ডাকসুতে প্রায় পাঁচ হাজার ভোট পাওয়া ছাত্রনেতা এখন গুরুতর অসুস্থ; আত্মহত্যার নোটে ব্যক্তিগত শূন্যতার কথা উঠে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন—এর সঙ্গে কি রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, সংগঠন বদল ও ব্যক্তিজীবনের চাপের কোনো সম্পর্ক আছে?
নাগরিক দর্পণ | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি ও জাতীয় পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য মেঘমল্লার বসু বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। ৮ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের পর হাসপাতালে নেওয়া হয়; পরদিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে সর্বশেষে তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতির কথাও জানানো হয়েছে।
ঘটনাটিকে ঘিরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেঘমল্লার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আত্মহত্যামূলক নোট প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে তিনি ব্যক্তিগত হতাশা, অপরাধবোধ, পারিবারিক বিষয় এবং নিজের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলেন। তাঁর লেখায় জীবনের অর্থ খুঁজে না পাওয়া এবং দীর্ঘ ঘুরপাকের পর আবার শূন্যতায় ফিরে আসার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
এখানে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। কোনো ব্যক্তির আত্মহত্যার চেষ্টা বা আত্মহানির ঝুঁকিকে কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা, সম্পর্কের ভাঙন কিংবা একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। মানসিক সংকট সাধারণত বহু কারণের সমন্বয়ে তৈরি হয়। মেঘমল্লারের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত, পারিবারিক, শারীরিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রকৃত সম্পর্ক কী ছিল, তা নির্ভরযোগ্যভাবে জানার জন্য তাঁর নিজের বক্তব্য, কাছের মানুষের তথ্য এবং পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন প্রয়োজন।
ডাকসু নির্বাচনে প্রায় পাঁচ হাজার ভোট পাওয়া সেই মেঘমল্লার
মেঘমল্লারের রাজনৈতিক পরিচিতি সাম্প্রতিক নয়। ২০২৫ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বামপন্থী সাতটি ছাত্রসংগঠনের জোট ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’-এর প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। চূড়ান্ত ফলে তিনি ৪ হাজার ৯৪৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। তাঁর আগে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্রার্থী এস এম ফরহাদ ১০ হাজার ৭৯৪ এবং ছাত্রদলের শেখ তানভীর বারী হামিম ৫ হাজার ২৮৩ ভোট পান।
প্রচারের সময় অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও তিনি হুইলচেয়ারে করে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, নিজের ভোট দেওয়াটাকেই তিনি এক ধরনের জয় হিসেবে দেখছেন। এই বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং নির্বাচনী অংশগ্রহণের প্রতি ব্যক্তিগত গুরুত্বের একটি ইঙ্গিত দেয়।
অর্থাৎ মেঘমল্লার কোনো অখ্যাত বা বিচ্ছিন্ন ছাত্রকর্মী ছিলেন না। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে দৃশ্যমান ছিলেন, নির্বাচনে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভোট পেয়েছেন এবং একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করেছেন। আজ তাঁর আইসিইউর ছবি তাই অনেকের কাছে আরও বেদনাদায়ক।
ছাত্র ইউনিয়নের ভাঙন: যে সংকটের মধ্যে বেড়ে উঠেছিল একটি প্রজন্ম
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের বিভক্তির ইতিহাসও এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। সংগঠনটির ৪০তম জাতীয় সম্মেলন ও কাউন্সিলের পর দুই অংশে বিভক্তি প্রকাশ্য রূপ নেয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও সংবাদ প্রতিবেদনে এই বিভক্তির পেছনে নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো ও আদর্শগত মতপার্থক্যের কথা উঠে এসেছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সংগঠনের দুই অংশ পাল্টা কমিটি ঘোষণা করায় দীর্ঘ ঐতিহ্যের ছাত্রসংগঠনটি গভীর সংকটে পড়ে।
পরে দীর্ঘ বিভক্তির পর দুই অংশকে একত্রে সম্মেলনের মঞ্চেও দেখা গেছে। ২০২৪ সালের পর দুই পক্ষের নেতারা ‘ঐক্যবদ্ধ ৪১তম জাতীয় সম্মেলন’-এ একসঙ্গে উপস্থিত হন, যা বিভক্তির রাজনৈতিক ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় তৈরি করে।
এই ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘদিনের কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের ভাঙন শুধু কমিটি ভাগ করে না; এর সঙ্গে যুক্ত তরুণদের রাজনৈতিক পরিচয়, সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ এবং মানসিক নিরাপত্তাকেও নানাভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তবে মেঘমল্লারের বর্তমান সংকটের সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক বিভক্তির সরাসরি কারণগত সম্পর্ক রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি এখনো নেই।
মেঘমল্লারের রাজনৈতিক পথ কেন বারবার বদলেছে?
২০২৬ সালের জুলাইয়ে মেঘমল্লার বসু বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন—এনপিএতে যোগ দেন। একই সময়ে সংগঠনটির সহসভাপতি মাঈন আহমেদও পদত্যাগ করেন। ছাত্র ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ জানায়, একই সঙ্গে দুটি সংগঠনের নীতিনির্ধারণী ফোরামে থাকা সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মেঘমল্লার নিজেও বলেছিলেন, তিনি এখন এনপিএতে কাজ করতে চান।
এর আগে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এনপিএ আত্মপ্রকাশ করে। ঘোষিত কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে মেঘমল্লারের নামও ছিল। প্ল্যাটফর্মটির ঘোষিত মূলনীতির মধ্যে ছিল গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষা।
এখানে একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে: একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী যখন এক সংগঠন থেকে আরেক সংগঠনে যান, তখন সেটি কি কেবল আদর্শগত পুনর্বিন্যাস, নাকি এর পেছনে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক হতাশা, পরিচয়ের সংকট এবং নতুন রাজনৈতিক আশ্রয়ের অনুসন্ধানও কাজ করতে পারে? মেঘমল্লারের ক্ষেত্রে এর উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তাঁর নিজের লেখা আত্মহত্যামূলক নোটে জীবনের বিভিন্ন সময় ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ এসেছে বলে সংবাদমাধ্যমে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা এই প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিক করে না।
‘স্মার্ট’ প্রজন্মের রাজনীতির ভেতরের শূন্যতা
মেঘমল্লারের রাজনৈতিক প্রজন্ম সম্পর্কে বাইরে থেকে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে—তাঁরা শিক্ষিত, বক্তৃতায় দক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক এবং পুরোনো রাজনৈতিক ভাষার বাইরে নতুন ধরনের রাজনীতি করতে আগ্রহী। এনপিএর আত্মপ্রকাশের সংবাদেও বিভিন্ন ছাত্র ও নাগরিক আন্দোলনের পরিচিত মুখদের অংশগ্রহণের কথা এসেছে।
কিন্তু রাজনৈতিক দক্ষতা আর মানসিক স্থিতি এক বিষয় নয়। একজন মানুষ মঞ্চে হাজার মানুষের সামনে অনর্গল কথা বলতে পারেন, রাজনৈতিক যুক্তি দিতে পারেন, নির্বাচনে হাজার ভোট পেতে পারেন—তারপরও ব্যক্তিগত জীবনে ভয়াবহ সংকটের মধ্যে থাকতে পারেন।
এই জায়গাটিই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সাধারণত কর্মীর রাজনৈতিক পারফরম্যান্সের হিসাব রাখে। কে কত ভোট পেলেন, কে মিছিলে ছিলেন, কে বক্তব্য দিলেন, কে সংগঠন গড়লেন—এসবের হিসাব থাকে। কিন্তু সেই কর্মী রাতে ঘুমাতে পারছেন কি না, পরিবারে কী ঘটছে, সম্পর্ক ভেঙে গেলে তিনি কীভাবে সামলাচ্ছেন, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা অনিশ্চিত—এসবের খবর কে রাখে?
অধ্যাপক যতীন সরকারের পুরোনো প্রশ্নটি এখানে প্রাসঙ্গিক
বাংলাদেশের বাম রাজনীতি নিয়ে অধ্যাপক যতীন সরকার যে সমালোচনাটি বহু আগে করেছিলেন বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি হলো—সমাজ বিশ্লেষণের পাশাপাশি সমাজমনস্তত্ত্ব এবং ব্যক্তিমনের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
মেঘমল্লারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নটি আবার সামনে আসে।
রাজনৈতিক তত্ত্ব মানুষের সমাজকে ব্যাখ্যা করতে পারে। শ্রেণি, শোষণ, বৈষম্য, রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ—এসব নিয়ে বিশ্লেষণ হতে পারে। কিন্তু যে তরুণটি প্রতিদিন সেই রাজনীতি করছে, তার ব্যক্তিগত জীবন, ভয়, একাকিত্ব, সম্পর্ক, পরিবার, ভবিষ্যৎ ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দলীয় সংগঠন কতটা ভাবছে?
রাজনীতির ভাষায় মানুষ হয় ‘ক্যাডার’, ‘নেতা’, ‘কর্মী’, ‘সংগঠক’, ‘কমরেড’। কিন্তু এর প্রতিটি পরিচয়ের ভেতরে একজন পূর্ণ মানুষ থাকে।
সেই মানুষটিকে ভুলে গেলে রাজনৈতিক সংগঠন যত শক্তিশালীই দেখাক, ভেতরে বড় শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
সম্পর্কের প্রসঙ্গ: সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো তথ্য কতটা সত্য?
মেঘমল্লারের আত্মহত্যামূলক নোটে একটি সাবেক সম্পর্কের প্রসঙ্গ এসেছে বলে প্রতিবেদনগুলো জানিয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ওই ব্যক্তিও একই সময়ে আত্মহানির চেষ্টা করেছেন—এমন দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।
তবে এই দ্বিতীয় ঘটনার স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য যাচাই পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা দায়িত্বশীল হবে না।
এই জায়গায় সাংবাদিকতার একটি মৌলিক নীতি মনে রাখা দরকার—একজন সংকটে থাকা মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, মানসিক অবস্থা কিংবা আত্মহানির ঘটনাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর দাঁড় করিয়ে ব্যাখ্যা করা আরও ক্ষতিকর হতে পারে।
ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করে তথ্য প্রকাশ করাই এখানে জরুরি।
মেঘমল্লারের বক্তব্যগুলোও তাঁর রাজনৈতিক পথের সাক্ষ্য
২০২৪ সালের পর মেঘমল্লারকে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নে সক্রিয় দেখা গেছে। তিনি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন এবং হিন্দু নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছেন। ২০২৪ সালের শেষদিকে ১৪৫ নাগরিকের একটি বিবৃতিতেও তাঁর নাম ছিল; সেখানে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে অবস্থানের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। যে কোনো তরুণ রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু একজন মানুষের রাজনৈতিক বক্তব্যকে তাঁর ব্যক্তিগত মানসিক সংকটের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়।
মেঘমল্লারকে বোঝার জন্য তাই একই সঙ্গে দুটি বিষয় দেখতে হবে—তিনি কী রাজনীতি করেছেন এবং তিনি কী ধরনের মানুষ হিসেবে সেই রাজনীতি বহন করেছেন।
রাজনীতি কি তার কর্মীদের মানুষ হিসেবে দেখে?
এটাই সম্ভবত এই ঘটনার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন।
রাজনৈতিক দলের কাছে কর্মী প্রয়োজন। আন্দোলনের সময় কর্মী প্রয়োজন। মিছিলের সময় কর্মী প্রয়োজন। নির্বাচনের সময় কর্মী প্রয়োজন। বক্তৃতার মঞ্চে কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু কর্মীর জীবনে বিপর্যয় এলে কী হয়?
অনেক সময় তখন সংগঠন ব্যস্ত থাকে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে।
একজন কর্মী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ভুল করলে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়। সংগঠন পরিবর্তন করলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠে। মতপার্থক্য হলে তিনি ‘বিভ্রান্ত’, ‘ডানপন্থী’, ‘বামপন্থী’, ‘সুযোগসন্ধানী’ কিংবা ‘অপরিণত’—বিভিন্ন ট্যাগ পান।
কিন্তু তিনি যখন বলেন, “আমি ভালো নেই”, তখন কি কেউ বসে তাঁর কথা শোনে?
এই প্রশ্ন শুধু ছাত্র ইউনিয়নের জন্য নয়। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রলীগের উত্তরসূরি বিভিন্ন সংগঠন, বামপন্থী ছাত্রসংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন কিংবা নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম—সবগুলোর জন্যই প্রযোজ্য।
রাজনীতি কারও জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো কঠিন জায়গা হওয়া উচিত নয়
মেঘমল্লারের বর্তমান সংকটকে রাজনৈতিক জয়-পরাজয়ের ভাষায় দেখা বিপজ্জনক।
আজ তিনি কোন দলে, গতকাল কোন দলে ছিলেন, ২০২৪ সালে কী বলেছিলেন, কার সঙ্গে মিছিল করেছিলেন—এসব রাজনৈতিক ইতিহাসের বিষয়। কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় থাকা একজন মানুষের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং মানসিক সহায়তা।
তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিচার পরে হতে পারে।
ইতিহাস তাঁর অবস্থানকে মূল্যায়ন করবে।
তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা হবে।
কিন্তু জীবন-মৃত্যুর সংকটে থাকা একজন মানুষের ক্ষেত্রে আগে মানুষটিকে বাঁচানো দরকার।
তরুণ রাজনীতিকদের জন্য মেঘমল্লারের গল্পের সতর্কবার্তা
যারা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে আছেন, তাঁদের জন্য এই ঘটনাটি হয়তো একটি কঠিন শিক্ষা।
রাজনীতি করুন।
আদর্শ নিয়ে বিতর্ক করুন।
নেতৃত্ব দিন।
সংগঠন করুন।
ভোট চান।
কিন্তু নিজের জীবনকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে পুরোপুরি এক করে ফেলবেন না।
রাজনৈতিক সংগঠন বদলাতে পারে। নেতৃত্ব বদলাতে পারে। মতাদর্শের ব্যাখ্যা বদলাতে পারে। আজ যে মানুষ আপনাকে পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন, কাল তিনি অন্য রাজনৈতিক অবস্থানে থাকতে পারেন। কিন্তু আপনার জীবন, আপনার পরিবার এবং আপনার মানসিক সুস্থতা—এসবের বিকল্প নেই।
কখনো মনে হলে আপনি একা হয়ে যাচ্ছেন, জীবনের অর্থ হারিয়ে ফেলছেন বা নিজের ক্ষতি করার চিন্তা আসছে, তখন সেটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখবেন না। বিশ্বস্ত মানুষ, পরিবারের সদস্য অথবা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে দ্রুত কথা বলুন এবং জরুরি ঝুঁকি থাকলে নিকটস্থ হাসপাতাল বা জরুরি সেবার সাহায্য নিন।
শেষ কথা
মেঘমল্লার বসুর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তাঁর সিদ্ধান্তের সমর্থক যেমন আছেন, সমালোচকও থাকবেন। ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক ইতিহাস, নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে তাঁর যোগদান কিংবা ২০২৪-এর পর তাঁর বিভিন্ন অবস্থান—সবই রাজনৈতিক বিশ্লেষণের বিষয়।
কিন্তু আজকের সবচেয়ে বড় পরিচয় অন্যটি।
মেঘমল্লার একজন অসুস্থ মানুষ।
যে তরুণ একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজারো শিক্ষার্থীর সামনে কথা বলেছেন, যে নির্বাচনে প্রায় পাঁচ হাজার ভোট পেয়েছেন, যে হুইলচেয়ারে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোটাধিকার নিয়ে কথা বলেছেন—আজ তিনি হাসপাতালের আইসিইউতে।
তাঁর এই সংকট তাই শুধু একটি রাজনৈতিক দলের সংকট নয়। এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সামনে রাখা একটি প্রশ্ন—
আমরা কি কর্মী চাই, নাকি মানুষকে চাই?
একজন তরুণ যখন রাজনীতির মাঠে থাকে, তখন আমরা তার স্লোগান শুনি। তার বক্তৃতা শুনি। তার ভোটের সংখ্যা গুনি। তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তর্ক করি।
কিন্তু তার নীরবতাটুকু কি শুনি?
মেঘমল্লারের জন্য এখন সবচেয়ে প্রয়োজন রাজনৈতিক বিতর্ক নয়—চিকিৎসা, নিরাপদ পরিবেশ, কাছের মানুষের উপস্থিতি এবং সুস্থ হয়ে ফিরে আসার সুযোগ।
মেঘমল্লার দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন। এবং তাঁর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দিক—রাজনীতির আগে মানুষ, সংগঠনের আগে জীবন।
তথ্যসূত্র: bdnews24.com, প্রথম আলো, আজকের পত্রিকা, The Daily Campus, বাংলা ট্রিবিউন, জাগো নিউজ, যুগান্তরসহ সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ছাত্র ইউনিয়ন/এনপিএ-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।
নাগরিক দর্পণ | মানবিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ




