ট হবে নতুন স্টেট দুমার গঠন কতটা বদলেছে এবং যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক পরিবেশের প্রভাব নির্বাচনের ওপর কীভাবে পড়েছে।
তথ্যসূত্র: Reuters, Associated Press (AP), Russia Central Election Commission




