Homeটুডে ওয়ার্ল্ডতিন বছর পর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ৫৫ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার গাজায়

তিন বছর পর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ৫৫ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার গাজায়

এক পরিবারের সদস্যদের দেহ উদ্ধারে ৭২ ঘণ্টার অভিযান; গাজার ভবনের ৮২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসের দাবি জাতিসংঘের

গাজা | ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রায় তিন বছর পর ৫৫ ফিলিস্তিনির মরদেহের অবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় মালকা পরিবারের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে এই মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, উদ্ধারকারীরা প্রায় ৭২ ঘণ্টা ধরে ধ্বংসস্তূপে কাজ করার পর এই অবশেষগুলো বের করতে সক্ষম হন।

২০২৩ সালের হামলার ধ্বংসস্তূপে পড়ে ছিল মরদেহ

গাজার স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর মালকা পরিবারের ওই বাড়িতে হামলা হয়। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের বাড়ি ছেড়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

হামলার পর ভবনটি পুরোপুরি ধসে পড়ে। ভারী উদ্ধারযন্ত্রের অভাবে দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপ সরানো সম্ভব হয়নি।

ফলে বহু মানুষের মরদেহ বছরের পর বছর ভবনের নিচে চাপা পড়ে ছিল।

উদ্ধারকারীদের সামনে ছিল বিশাল বাধা

গাজার সিভিল ডিফেন্স দীর্ঘদিন ধরে ভারী উদ্ধারযন্ত্রের ঘাটতির কথা বলে আসছে।

ধসে পড়া কংক্রিট, লোহা ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী সরানোর জন্য বড় ধরনের ক্রেন ও খননযন্ত্র প্রয়োজন। কিন্তু অবকাঠামো ধ্বংস এবং সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে উদ্ধারকাজ মূলত হাতে বা সীমিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে চালাতে হচ্ছে।

মালকা পরিবারের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি তাই শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়; গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো কত মানুষ আটকে আছেন, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।

হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ

জাতিসংঘের Satellite Centre-এর তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘ সংস্থা ও বিভিন্ন মানবিক সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, ১০ হাজার থেকে ১৪ হাজার মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ থাকতে পারেন।

অর্থাৎ উদ্ধার হওয়া ৫৫ জনের ঘটনা বড় হলেও এটি বৃহত্তর সংকটের একটি ছোট অংশ।

যুদ্ধবিরতি থাকলেও মৃত্যু থামেনি

গাজায় গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সহিংসতার ঘটনা পুরোপুরি থামেনি।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও অন্তত ১,৩৪৪ জন নিহত এবং ৪,৪৬৪ জন আহত হয়েছেন।

ইসরায়েল অবশ্য বিভিন্ন হামলায় হামাসের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার কথা বলে এসেছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি পক্ষ এসব হামলাকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।

জোরপূর্বক উচ্ছেদ নিয়ে নতুন বিতর্ক

মরদেহ উদ্ধারের এই ঘটনা এমন সময় সামনে এলো, যখন গাজার ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে।

ইসরায়েলের দুই উগ্র ডানপন্থী মন্ত্রী গাজার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন।

কিন্তু ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি শনিবার বলেছেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোর করে সরিয়ে দেওয়ার কোনো মার্কিন-সমর্থিত পরিকল্পনা নেই।

তিনি জোর করে উচ্ছেদের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

গাজার সংকট এখন শুধু যুদ্ধের নয়

যুদ্ধবিরতি থাকলেও ধ্বংসস্তূপ, খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসনের সংকট থেকে গেছে।

হাজারো মানুষ এখনো নিরাপদ ঘরবাড়ি থেকে বঞ্চিত। হাসপাতালগুলোও স্বাভাবিক সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।

সুতরাং সংঘাতের সামরিক পর্ব কমলেও মানবিক পুনর্গঠন শুরু করা কতটা কঠিন হবে, ৫৫টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি তারই একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।

🕊️ একটি পরিবারের কাহিনি, বৃহত্তর গাজার প্রতিচ্ছবি

মালকা পরিবারের সদস্যরা যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই বাড়িটিই শেষ পর্যন্ত তাঁদের কবর হয়ে দাঁড়ায়।

তিন বছর পর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তাঁদের অবশেষ উদ্ধার হওয়া দেখিয়ে দিচ্ছে—গাজার যুদ্ধের বহু মৃত্যু এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে হিসাবের বাইরে থাকতে পারে।

🇧🇩 বাংলাদেশি পাঠকের জন্য এর তাৎপর্য

গাজার সংঘাতের সরাসরি সামরিক প্রভাব বাংলাদেশের ওপর নেই। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘ হলে জ্বালানি বাজার, শিপিং ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে তার প্রভাব পড়তে পারে।

এর বাইরে বাংলাদেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত হওয়ায় অঞ্চলটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

📊 গাজার বর্তমান চিত্র

  • উদ্ধার হওয়া মরদেহ: ৫৫
  • ধ্বংসস্তূপের নিচে সম্ভাব্য নিখোঁজ: ১০,০০০–১৪,০০০
  • গাজার ক্ষতিগ্রস্ত/ধ্বংস ভবন: প্রায় ৮২%
  • যুদ্ধবিরতির পর নিহত: ১,৩৪৪+
  • যুদ্ধবিরতির পর আহত: ৪,৪৬৪

🧭 সামনে কী?

গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করা এখন একটি বিশাল মানবিক অভিযান।

ভারী যন্ত্রপাতি, জ্বালানি ও নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে আরও অনেক নিখোঁজ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে।

কিন্তু সেই কাজ শুরু হলেও গাজার পূর্ণ পুনর্গঠন ও পরিবারগুলোকে নিরাপদ জীবনে ফিরিয়ে আনা হবে আরও দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়া।

তথ্যসূত্র: Al Jazeera, Reuters, UN Satellite Centre, Gaza Civil Defence

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments