Homeটুডে ওয়ার্ল্ডএক টিকিটে বছরে ৩০০ বার ফ্রি খাবার, বিমানেই ওঠেননি সেই যাত্রী

এক টিকিটে বছরে ৩০০ বার ফ্রি খাবার, বিমানেই ওঠেননি সেই যাত্রী

চীনের শি’আন বিমানবন্দরে ফার্স্ট-ক্লাস টিকিটের নিয়মকে কাজে লাগিয়ে প্রায় এক বছর ভিআইপি লাউঞ্জে খাবার খেলেন এক ব্যক্তি; শেষে টিকিট বাতিল করে ফেরত নিলেন টাকাও

শি’আন, চীন | TODAY TV BD | আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিমানবন্দরের ফার্স্ট-ক্লাস লাউঞ্জ সাধারণ যাত্রীদের জন্য নয়। সেখানে প্রবেশের অধিকার পাওয়া যাত্রীদের জন্য থাকে অপেক্ষার সময়টা আরামদায়ক করে তোলার নানা সুবিধা—খাবার, পানীয়, বিশ্রামের ব্যবস্থা, বিনোদন ও কাজের সুযোগ। সাধারণত একজন ফার্স্ট-ক্লাস যাত্রী বিমানে ওঠার আগে কিছু সময় এই সুবিধা ব্যবহার করে নির্ধারিত ফ্লাইটে উঠে গন্তব্যে চলে যান।

কিন্তু চীনের শানসি প্রদেশের শি’আন বিমানবন্দরে এক ব্যক্তি এই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। একটি বৈধ ফার্স্ট-ক্লাস টিকিট নিয়ে তিনি প্রায় এক বছর ধরে ৩০০ বারের বেশি বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে গিয়ে বিনা মূল্যে খাবার ও পানীয় গ্রহণ করেন। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়—এই সময়ে তিনি সেই ফ্লাইটে একবারও ওঠেননি।

ঘটনাটি ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়।

কৌশলটি ছিল বেশ সহজ

প্রথম দিন ওই ব্যক্তি China Eastern Airlines-এর একটি ফার্স্ট-ক্লাস টিকিট নিয়ে শি’আন বিমানবন্দরে যান। টিকিট থাকায় তিনি এয়ারলাইনের ভিআইপি লাউঞ্জে প্রবেশের সুযোগ পান। সেখানে খাবার ও পানীয় গ্রহণ করে বিশ্রাম নেন।

এরপর যখন বিমানে ওঠার সময় ঘনিয়ে আসে, তখন তিনি ফ্লাইটে না উঠে নিজের টিকিটের যাত্রার তারিখ পরিবর্তন করে পরবর্তী দিনের জন্য সরিয়ে নিতেন

পরদিন আবার একই টিকিট নিয়ে বিমানবন্দরে হাজির হতেন। নতুন তারিখের বৈধ টিকিট দেখিয়ে আবার ভিআইপি লাউঞ্জে ঢুকতেন, খাবার খেতেন, সময় কাটাতেন এবং ফ্লাইট ছাড়ার আগে আবারও যাত্রার তারিখ পিছিয়ে দিতেন।

এভাবেই চলতে থাকে একই প্রক্রিয়া।

টিকিট বদলানো—লাউঞ্জে প্রবেশ—খাবার খাওয়া—ফ্লাইটে না ওঠা—আবার তারিখ বদলানো।

এই কাজই তিনি কয়েকশবার করেন।

একবারের টিকিট, ৩০০ বারের বেশি লাউঞ্জ ব্যবহার

চীনা সংবাদমাধ্যমের বরাতে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, ওই ব্যক্তির টিকিটের যাত্রার তারিখ এক বছরের মধ্যে ৩০০ বারের বেশি পরিবর্তন করা হয়েছিল

অর্থাৎ একটি টিকিট, যা স্বাভাবিক নিয়মে একটি নির্দিষ্ট যাত্রার জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা, সেটিই তিনি বারবার নতুন তারিখে বৈধ করে লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগান।

এই কারণে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনেক প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে ‘প্রায় এক বছর ফ্রি খাবার খাওয়া’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—তিনি কোনো ভুয়া টিকিট ব্যবহার করেননি কিংবা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে লাউঞ্জে ঢোকেননি। তাঁর টিকিট ছিল বৈধ এবং যাত্রার তারিখ পরিবর্তনের সুযোগও ছিল টিকিটের শর্তের মধ্যে।

এয়ারলাইন কীভাবে বিষয়টি টের পেল

ঘটনাটি দীর্ঘদিন অজানা থাকেনি।

China Eastern Airlines-এর একজন কর্মী একই টিকিটের যাত্রার তারিখ অস্বাভাবিক সংখ্যকবার পরিবর্তনের বিষয়টি লক্ষ্য করেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গিয়ে দেখা যায়, টিকিটধারী ব্যক্তি নিয়মিত বিমানবন্দরে আসছেন এবং লাউঞ্জ ব্যবহার করছেন।

কিন্তু তারিখের পর তারিখ পরিবর্তিত হলেও তিনি কোনো ফ্লাইটে যাত্রা করছেন না।

তখনই সামনে আসে পুরো কৌশলটি।

একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এয়ারলাইন কর্তৃপক্ষের একজন মুখপাত্রের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, এটি ছিল একটি বিরল ঘটনা, এবং তখনকার নিয়মে এমন আচরণ বন্ধ করার সরাসরি আইনি উপায় কোম্পানির হাতে ছিল না।

বিমান সংস্থা কি তাঁকে প্রতারণার অভিযোগে আটকাতে পেরেছিল?

এখানেই ঘটনাটির সবচেয়ে অদ্ভুত দিক।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অনৈতিকভাবে সুবিধা নেওয়া হিসেবে দেখলেও ওই ব্যক্তি যে নিয়মের কোনো স্পষ্ট শর্ত ভাঙছিলেন, তা প্রমাণ করা সহজ ছিল না।

কারণ তিনি বৈধ ফার্স্ট-ক্লাস টিকিটের মাধ্যমে লাউঞ্জে প্রবেশ করছিলেন এবং অনুমোদিত নিয়মের মধ্যে থেকেই প্রতিবার তাঁর যাত্রার তারিখ পরিবর্তন করছিলেন।

অর্থাৎ ব্যবস্থাটির উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে সুবিধা নেওয়া হলেও প্রতিটি পৃথক পদক্ষেপ নিয়মের বাইরে ছিল না—এটাই বিমান সংস্থার জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

শেষ পর্যন্ত আরও বড় চমক

এতদিন ধরে লাউঞ্জ ব্যবহারের পর যখন এয়ারলাইন তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করে, তখনও ওই ব্যক্তি শেষ চালটি রেখে দিয়েছিলেন।

টিকিটটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি সেটি বাতিল করে দেন এবং ফেরত চান টিকিটের মূল্য

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি সেই অর্থ ফেরতও পান।

অর্থাৎ প্রায় এক বছর ধরে লাউঞ্জের খাবার ও অন্যান্য সুবিধা ব্যবহার করার পরও শেষ পর্যন্ত তিনি সেই বিমানযাত্রার টিকিটটিই বাতিল করে টাকা ফেরত নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

ফলে তাঁর পুরো কৌশলের সারাংশ দাঁড়ায়—

একটি ফার্স্ট-ক্লাস টিকিট কেনা → বারবার যাত্রার তারিখ পরিবর্তন → শত শতবার ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার → ফ্লাইটে না ওঠা → মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে টিকিট বাতিল → টাকা ফেরত।

তিনি আসলে কী কী সুবিধা নিয়েছিলেন?

আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোতে মূলত বিনা মূল্যে খাবার ও পানীয় গ্রহণের বিষয়টিই সামনে এসেছে। শি’আন বিমানবন্দরের লাউঞ্জে ফার্স্ট-ক্লাস যাত্রীদের জন্য খাবারের বুফে ও বিশ্রামের সুবিধা ছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে কিছু পরবর্তী প্রতিবেদনে লাউঞ্জের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়েও নানা দাবি করা হয়েছে। এসব অতিরিক্ত সুবিধা ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তি কতটা ব্যবহার করেছিলেন, তার স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না।

তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বারবার লাউঞ্জে প্রবেশ করে খাবার ও পানীয় নেওয়াই ছিল তাঁর মূল কৌশল।

প্রতিদিন ৩০০ বার নয়, ৩০০ দিনের বেশি ব্যবহারের অর্থ কী?

ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ‘৩০০ বার’ এবং ‘৩০০ দিনের বেশি’—দুই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। মূল তথ্য হলো, একই টিকিটের যাত্রার সূচি ৩০০ বারের বেশি পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে লাউঞ্জ ব্যবহার করা হয়।

এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি আরও নাটকীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ে—একটি বিমান টিকিটকে যেন তিনি প্রায় এক বছরের জন্য ‘লাউঞ্জ মেম্বারশিপে’ পরিণত করেছিলেন।

ব্যবস্থার কোথায় ছিল ফাঁক?

ঘটনাটি শুধু একজন চতুর যাত্রীর গল্প নয়; এটি বিমান ভ্রমণ ব্যবস্থার একটি সম্ভাব্য নিয়মগত ফাঁকও সামনে নিয়ে এসেছিল।

ফার্স্ট-ক্লাস লাউঞ্জের সুবিধা মূলত এমন যাত্রীদের জন্য তৈরি, যারা সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটে ভ্রমণ করবেন। কিন্তু যদি একজন যাত্রী প্রতিবার বোর্ডিংয়ের আগেই তাঁর যাত্রা পিছিয়ে দেন, তাহলে তিনি technically বৈধ টিকিটধারী থাকেন, অথচ বাস্তবে কোনো ফ্লাইটে ভ্রমণ করেন না।

এই কৌশল ব্যবস্থার সেই দুই নিয়মের মাঝের ফাঁকটি ব্যবহার করেছিল—লাউঞ্জ ব্যবহারের অধিকার এবং ফ্লাইটের তারিখ পরিবর্তনের অধিকার।

ঘটনার পর কী হলো

আন্তর্জাতিক সংবাদে ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর এটি ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। অনেকেই ওই ব্যক্তির কৌশলকে ‘বুদ্ধিমান’ বলে প্রশংসা করেন, আবার অনেকে এটিকে বিমান সংস্থার সুবিধার অপব্যবহার হিসেবে দেখেন।

China Eastern Airlines-এর জন্য ঘটনাটি ছিল বিব্রতকর হলেও তখনকার নিয়মের কাঠামোর কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল।

ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত একটি অদ্ভুত বিমানযাত্রার গল্প হিসেবেই থেকে যায়—যেখানে যাত্রীর হাতে ছিল প্রথম শ্রেণির টিকিট, কিন্তু তাঁর আসল গন্তব্য যেন বিমান নয়, বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ।

তথ্যসূত্র: The Star (Malaysia), Kwong Wah Yit Poh-এর বরাত দেওয়া আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন, Eater, Fox News, Boing Boing এবং অন্যান্য ২০১৪ সালের আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘটনার কিছু খুঁটিনাটিতে পার্থক্য রয়েছে; মূল ঘটনাপ্রবাহ—China Eastern-এর ফার্স্ট-ক্লাস টিকিট ব্যবহার করে শি’আন বিমানবন্দরের লাউঞ্জে ৩০০ বারের বেশি প্রবেশ, বারবার যাত্রার তারিখ পরিবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত টিকিট বাতিল করে অর্থ ফেরত নেওয়া—একাধিক উৎসে একইভাবে বর্ণিত হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments