বাণিজ্যিক বিশ্ব প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লকে ভাগ হয়ে গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপি প্রায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ কমতে পারে বলে সতর্কতা
জেনেভা | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা এখন এমন এক সংকটময় পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দ্রুত সংস্কার না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিভাজন তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন বা ডব্লিউটিও।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, বর্তমান বাণিজ্য নিয়মগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। অর্থনৈতিক শক্তির পরিবর্তন, রাষ্ট্রের বাড়তি হস্তক্ষেপ, ডিজিটাল বাণিজ্যের বিস্তার এবং বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বাণিজ্য ব্লকে ভাগ হলে কী হতে পারে
ডব্লিউটিওর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতি যদি প্রতিদ্বন্দ্বী বাণিজ্য ব্লকে ভাগ হয়ে যায়, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপি সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
একই সময়ে বৈশ্বিক রপ্তানি প্রায় ২৭ শতাংশ কমার ঝুঁকি রয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বাড়বে, সরবরাহব্যবস্থা আরও জটিল হবে এবং অনেক দেশ তাদের সবচেয়ে কার্যকর বাণিজ্য অংশীদারের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হতে পারে।
সহযোগিতা বাড়ালে উল্টো চিত্র
ডব্লিউটিও বলছে, দেশগুলো যদি বহুপাক্ষিক বাণিজ্য সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করে, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপি প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বৈশ্বিক রপ্তানি প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো এর মাধ্যমে বেশি সুবিধা পেতে পারে। কারণ এসব দেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজার, রপ্তানি এবং বিদেশি বিনিয়োগের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরশীল।
পুরোনো নিয়মের সঙ্গে নতুন অর্থনীতির সংঘাত
বর্তমান বাণিজ্যব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ডিজিটাল অর্থনীতি। ডেটা, অনলাইন সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল কর এবং প্রযুক্তি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এমনভাবে বেড়েছে, যার অনেকটাই বর্তমান নিয়ম তৈরির সময় কল্পনাও করা হয়নি।
ফলে ডব্লিউটিওকে এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়ম তৈরি করতে হবে।
বড় শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বও বড় বাধা
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
অনেক দেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও শিল্পপণ্যের সরবরাহে একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি যৌক্তিক হলেও অতিরিক্ত বিচ্ছিন্নতা বিশ্ব অর্থনীতির দক্ষতা কমিয়ে দিতে পারে।
দরিদ্র দেশগুলোর ঝুঁকি বেশি
ডব্লিউটিওর সতর্কতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিশ্ব বাণিজ্য বিভক্ত হলে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কারণ এসব দেশের অনেকগুলোই সীমিত সংখ্যক পণ্য রপ্তানি করে এবং বৈদেশিক বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বাণিজ্য বাধা বাড়লে তাদের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হতে পারে।
এখন কী করতে চায় ডব্লিউটিও
ডব্লিউটিও সদস্য দেশগুলোকে দ্রুত সংস্কার আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি, বিরোধ নিষ্পত্তি, ভর্তুকি এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপের মতো বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় আনতে চায় সংস্থাটি।
বিশ্ব অর্থনীতি যখন একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বাণিজ্যব্যবস্থার আরও বিভক্ত হয়ে পড়া নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
তথ্যসূত্র: World Trade Organization (WTO), Reuters।




