ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের তদন্তে একসময় একের পর এক অগ্রগতি এসেছিল; মরদেহের অংশ উদ্ধার থেকে ডিএনএ শনাক্তকরণ, একাধিক গ্রেপ্তার ও চার্জশিট—তারপরও ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের মামলার তদন্ত অসম্পূর্ণ। মূল সন্দেহভাজন আক্তারুজ্জামান শাহীন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে
টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান
২০২৪ সালের মে মাসে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরটি বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ঝিনাইদহ-৪ আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে নিখোঁজ। কয়েক দিনের মধ্যে তদন্তকারীরা জানান, তিনি খুন হয়েছেন। এরপর সামনে আসে আরও ভয়াবহ তথ্য—কলকাতার নিউ টাউনের একটি ফ্ল্যাটে হত্যার পর তাঁর মরদেহ টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
শুরুতে ঘটনাটি ছিল নিখোঁজের রহস্য। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা পরিণত হয় আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরোনো এক হত্যামামলায়। বাংলাদেশে গ্রেপ্তার, কলকাতায় গ্রেপ্তার, নেপালে আটক, সেফটিক ট্যাংক ও খাল থেকে মানবদেহের অংশ উদ্ধার, ডিএনএ পরীক্ষা, দীর্ঘ চার্জশিট—সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল দ্রুতই পুরো চক্রের মুখোশ খুলে যাবে।
কিন্তু দুই বছর পর প্রশ্নটি আবার ফিরে এসেছে—এই মামলার আসল অগ্রগতি কতটা হলো?
২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে করা মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভারতীয় ফরেনসিক ও তদন্ত-সংক্রান্ত নথির অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশের তদন্তসংশ্লিষ্টরা। একই সময়ে মামলার অন্যতম প্রধান আসামি বা সন্দেহভাজন আক্তারুজ্জামান শাহীন এখনো অধরা।
১২ মে কলকাতা, ১৩ মে নিখোঁজ
আনোয়ারুল আজীম আনার ২০২৪ সালের ১২ মে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে যান। কলকাতায় তিনি পরিচিত গোপাল বিশ্বাসের বাড়িতে ওঠেন। পরদিন চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা বলে বের হন। এরপর তাঁর পরিবারের কাছে এমন কিছু বার্তা যায়, যেগুলো পরে তদন্তে সন্দেহ তৈরি করে। ২২ মে ভারতীয় ও বাংলাদেশি পুলিশ নিশ্চিত করে যে তিনি খুন হয়েছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের নথি অনুযায়ী, ১৩ মে দুপুরের পর আনারকে নিউ টাউনের সঞ্জীবা গার্ডেনের একটি ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেখা যায়। সিসিটিভিতে তাঁকে প্রবেশ করতে দেখা গেলেও বের হতে দেখা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের তদন্ত নথিতে আরও বলা হয়, পরে ওই ফ্ল্যাটের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন দ্রুত ভারত ছাড়েন এবং তাদের গতিবিধি তদন্তে আসে।
তদন্তকারীদের মতে, সঞ্জীবা গার্ডেনের ফ্ল্যাটটিই ছিল হত্যার মূল ঘটনাস্থল।
বন্ধু, ব্যবসায়ী ও সম্ভাব্য ‘মাস্টারমাইন্ড’: আক্তারুজ্জামান শাহীন
আনোয়ারুল আজীমের ঘনিষ্ঠ পরিচিত ও ব্যবসায়িক সহযোগী আক্তারুজ্জামান শাহীন খুব দ্রুত তদন্তের কেন্দ্রে চলে আসেন। বাংলাদেশি ও ভারতীয় তদন্তকারীদের ভাষ্যে তাঁকেই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী বা mastermind হিসেবে সন্দেহ করা হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং হত্যার পর ভারত ছাড়েন বলে তদন্তে উঠে আসে।
তদন্তকারীদের অভিযোগ ছিল, হত্যার জন্য ভাড়া করা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ ও অর্থের ব্যবস্থাপনায় শাহীনের ভূমিকা ছিল। ২০২৪ সালের মে মাসের শেষদিকে The Daily Star জানিয়েছিল, তদন্তকারীদের ধারণা ছিল শাহীনের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল এবং তিনিই তাদের নিয়োগ করেছিলেন।
কিন্তু এখানেই মামলার সবচেয়ে বড় ফাঁক।
যে ব্যক্তিকে তদন্তের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে, তাকেই এখনো আইনের আওতায় আনা যায়নি।
২০২৪ সালের মে মাসে ভারতীয় তদন্ত সংস্থা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছিল। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকায় পশ্চিমবঙ্গ CID সেই পথ বিবেচনা করছিল। বাংলাদেশও শাহীনের সন্ধানে ইন্টারপোলসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা জানিয়েছিল।
দুই বছর পরও তাঁর গ্রেপ্তার বা প্রত্যর্পণ সম্পর্কে প্রকাশ্য কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতির খবর নেই।
খুনের ধরন: আধা ঘণ্টায় হত্যা, পরে দেহ গায়েবের পরিকল্পনা
ডিবির নেতৃত্বে ২০২৪ সালের মে মাসে কলকাতায় গিয়ে তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল পুনর্গঠন করেন। তদন্তে তখন বলা হয়েছিল, ১৩ মে দুপুর ২টা ৫১ মিনিটের দিকে আনার ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন এবং এর অল্প সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটে। তদন্তে আরও উঠে আসে, পরে মরদেহ ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে কয়েক ঘণ্টা রাখা হয়।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের নথিতে হত্যার পর দেহের অংশ বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
এই পর্যায়ে তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল—মরদেহের অংশ উদ্ধার, হত্যার অস্ত্র খুঁজে বের করা এবং হত্যায় প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণ।
সেফটিক ট্যাংক ও খালে মিলল মানবদেহের অংশ
২৮ মে ২০২৪ নিউ টাউনের ওই ফ্ল্যাটের সেফটিক ট্যাংক থেকে মাংস ও চুলের অংশ উদ্ধার করা হয়। বাংলাদেশি তদন্তকারীদের অনুরোধের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গ CID সেফটিক ট্যাংক ও ড্রেনেজ লাইন তল্লাশি করেছিল।
এরপর বাগজোলা খাল থেকেও হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়। ফরেনসিক পরীক্ষায় সেগুলো মানুষের বলে নিশ্চিত করা হয়েছিল।
এই উদ্ধার ছিল মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ forensic অগ্রগতিগুলোর একটি।
কারণ প্রথমদিকে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—আনার সত্যিই মারা গেছেন কি না এবং পাওয়া দেহাংশ তাঁর কি না।
ডিএনএ মিলে গেল: দেহাংশ আনারেরই
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গ CID-এর ফরেনসিক পরীক্ষায় সেফটিক ট্যাংক ও খাল থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের সঙ্গে আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিনের ডিএনএ মিলেছে বলে নিশ্চিত করা হয়। Central Forensic Science Laboratory-তে পরীক্ষার মাধ্যমে এই শনাক্তকরণ করা হয়েছিল।
এর ফলে আনারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সবচেয়ে বড় forensic অনিশ্চয়তাটি দূর হয়।
অর্থাৎ এখন আর প্রশ্ন নেই—দেহাংশগুলো কার?
প্রধান প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—পুরো হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ ও পরিকল্পনার সঙ্গে কারা যুক্ত ছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে কতটা প্রমাণ আছে?
কারা কারা গ্রেপ্তার হয়েছিল?
বাংলাদেশে প্রথম পর্যায়ে গ্রেপ্তার হন আমানুল্লাহ সাঈদ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, তানভীর ভূঁইয়া ও সেলেস্টি রহমান। পরে তদন্তে আরও কয়েকজনকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের নেতা কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবু, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দুল করিম মিন্টু, মোস্তাফিজুর রহমান ও ফয়সাল আলী শাজিসহ কয়েকজনের নাম মামলায় আসে।
পশ্চিমবঙ্গ CID গ্রেপ্তার করে জিহাদ হাওলাদার ও মোহাম্মদ সিয়ামকে।
তবে প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি এক নয়। কেউ হত্যার সরাসরি বাস্তবায়নে, কেউ পরিকল্পনা বা সহযোগিতায় এবং কেউ যোগাযোগ বা অর্থের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—তদন্তে এমন বিভিন্ন দাবি এসেছে।
১৬৪ ধারার জবানবন্দি: তদন্তে বড় সূত্র, কিন্তু শেষ কথা নয়
২০২৪ সালের জুনে শিমুল ভূঁইয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে আরও কয়েকজনের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির কথা প্রকাশ্যে আসে।
এসব জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, শাহীনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং হত্যার পর দেহ সরিয়ে ফেলার বিষয়ে নানা তথ্য থাকার কথা তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন।
কিন্তু বাংলাদেশের আইনি বাস্তবতায় একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে স্বাধীন প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। আর এই মামলার ক্ষেত্রে সেই independent corroboration-এর প্রশ্নই এখন বড়।
ফোন রেকর্ড কী বলছে?
CCTV কী বলছে?
অর্থ লেনদেনের রেকর্ড কোথায়?
কে কার সঙ্গে কখন যোগাযোগ করেছে?
মরদেহের দেহাংশ কোথায় পাওয়া গেল?
এসব evidence একসঙ্গে একটি coherent chain তৈরি করতে পারলেই মামলার কাঠামো শক্ত হবে।
মোটিভ: সোনা, ব্যবসা, রাজনীতি—নাকি সবকিছুর মিশ্রণ?
আনার হত্যার পর তদন্তের শুরুতেই সোনা চোরাচালান ঘিরে ব্যবসায়িক বিরোধ একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে আসে। পশ্চিমবঙ্গ CID-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন gold-smuggling syndicate-এর দিকে সন্দেহের কথা বলেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধও তদন্তের অংশ হয়ে ওঠে। ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও গ্রেপ্তার করার পর রাজনৈতিক rivalries-র সম্ভাবনাও তদন্তে আসে।
কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে পশ্চিমবঙ্গ CID যে প্রথম চার্জশিট দেয়, সেখানে হত্যার motive চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তদন্তকারীদের বক্তব্য ছিল, মূল সন্দেহভাজন শাহীনের জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া motive সম্পর্কে পূর্ণ সিদ্ধান্তে যাওয়া সম্ভব নয়।
এখানেই দুই বছর পরও একটি বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে—
আনারকে কেন হত্যা করা হয়েছিল?
সোনা চোরাচালান?
ব্যবসায়িক বিরোধ?
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা?
নাকি একাধিক স্বার্থ এক জায়গায় এসে হত্যার পরিকল্পনা তৈরি করেছিল?
প্রকাশ্য তদন্ত-তথ্যে এখনো কোনো একক motive চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গ CID-এর চার্জশিট: গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, কিন্তু অসম্পূর্ণ গল্প
১৯ আগস্ট ২০২৪ পশ্চিমবঙ্গ CID প্রায় ১,২০০ পৃষ্ঠার চার্জশিট জমা দেয়। সেখানে জিহাদ হাওলাদার ও মোহাম্মদ সিয়ামের নাম ছিল। কিন্তু শাহীনের মতো মূল সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে তদন্ত তখনো সম্পূর্ণ হয়নি বলে CID সূত্র জানিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে supplementary chargesheet দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
অর্থাৎ ভারতীয় তদন্তে ২০২৪ সালেই একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি হয়েছিল—চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু সেটি ছিল না মামলার শেষ অধ্যায়।
তারপর কেন থেমে গেল বাংলাদেশের তদন্ত?
এটাই বর্তমান অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০২৬ সালের এপ্রিলে The Business Standard জানায়, আনার হত্যার দুই বছর পরও বাংলাদেশের তদন্ত অসম্পূর্ণ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতে করা কিছু forensic ও তদন্ত-সংক্রান্ত রিপোর্টের অপেক্ষায় তদন্ত আটকে আছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ডরিন কলকাতায় গিয়ে ডিএনএ নমুনা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের তদন্তকারীদের দাবি ছিল, প্রয়োজনীয় রিপোর্ট এখনো তাঁদের হাতে পুরোপুরি পৌঁছেনি।
এদিকে Daily Sun-এর প্রতিবেদনেও বলা হয়, CID তদন্তাধীন মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা বারবার পেছাচ্ছে এবং ভারতীয় DNA/forensic রিপোর্টের ওপর তদন্তের একটি বড় অংশ নির্ভর করছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতিও দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই ভারতীয় CID ডিএনএ পরীক্ষায় দেহাবশেষ আনার বলে নিশ্চিত করেছিল। অথচ ২০২৬ সালের বাংলাদেশের তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদনে ভারতীয় রিপোর্ট না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এটি কি একই রিপোর্টের বিষয়ে প্রশাসনিক যোগাযোগের সমস্যা? কোনো supplementary forensic document এখনো বাকি? নাকি তদন্তকারীরা আরও কোনো ভারতীয় evidence report-এর কথা বলছেন?
সরকারের উচিত বিষয়টি স্পষ্ট করা।
শিমুলের জামিন: মামলার সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ আইনি ঘটনা
২০২৬ সালের জুনে মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসামি শিমুল ভূঁইয়া হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান। পরে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সেই জামিন স্থগিত করেন। অর্থাৎ আপাতত তাঁর হাইকোর্টের জামিন কার্যকর থাকার পথ বন্ধ হয়েছে।
এটি দেখিয়ে দেয়, দুই বছর পরও মামলাটি শুধু তদন্ত পর্যায়েই আটকে নেই; আইনি লড়াইও নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
আর যিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি কোথায়?
আক্তারুজ্জামান শাহীনকে ধরতে পারা না গেলে মামলার সবচেয়ে বড় রহস্যের একটি অংশ অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ তদন্তকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী তিনিই ছিলেন হত্যার পরিকল্পনার কেন্দ্রে। তাঁর অবস্থান সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্যের সর্বশেষ নির্ভরযোগ্য অবস্থান হলো—তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আছেন বা যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গেছেন বলে তদন্তকারীরা ধারণা করেছিলেন; তবে তাঁর বর্তমান সুনির্দিষ্ট অবস্থান বা গ্রেপ্তারের কোনো নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি।
এখানে বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতার পাশাপাশি তৃতীয় একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে আইনি ও কূটনৈতিক সমন্বয়ও প্রয়োজন।
ভারত কতটা এগোল, বাংলাদেশ কোথায় আটকাল?
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ CID-এর তদন্তে ২০২৪ সালেই কয়েকটি বড় ধাপ সম্পন্ন হয়—সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার, ঘটনাস্থল পুনর্গঠন, সেফটিক ট্যাংক ও খাল থেকে দেহাংশ উদ্ধার, forensic examination এবং পরে DNA confirmation। ১,২০০ পৃষ্ঠার চার্জশিটও জমা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে একই সময়ে একাধিক আসামি গ্রেপ্তার, রিমান্ড, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, রাজনৈতিক ও আর্থিক যোগাযোগের অনুসন্ধানসহ বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু দুই বছর পরও final investigation report বা অভিযোগপত্রের পর্যায়ে বাংলাদেশি মামলা পৌঁছায়নি।
এই পার্থক্যই বর্তমান প্রশ্নের কেন্দ্র।
আনার হত্যা: যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো বাকি
আক্তারুজ্জামান শাহীন কোথায় এবং তাকে কবে গ্রেপ্তার করা যাবে?
হত্যার চূড়ান্ত motive কী ছিল?
রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে হত্যার সম্পর্ক কতটা?
সোনা চোরাচালান বা অন্য কোনো অবৈধ ব্যবসায়িক স্বার্থ কতটা জড়িত?
বাংলাদেশে যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন, প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী?
ভারতের চার্জশিটের পর supplementary chargesheet হয়েছে কি?
বাংলাদেশ কি ভারতের সব forensic ও digital evidence পেয়েছে?
শাহীনকে ধরতে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্টারপোলের মধ্যে এখন কী সমন্বয় চলছে?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
দুই বছর পরও বাংলাদেশের তদন্ত প্রতিবেদন কেন শেষ করা যাচ্ছে না?
দাবি ও যাচাই করা তথ্যের সীমারেখা
নিশ্চিত: আনার ২০২৪ সালের মে মাসে কলকাতায় খুন হয়েছেন এবং তাঁর দেহাবশেষের সঙ্গে DNA মিলে গেছে।
নিশ্চিত: পশ্চিমবঙ্গ CID ২০২৪ সালের আগস্টে জিহাদ হাওলাদার ও মোহাম্মদ সিয়ামকে অভিযুক্ত করে প্রায় ১,২০০ পৃষ্ঠার চার্জশিট জমা দেয়।
নিশ্চিত: বাংলাদেশে একাধিক আসামি গ্রেপ্তার হয়েছিল এবং শিমুল ভূঁইয়া ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
তদন্তকারীদের অভিযোগ: আক্তারুজ্জামান শাহীন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী।
তদন্তে আলোচিত সম্ভাব্য motive: ব্যবসায়িক/সোনা চোরাচালান বিরোধ ও রাজনৈতিক বিরোধ; কোনো একটিকে এখনো চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত motive বলা যায় না।
বর্তমান সমস্যা: বাংলাদেশের তদন্ত এখনো অসম্পূর্ণ এবং ভারতীয় নথি/ফরেনসিক তথ্য নিয়ে সমন্বয়-সংক্রান্ত প্রশ্ন রয়েছে।
বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ আইনি অবস্থা: শিমুলের হাইকোর্টের জামিন আপিল বিভাগ স্থগিত করেছে।
টুডে টিভি বিডির অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ
আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডকে এখন আর শুধু “কলকাতায় একজন বাংলাদেশি এমপির হত্যা” বলে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি আন্তঃদেশীয় ফৌজদারি তদন্ত।
ঘটনার প্রথম কয়েক মাসে যে গতিতে তদন্ত এগিয়েছিল, দুই বছর পর সেই গতি অনেকটাই হারিয়েছে। অথচ ভারতের হাতে forensic evidence আছে, একটি চার্জশিট হয়েছে এবং বাংলাদেশের হাতে বহু আসামি ও তাদের জবানবন্দি রয়েছে। তবু কেন্দ্রীয় সন্দেহভাজন অধরা এবং বাংলাদেশের তদন্ত অসম্পূর্ণ।
সবচেয়ে বড় ঘাটতি এখন তথ্যের স্বচ্ছতায়।
সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—ভারত থেকে কোন রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি, কেন পাওয়া যায়নি এবং তা পেলে বাংলাদেশের তদন্তে কী পরিবর্তন আসবে।
একই সঙ্গে আক্তারুজ্জামান শাহীনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপের বর্তমান অবস্থাও জনগণকে জানানো প্রয়োজন। তিনি কোথায় আছেন, তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বা ভারতের কী ধরনের warrant বা notice আছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রত্যর্পণের কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে আসা উচিত।
কারণ এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো—
মরদেহ পাওয়া গেছে।
ডিএনএ দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে।
হত্যার ঘটনাস্থল চিহ্নিত হয়েছে।
কয়েকজন অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হয়েছে।
চার্জশিট হয়েছে।
তারপরও যাঁকে তদন্তের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে, তিনি বাইরে।
এবং দুই বছর পরও বাংলাদেশে মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।
আনার পরিবারের জন্য এটি শুধু একটি মামলা নয়। এটি একজন বাবার, স্বামীর, ভাইয়ের এবং একজন জনপ্রতিনিধির হত্যার বিচার পাওয়ার অপেক্ষা।
জনগণের জন্য প্রশ্ন আরও বড়—
সীমান্তের ওপারে এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের এত evidence পাওয়ার পরও বিচার পর্যন্ত পৌঁছাতে আর কত বছর লাগবে?
আনার হত্যার রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাই এখন আর কলকাতার ফ্ল্যাটে নয়।
পরের অধ্যায়টি লেখা হবে—অধরা সন্দেহভাজনকে আইনের আওতায় আনা এবং দুই দেশের তদন্তের বিচ্ছিন্ন সূত্রগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রমাণে পরিণত করার মাধ্যমে।
—টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান




